Wed 5th Aug 2026, 3:10 am

যমজ সন্তানের স্বতন্ত্রতা চেনার কৌশল: একজন মায়ের অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টি

যমজ সন্তানের স্বতন্ত্রতা চেনার কৌশল: একজন মায়ের অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টি
চিকিৎসক যখন জানালেন যে আমার গর্ভে একটি নয়, বরং দুটি প্রাণের স্পন্দন বিদ্যমান, তখন আনন্দের এক অভাবনীয় ঢেউ মনকে প্লাবিত করল। তাৎক্ষণিকভাবে আমার সদ্যপ্রয়াত মায়ের স্মৃতি গভীরভাবে জাগ্রত হলো। কয়েক মাস আগেই তিনি আমাদের ছেড়ে অনন্তলোকে যাত্রা করেছেন। আমার স্বামী সুদীপ্ত আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, ‘যদি মা তার নাতিদের মুখ দেখতে পারতেন, তাহলে তিনি সকলের চেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন।’

সেই হাসপাতালের দিনটি আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। সফল অস্ত্রোপচারের পর যখন জানানো হলো যে আমাদের পরিবারে দুটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানের আগমন ঘটেছে – অভিনব এবং অভিরূপ, তখন সকলের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছিল। তবে এই অপার আনন্দের পাশেই এক মজার এবং অপ্রত্যাশিত বিভ্রান্তির সূত্রপাত হলো।

প্রাথমিক কয়েক সপ্তাহ ধরে এই দুই ভাইকে স্বতন্ত্রভাবে চেনা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। প্রায়শই অভিনবকে অভিরূপ এবং অভিরূপকে অভিনব বলে ডেকে ফেলতাম। ডায়াপার পরিবর্তনের সময়ও আমি দ্বিধায় পড়তাম; মনে হতো যেন এইমাত্রই বদলানো হয়েছে, কিন্তু পরে বুঝতাম সেটি ছিল অন্যজনের। এমন ঘটনায় বারবারই মজার পরিস্থিতি তৈরি হতো।

বাসায় আগত অতিথিদের প্রথম এবং প্রায় নিয়মিত প্রশ্ন ছিল, ‘এদের মধ্যে কে অভিনব আর কে অভিরূপ?’

আমরা তাদের দেখিয়ে দিতাম, কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই একই প্রশ্ন পুনরায় উত্থাপিত হতো। প্রায়শই দেখা যেত, কেউ একজনকে কোলে নিয়ে অন্যজনের নামে ডাকছেন। এমনকি কেউ কেউ বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতেন, ‘এইবার আমি সঠিকভাবেই চিনেছি!’ অথচ পরক্ষণেই তাদের অনুমান ভুল প্রমাণিত হতো, আর তখনই ঘরে হাসির ফোয়ারা ছুটতো।

এভাবে দুই ভাইকে সঠিকভাবে চেনার এক অলিখিত প্রতিযোগিতা যেন শুরু হয়ে গিয়েছিল।

৩০ জুলাই ২০২৬
অভিনব এবং অভিরূপের বয়স এখন ছয় মাস। যদিও তাদের চেহারায় এখনো গভীর সাদৃশ্য বিদ্যমান, আমি খুব সহজেই তাদের স্বতন্ত্রতা উপলব্ধি করতে পারি। দুজনের গলার স্বর, কান্নার ধরন এবং এমনকি চোখের ভাষা পর্যন্ত আমি আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে শিখেছি। একজনের হাসি দুষ্টু-মিষ্টি, অন্যদিকে অন্যজনের হাসি শান্ত ও কোমল। তাদের ঘুমের ভঙ্গিও ভিন্ন। ক্ষুধা পেলে তাদের কান্নার শব্দ আমার কান স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলাদা করে চিনতে পারে; হয়তো মাতৃত্বের এই এক আশ্চর্য ক্ষমতা!

