Mon 14th Sep 2026, 5:17 pm

প্রশাসনে কর্মভারের দ্বৈত চিত্র: অতিরিক্ত দায়িত্বে পীড়িত, অনেকে নিষ্ক্রিয়

প্রশাসনে কর্মভারের দ্বৈত চিত্র: অতিরিক্ত দায়িত্বে পীড়িত, অনেকে নিষ্ক্রিয়
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে, প্রশাসন তার শীর্ষ ও সংবেদনশীল পদসমূহে শতভাগ আস্থাভাজন ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা খুঁজে পেতে যথেষ্ট জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে। এই সংকটের কারণে, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তাদের উপর তিন-চারটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হচ্ছে। এমন বহুমুখী কর্মভার সামলাতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। বিপরীতক্রমে, যাদের সরকারের আস্থাভাজন মনে করা হচ্ছে না, তাদের হয় অপ্রধান দায়িত্বে নিযুক্ত করা হচ্ছে অথবা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে। ফলস্বরূপ, প্রশাসনিক কার্যকারিতা, কর্মপ্রবাহের গতি এবং জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একজন কর্মকর্তার হাতে একাধিক দায়িত্ব ন্যস্ত করা হলে কোনো কাজই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় না।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের রদবদল একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত নিয়মিত কর্মকর্তাদের একটি বৃহৎ অংশ থেকে উপযুক্ত ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা নির্বাচন করতে গিয়ে বর্তমানে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিএনপির পূর্ববর্তী শাসনামলে কর্মরত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সচিব বা সমমর্যাদার ৭৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত, যা মোট কর্মকর্তার প্রায় ২৯ শতাংশ। উপরন্তু, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব বা সমমর্যাদার পদে নিয়োগের জন্য নিয়মিত কর্মকর্তাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হলেও, তাদের অনেকের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাভ করছে না। একইভাবে, যাদের এসিআর ইতিবাচক হলেও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে, তাদেরও চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।

তিন শতাধিক কর্মকর্তার একাধিক দায়িত্ব: জনপ্রশাসন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যায় পর্যন্ত তিন শতাধিক কর্মকর্তা তাদের মূল পদের অতিরিক্ত একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সর্বাধিক সংখ্যক কর্মকর্তা একসঙ্গে একাধিক দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন; এই মন্ত্রণালয়ের মোট ২৫ জন কর্মকর্তা একাধিক পদের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নঈম একাই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অনুবিভাগের (প্রশাসন ও অর্থ, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, মেডিক্যাল এবং আরএম অ্যান্ড পিআর ইউনিট) দায়িত্বে আছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ তিনটি অনুবিভাগ (নিরাপত্তা, বহিরাগমন ও রাজনৈতিক অনুবিভাগ), অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মফিজুর রহমান তিনটি অনুবিভাগ (অগ্নি, আইন ও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন) এবং অতিরিক্ত সচিব কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শৃঙ্খলা অনুবিভাগের পাশাপাশি আনসার ও সীমান্ত অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসান একই সাথে তিনটি অনুবিভাগে (ব্লু ইকোনমি, সমন্বয় ও সংস্কার) দায়িত্ব পালন করছেন। একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।

অনুরূপভাবে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ১৪ জন, অর্থ বিভাগে ৯ জন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ৭ জন, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ৬ জন, কৃষি মন্ত্রণালয়ে ৫ জন, স্থানীয় সরকার বিভাগে ৫ জন এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে ৫ জন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। একইভাবে, যুগ্ম সচিব থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়েও বহু কর্মকর্তা দুই থেকে চারটি অনুবিভাগের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অধিকাংশই নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মরত। এর ফলস্বরূপ, একজন কর্মকর্তাকে প্রায়শই ভিন্ন প্রকৃতির দুটি দপ্তরের কার্যক্রম তদারকি করতে হচ্ছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, সাময়িকভাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করা যুক্তিসঙ্গত হলেও দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে কাজের গতি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে পারে। একই সাথে, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কারণে কর্মকর্তাদের উপর মানসিক ও পেশাগত চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং ফাইলের গতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। অতএব, শূন্যপদে দ্রুত পদায়ন এবং দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এই পরিস্থিতির আশু সমাধান অপরিহার্য।

সাত শতাধিক কর্মকর্তার ওএসডি অবস্থা: সূত্রমতে, জনপ্রশাসনের বিভিন্ন ব্যাচের (প্রশাসন ক্যাডার) প্রায় সাত শতাধিক কর্মকর্তা বর্তমানে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে রয়েছেন। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান উভয় সরকারের আমলেই ওএসডি বা সংযুক্ত অবস্থায় আছেন। এই কর্মকর্তাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ডেস্ক, দপ্তর, শাখা বা উইংয়ের দায়িত্ব নেই, তবুও মাস শেষে তারা নিয়মিত বেতন-ভাতা এবং চাকরির অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। বিশেষ করে, জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের ফলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা তাদের আস্থাভাজন ছিলেন, তাদের বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হচ্ছে অথবা ওএসডি করা হয়েছে। সর্বশেষ, গত ২৮ জুলাই বর্তমান সরকার ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে একযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে, যারা পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত ছিলেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমানে প্রশাসনে সিনিয়র সচিব ও সচিবের ৮৯টি পদ রয়েছে, অতিরিক্ত সচিবের ২১২টি, যুগ্ম সচিবের ৫০২টি, উপসচিবের ১ হাজার ৭৫০টি এবং সিনিয়র সহকারী সচিবের ১ হাজার ১৪৩টি পদ বিদ্যমান। এর বিপরীতে, প্রশাসনে কর্মরত সচিবের সংখ্যা ৮৩ জন, অতিরিক্ত সচিব ৩৫৩ জন, যুগ্ম সচিব ১ হাজার ২৬ জন, উপসচিব ১ হাজার ৪৮৫ জন এবং সিনিয়র সহকারী সচিবের সংখ্যা ২ হাজার ১১৯ জন। মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, উপসচিব পদ ব্যতীত অন্যান্য সকল পদে বর্তমানে কর্মকর্তার সংখ্যা অনুমোদিত পদের চেয়ে বেশি।

এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার Desi Media Point-কে জানান, প্রশাসনের মৌলিক সমস্যা স্বয়ং আমলাতন্ত্রেই নিহিত। তারা নিজেরাই দলীয় আনুগত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের নিরপেক্ষ অবস্থানকে ক্ষুণ্ণ করেছে। সকল রাজনৈতিক সরকারই প্রশাসনে দলীয়করণের প্রবণতা দেখিয়েছে। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই দলীয়করণ মাত্রাতিরিক্ত ছিল এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আমলাদের চরমভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা অতিরিক্ত দলীয় আনুগত্য দেখিয়েছেন, তাদের অপসারণ করাটা স্বাভাবিক। যারা তুলনামূলকভাবে কম দলীয় আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন, তাদের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করা যেতে পারে। তবে, এটি নিশ্চিত করা জরুরি যে কোনো ব্যক্তি যেন অন্যায়ভাবে প্রতিহিংসার শিকার না হন।

অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কোনো সরকারই মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের নিজস্ব পছন্দ ও রাজনৈতিক আদর্শের বাইরের কাউকে দায়িত্ব অর্পণ করে না। ফলস্বরূপ, একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এর ফলে সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব বা কর্মপ্রবাহের গতি হ্রাস পেলেও, সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কিছু করার থাকে না। সরকার তার আস্থাভাজন কর্মকর্তাদেরই নিয়োগ দিতে চাইবে, এবং এই ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ত্রুটি তিনি দেখছেন না।