Thu 23rd Jul 2026, 2:29 am

জীবনসঙ্গী অন্বেষণে ডেটিং অ্যাপের সীমাবদ্ধতা: আধুনিক ম্যাচমেকিংয়ের প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থা

জীবনসঙ্গী অন্বেষণে ডেটিং অ্যাপের সীমাবদ্ধতা: আধুনিক ম্যাচমেকিংয়ের প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থা
অসংখ্য প্রোফাইল আর দ্রুতগতির 'ডান-বাম' সোয়াইপের সংস্কৃতি অনলাইন ডেটিং অ্যাপগুলিকে আপাতদৃষ্টিতে প্রচুর বিকল্পের আধার মনে হলেও, বহু মানুষের জন্য তা উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতির ওপর ভিত্তি করে চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা ব্যক্তিকে আরও নিঃসঙ্গ করে তুলছে। ফলস্বরূপ, ব্যক্তিগত সংযোগ ও গভীর বোঝাপড়ার ওপর নির্ভরশীল আধুনিক ম্যাচমেকিং পরিষেবাগুলি নতুন করে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।
বিশেষ করে যারা বিবাহের উদ্দেশ্যে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক অন্বেষণ করছেন, তাদের মধ্যে এই পরিষেবাগুলির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ, এখানে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বা একটি সংক্ষিপ্ত বায়ো দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না; একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, জীবনযাপন পদ্ধতি, পারিবারিক প্রেক্ষাপট, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ সামগ্রিক দিকগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানের কর্মব্যস্ত জীবন, বিদেশে বসবাস, সামাজিক পরিসরের সংকোচন এবং ইন্টারনেট-নির্ভর দৈনন্দিনতার কারণে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রচলিত ঘটকালি প্রথায় অনেক সময় পারিবারিক প্রভাব অত্যধিক থাকে, যা ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। এই দুই বাস্তবতার মাঝামাঝি একটি কার্যকর সমাধান হিসেবেই আধুনিক ম্যাচমেকিং পরিষেবাগুলির গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশে এমনই একটি প্রখ্যাত ম্যাচমেকিং প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা নেরিসা নাশিন। তিনি জানান, একজন বন্ধুর জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে দেওয়ার অনুরোধ থেকেই এই উদ্যোগের বীজ রোপিত হয়। পরবর্তীতে ইনস্টাগ্রামে একটি স্টোরির মাধ্যমে প্রাথমিক আগ্রহ যাচাই করতে গিয়ে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সত্তরটিরও বেশি সাড়া পান। এমনকি প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর আগেই দেড় শতাধিক ব্যক্তি নিবন্ধন করেন। কোনো প্রকার প্রথাগত বিজ্ঞাপন ছাড়াই কেবল মৌখিক প্রচারে এর পরিচিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
নেরিসা আরও জানান যে, তাদের প্রতিষ্ঠান কেবল অ্যালগরিদম-নির্ভর নয়; প্রতিটি প্রোফাইল মানুষের দ্বারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়। লিংকডইন প্রোফাইল, বায়োডাটা, ছবি, ভয়েস নোটসহ বিভিন্ন তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য মিলগুলি চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে, গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হয়। তার মতে, কেবল শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা পেশাগত দিক থেকে মিল থাকলেই একটি সম্পর্ক সফল হয় না। জীবনযাপন পদ্ধতি, পারিবারিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মতো গভীর বিষয়গুলির পারস্পরিক সাযুজ্য একটি সফল সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সমস্ত দিক বিবেচনা করেই সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী খুঁজে দেওয়া হয়।
সাধারণত একটি উপযুক্ত মিল খুঁজে পেতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। তবে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি কোনো মানানসই ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হয়, তবে সেই তথ্যও গ্রাহককে স্বচ্ছতার সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয়।
নেরিসার দাবি, তাদের এই পরিষেবা কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে এবং চীনে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এই সেবা গ্রহণ করছেন। বিদেশে বসবাস করেও একই ভাষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের জীবনসঙ্গী অন্বেষণে অনেকেই এমন প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেটিং অ্যাপে মানুষ অতি দ্রুত অন্যের সম্পর্কে একটি বিচার করে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রেই কেবল একটি ছবি বা কয়েকটি লাইনের পরিচিতি দেখেই কাউকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা হয়। এতে একজন মানুষকে গভীরভাবে জানার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অন্যদিকে, আধুনিক ম্যাচমেকিং পরিষেবাগুলিতে দুজন মানুষের বিভিন্ন দিক যাচাই করতে যথেষ্ট সময় নেওয়া হয়। এর ফলে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন যে, ডেটিং অ্যাপ বা ম্যাচমেকিং—কোনোটিই একটি সফল সম্পর্কের শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। একটি সম্পর্ক টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, খোলামেলা যোগাযোগ এবং একে অপরকে গভীরভাবে বোঝার মানসিকতার ওপর।