এই প্রসঙ্গে উদ্যোক্তা সোনিয়া শারমিনের সঙ্গে আমার কথা হয়। তাঁরও যমজ সন্তান—একটি ছেলে ধ্রুব এবং একটি মেয়ে তারা। লিঙ্গ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাদের পৃথক করা কঠিন ছিল। সোনিয়া বলছিলেন, ‘প্রথম কয়েক দিন আমরা প্রায়শই ভুল করতাম। হাসপাতালে তাদের হাতে লাগানো রিস্টব্যান্ডই ছিল আমাদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়।’

তবে মাতৃত্বের এই প্রাথমিক বিভ্রান্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সোনিয়া জানালেন, ‘ধীরে ধীরে আমি তাদের হাসির ধরন দেখেই পৃথকভাবে চিনতে শিখেছি।’

০২ আগস্ট ২০২৬
আইফোন এক্স-এ যখন প্রথম ‘ফেস আইডি’ প্রযুক্তি চালু করা হয়, তখন তা বাজারে আসার পরপরই অনেকে যমজদের উপর এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে শুরু করেন। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে যমজ ভাই-বোনেরা একে অপরের মুঠোফোনের লক অনায়াসে খুলে ফেলতে সক্ষম হচ্ছে।

আইফোনের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ‘অভিন্ন যমজ’দের ক্ষেত্রে ফেস আইডি কিছুটা কম নির্ভরযোগ্য হতে পারে। কেবল যন্ত্রই নয়, মানুষকেও যমজ শিশুদের স্বতন্ত্রভাবে চিনতে বেশ বেগ পেতে হয়। উপরন্তু, এই শিশুদের একই রকম পোশাক পরানোর প্রচলিত ধারা বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে পারিবারিক ছবির অ্যালবামে তাদের পৃথকভাবে চিহ্নিত করা তখন অত্যন্ত দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়।

বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলামের দুই কন্যা, আসিফা ও সায়েফার বয়স এখন আট বছর। তাদের স্কুল থেকে আরিফুলের মুঠোফোনে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো মেয়ের অনুপস্থিতির বার্তা আসতো। কারণ, স্কুলে ‘ফেস আইডি’ ব্যবহার করে উপস্থিতি নেওয়া হতো, আর যমজ দুই বোনের চেহারার অভিন্নতার কারণে উপস্থিতি যন্ত্রটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়তো। ফলস্বরূপ, তখন থেকে স্কুলে কাগজ-কলমের মাধ্যমে এই দুই বোনের উপস্থিতি আলাদাভাবে নথিভুক্ত করা হয়।

তবে কেবল প্রযুক্তিগত যন্ত্রই নয়, আরিফুল নিজেও এমন বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিলেন। হাসপাতাল থেকে একই রঙের চাদরে মোড়ানো অবস্থায় সন্তানদের বাসায় আনার পর তিনি তাদের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে একজনের হাতে একটি ছোট্ট জন্মদাগ দেখে তিনি তাদের চিনতে সক্ষম হন।

আরিফুল এখন তার দুই মেয়েকে সহজেই পৃথক করতে পারেন। তবে কখনো যদি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়, তিনি তখন মেয়েদের খাবারের অভ্যাসের দিকে নজর দেন। দুই মেয়ের খাবারের পছন্দ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলছিলেন, ‘খাবারের ক্ষেত্রে ওদের পছন্দ একেবারেই আলাদা। বেশিরভাগ যমজ শিশুর মধ্যেই এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। ওরা কে কোন খাবার বেছে নিচ্ছে, তা দেখেই আমি তাদের আলাদা করে চিনতে পারি।’

এই ধরনের বিভ্রান্তি এড়াতে কিছু মজার কিন্তু কার্যকরী নিয়ম অনুসরণ করা যেতে পারে। বিশেষত পারিবারিক সমাবেশ বা অনুষ্ঠানগুলোতে:

ছবি তোলার সময়, একজনকে সর্বদা ডান বা বাঁ – একটি নির্দিষ্ট পাশে রাখতে পারেন।
তাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নকশার পোশাক নির্বাচন করুন।
পৃথক রঙ ব্যবহার করতে পারেন; যেমন, একজনের জিনিসপত্র লাল হলে অন্যজনের জন্য সবুজ রঙ বেছে নিন।
তাদের নখে ভিন্ন রঙের নেইল পলিশ ব্যবহার করাও একটি উপায় হতে পারে।
যদি কোনো জন্মদাগ বা তিলের মতো সূক্ষ্ম চিহ্ন থাকে, তবে সেটির দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখুন।