প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা কিসে নিহিত? এটি নিহিত রয়েছে সেই জ্ঞান উপলব্ধিতে, কখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত থাকতে হয়, এবং সেই পরিস্থিতিতে নিজেকে সংবরণ করে পরিপক্ব আচরণ প্রদর্শনে।
আমি নিজেকে এতদিন বুদ্ধিমান রূপেই গণ্য করে এসেছি। আমার দ্রুত চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা রয়েছে; বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে অনায়াসে সংযোগ স্থাপন করতে পারি এবং প্রায়শই অন্যের প্রশ্ন শেষ হওয়ার পূর্বেই আমার মনে উত্তর এসে যায়। আমাদের অনেকের কাছেই, এবং আমার নিজের কাছেও, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক মনে হয়। কিন্তু কালক্রমে আমি উপলব্ধি করেছি যে এই ধারণা সর্বদা সঠিক নয়।
আমার স্ত্রীর মধ্যে এক স্বতন্ত্র ধরনের বুদ্ধিমত্তা পরিলক্ষিত হয়, যা একসময় আমাকে বিচলিত করত। সে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়, বিরতি নেয়। এ বিরতি কেবল কয়েক সেকেন্ডের নয়, কখনো কখনো তা আমার ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে যায়। এই তীব্র নীরবতার শূন্যতা আমি নিজেই দ্রুত পূরণ করে দিতে চাই।
তবে সে কখনোই তড়িঘড়ি করে না। বিষয়টি নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য স্থির থাকে, তারপর শান্ত মস্তিষ্কে চিন্তা করে। আমার মতো যারা বুদ্ধিমত্তাকে গতির সমার্থক মনে করেন, তাদের কাছে এই বিরতি অস্বস্তি ও দ্বিধার জন্ম দিতে পারে, যেন ইঞ্জিন চলছে কিন্তু রথ অচল।
আমাদের অনেকেরই বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে ধারণা কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট। আমরা মনে করি, সর্বাধিক জ্ঞান আহরণ, সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তি, দ্রুততম বচনভঙ্গি কিংবা বিতর্কে বিজয়ী হওয়াই বুদ্ধিমত্তার চূড়ান্ত প্রমাণ। যেন দ্রুততা আর প্রজ্ঞা অভিন্ন সত্তা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আমি বুঝেছি যে, সবচেয়ে দ্রুত উত্তর দেওয়া আর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উত্তর দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।
স্টোয়িক দার্শনিকেরা এই বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন। তাঁদের মতে, বুদ্ধিমত্তার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় আপনি কতটা জানেন, তাতে নয়; বরং আপনি কীভাবে কোনো ঘটনার প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তাতেই নিহিত।
রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের জীবনে চাপ এবং প্রত্যাশার কোনো সীমা ছিল না। স্বীকার্য, তাঁর পারিপার্শ্বিকে অসংখ্য অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তি বিদ্যমান ছিলেন। কিন্তু তিনি সবার থেকে স্বতন্ত্র ছিলেন; কারণ পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে না থাকলেও তিনি নিজেকে কখনো হারিয়ে ফেলতেন না, বরং নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন। এই গুণটিই অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
দিকনির্দেশনাহীন শক্তি শেষ পর্যন্ত কেবল ক্ষতির কারণ হয়। আমি প্রায়শই সেই প্রথম ঘোড়াটির মতো। তাই আমি আমার গতিপথের লাগাম স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছি। যখন আমি দ্রুত এগিয়ে যেতে চাই, সে তখন আমাকে ক্ষণিকের জন্য থামায়। উদাহরণস্বরূপ, দুজন ব্যক্তি একই খারাপ সংবাদ শুনলেন। একজন তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানালেন, সমস্যা সমাধানের তাড়না থেকে কিছু একটা করার চেষ্টা করলেন, যেন এক্ষুনি কিছু না কিছু করতেই হবে। বাইরে থেকে এটিকে অত্যন্ত কার্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু তড়িঘড়িতে সাধারণত এমন কথা বলা হয় যা বলা উচিত ছিল না, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়।
অন্যজন দ্রুত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে স্থির হলেন। উদাসীনতার কারণে নয়, বরং বিষয়টি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলেই। তিনি নিজের অনুভূতিকে কিছুটা স্থান দিলেন। আর সেই সংক্ষিপ্ত বিরতির মধ্যেই এক ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হলো। কাগজে-কলমে দুজনের বুদ্ধিমত্তা হয়তো একই, কিন্তু ফলাফল ভিন্ন।
একটি রথ দুটি অশ্ব দ্বারা চালিত হচ্ছে। একটি শক্তিশালী, দ্রুত এবং অস্থির, সামান্য ইশারাতেই ছুটে যেতে চায়। অন্যটি শান্ত, নিয়ন্ত্রিত ও স্থির। রথচালকের কাজ প্রথম অশ্বটিকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
কারণ, দিকনির্দেশনাহীন শক্তি শেষ পর্যন্ত কেবল ক্ষতি ডেকে আনে। আমি প্রায়শই সেই প্রথম অশ্বটির মতো। তাই আমি আমার গতিপথের লাগাম স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছি। যখন আমি দ্রুত এগোতে চাই, সে তখন আমাকে ক্ষণিকের জন্য থামিয়ে একটি অত্যন্ত সাধারণ প্রশ্ন করে— 'আসলে এখানে কী ঘটছে?' এই একটি প্রশ্ন আমাকে কতবার যে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে ফিরিয়ে এনেছে, তা নিরূপণ করা কঠিন।
দার্শনিক এপিকটিটাস বলেছিলেন, 'আপনার সঙ্গে কী ঘটল, তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি তার প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানালেন।' বিষয়টি শুনতে সরল মনে হলেও বাস্তবে মোটেও সহজ নয়। কারণ, কোনো ঘটনা ঘটার পর এবং আপনার প্রতিক্রিয়ার মাঝখানে একটি ক্ষুদ্র ব্যবধান থাকে। সেই ব্যবধানের মধ্যেই প্রকৃত উত্তর নিহিত থাকে।
একটি উত্তপ্ত বস্তুর কথা চিন্তা করুন। খুব দ্রুত ধরলে হাত পুড়ে যাবে। আবার অনেক দেরি করলে সেটি ঠান্ডা হয়ে কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক সময়ে ধরতে পারলে সেটিকে নিজের মতো করে গড়ে তোলা যায়। অনুভূতিগুলোও অনেকটা এমনই।
খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিলে তা এমন এক অবস্থানে চলে যায়, যা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে; যেখানে আপনি বিষয়টিকে নিয়ে যেতে চাননি। আবার খুব বেশি দেরি করলেও মুহূর্তটি হারিয়ে যায়। কিন্তু যথেষ্ট সময় নিয়ে, স্থির থেকে, সেটিকে ভিন্নভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমার স্ত্রী ঠিক সেটাই করে। তার নিজেকে প্রমাণ করার কোনো তাড়া নেই। 'জিততেই হবে'—এই মানসিকতাই তার মধ্যে অনুপস্থিত।
আবেগের নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত কাঁচা বুদ্ধিমত্তা হয়তো দৃশ্যত চমৎকার লাগে, কিন্তু এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমস্যা হ্রাস না করে বরং বৃদ্ধি করে। আমি আমার নিজের জীবনেই এটি প্রত্যক্ষ করেছি। খুব দ্রুত অগ্রসর হতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে কী প্রয়োজন ছিল, সেটাই আমি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি।
আমার স্ত্রী তা করে না। সে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। আর যখন সে তা করে, সেটি সঠিক স্থানে গিয়ে পৌঁছায়। সেটি উচ্চকণ্ঠ বা ধারালো নয়; বরং আরও নির্ভুল এবং কার্যকরভাবে।
সুতরাং, হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে আমার স্ত্রী আমার চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান। সে বেশি জানে বলে নয়, কিংবা দ্রুত ভাবে বলেও নয়; বরং সে জানে, কখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিকোণ থেকে:
রাউফুন নাহার, সহকারী অধ্যাপক, এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট মন্তব্য করেছেন:
বিষয়টি অবশ্যই ব্যক্তিভেদে স্বতন্ত্র। এটি ড. টমাস জেফরির ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত। তবে ঢালাওভাবে বলা যাবে না যে সমস্যা সমাধানে নারীরা বেশি 'পজ-প্র্যাকটিস' করেন, পুরুষেরা কম। এ বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল উঠে এসেছে।
আমাদের মস্তিষ্কের একটি অংশ আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়। তবে 'পজ-প্র্যাকটিস' এর মাধ্যমে সাধারণত সমস্যা সমাধানকারী যৌক্তিক অংশকে সঙ্গে নিয়ে আবেগ ও যুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে সঠিক, টেকসই ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়।
আমরা সাধারণত বলে থাকি 'যত গতি তত ক্ষতি'। এটি পূর্বে উল্লিখিত অশ্বের উদাহরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যে সিদ্ধান্ত যত দ্রুত নেওয়া হয়, সেটি ভুল হওয়ার আশঙ্কা তত বেশি। তাই গতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।
নারী না পুরুষ কারা বেশি 'পজ-প্র্যাকটিস' করে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, অ্যাটাচমেন্ট থিওরি অনুসারে, নারীদের মধ্যে আবেগীয় সত্তার অধিক ব্যবহার, দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার প্রবণতা বা সম্পর্কে আবেগীয়ভাবে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বেশি লক্ষণীয়। আমাদের মতো রক্ষণশীল সমাজের জন্য তা আরও বেশি প্রযোজ্য।
পার্থক্য কোথায়? নারীরা সহনশীলতা প্রদর্শন করতে চান; তাঁরা চান পুরুষ তাঁদের কথা শুনুক এবং সময় দিক। অন্যদিকে, পুরুষদের বৈশিষ্ট্য হলো 'এই আছি, এই নেই'। এর পেছনে মেয়েশিশু ও ছেলেশিশুর প্রতি প্যারেন্টিংয়ে ভিন্নতা এবং কিছু হরমোনাল প্রভাবও বিদ্যমান।
মেয়েদের মধ্যে অক্সিটোসিন হরমোনের প্রভাবে সহানুভূতির আবেগ অধিক কার্যকর থাকে। ইস্ট্রোজেন হরমোন মায়া বা সন্তানের সঙ্গে আবেগ ও ভালোবাসার বন্ধন তৈরিতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ছেলেশিশুকে যদি প্যারেন্টিংয়ের শুরু থেকেই সহানুভূতি, মায়া, আবেগের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ শেখানো হয়, তবে তার ভেতরে অক্সিটোসিন, ইস্ট্রোজেন হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়।
একই ব্যাপার ঘটে নতুন বাবারা যখন সদ্যজাত শিশুর সঙ্গে সময় কাটান। তখন তাঁদের ভেতরেও এই সহানুভূতি, মায়া ও বন্ধনের অনুভূতি অধিক কার্যকর হয়।
শেষ কথা: এককথায় বলতে গেলে, পুরো বিষয়টি যথেষ্ট জটিল। তাই হুট করে মন্তব্য করা কঠিন। কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি সব সময় কেবল যৌক্তিক অংশ ব্যবহার করাও এক ধরনের 'টক্সিক পজিটিভিটি'। এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়েই পরিস্থিতি বুঝে প্রতিক্রিয়া দেখানোই বিচক্ষণতা।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে
আমি নিজেকে এতদিন বুদ্ধিমান রূপেই গণ্য করে এসেছি। আমার দ্রুত চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা রয়েছে; বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে অনায়াসে সংযোগ স্থাপন করতে পারি এবং প্রায়শই অন্যের প্রশ্ন শেষ হওয়ার পূর্বেই আমার মনে উত্তর এসে যায়। আমাদের অনেকের কাছেই, এবং আমার নিজের কাছেও, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক মনে হয়। কিন্তু কালক্রমে আমি উপলব্ধি করেছি যে এই ধারণা সর্বদা সঠিক নয়।
আমার স্ত্রীর মধ্যে এক স্বতন্ত্র ধরনের বুদ্ধিমত্তা পরিলক্ষিত হয়, যা একসময় আমাকে বিচলিত করত। সে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়, বিরতি নেয়। এ বিরতি কেবল কয়েক সেকেন্ডের নয়, কখনো কখনো তা আমার ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে যায়। এই তীব্র নীরবতার শূন্যতা আমি নিজেই দ্রুত পূরণ করে দিতে চাই।
তবে সে কখনোই তড়িঘড়ি করে না। বিষয়টি নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য স্থির থাকে, তারপর শান্ত মস্তিষ্কে চিন্তা করে। আমার মতো যারা বুদ্ধিমত্তাকে গতির সমার্থক মনে করেন, তাদের কাছে এই বিরতি অস্বস্তি ও দ্বিধার জন্ম দিতে পারে, যেন ইঞ্জিন চলছে কিন্তু রথ অচল।
আমাদের অনেকেরই বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে ধারণা কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট। আমরা মনে করি, সর্বাধিক জ্ঞান আহরণ, সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তি, দ্রুততম বচনভঙ্গি কিংবা বিতর্কে বিজয়ী হওয়াই বুদ্ধিমত্তার চূড়ান্ত প্রমাণ। যেন দ্রুততা আর প্রজ্ঞা অভিন্ন সত্তা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আমি বুঝেছি যে, সবচেয়ে দ্রুত উত্তর দেওয়া আর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উত্তর দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।
স্টোয়িক দার্শনিকেরা এই বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন। তাঁদের মতে, বুদ্ধিমত্তার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় আপনি কতটা জানেন, তাতে নয়; বরং আপনি কীভাবে কোনো ঘটনার প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তাতেই নিহিত।
রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের জীবনে চাপ এবং প্রত্যাশার কোনো সীমা ছিল না। স্বীকার্য, তাঁর পারিপার্শ্বিকে অসংখ্য অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তি বিদ্যমান ছিলেন। কিন্তু তিনি সবার থেকে স্বতন্ত্র ছিলেন; কারণ পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে না থাকলেও তিনি নিজেকে কখনো হারিয়ে ফেলতেন না, বরং নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন। এই গুণটিই অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
দিকনির্দেশনাহীন শক্তি শেষ পর্যন্ত কেবল ক্ষতির কারণ হয়। আমি প্রায়শই সেই প্রথম ঘোড়াটির মতো। তাই আমি আমার গতিপথের লাগাম স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছি। যখন আমি দ্রুত এগিয়ে যেতে চাই, সে তখন আমাকে ক্ষণিকের জন্য থামায়। উদাহরণস্বরূপ, দুজন ব্যক্তি একই খারাপ সংবাদ শুনলেন। একজন তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানালেন, সমস্যা সমাধানের তাড়না থেকে কিছু একটা করার চেষ্টা করলেন, যেন এক্ষুনি কিছু না কিছু করতেই হবে। বাইরে থেকে এটিকে অত্যন্ত কার্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু তড়িঘড়িতে সাধারণত এমন কথা বলা হয় যা বলা উচিত ছিল না, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়।
অন্যজন দ্রুত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে স্থির হলেন। উদাসীনতার কারণে নয়, বরং বিষয়টি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলেই। তিনি নিজের অনুভূতিকে কিছুটা স্থান দিলেন। আর সেই সংক্ষিপ্ত বিরতির মধ্যেই এক ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হলো। কাগজে-কলমে দুজনের বুদ্ধিমত্তা হয়তো একই, কিন্তু ফলাফল ভিন্ন।
একটি রথ দুটি অশ্ব দ্বারা চালিত হচ্ছে। একটি শক্তিশালী, দ্রুত এবং অস্থির, সামান্য ইশারাতেই ছুটে যেতে চায়। অন্যটি শান্ত, নিয়ন্ত্রিত ও স্থির। রথচালকের কাজ প্রথম অশ্বটিকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
কারণ, দিকনির্দেশনাহীন শক্তি শেষ পর্যন্ত কেবল ক্ষতি ডেকে আনে। আমি প্রায়শই সেই প্রথম অশ্বটির মতো। তাই আমি আমার গতিপথের লাগাম স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছি। যখন আমি দ্রুত এগোতে চাই, সে তখন আমাকে ক্ষণিকের জন্য থামিয়ে একটি অত্যন্ত সাধারণ প্রশ্ন করে— 'আসলে এখানে কী ঘটছে?' এই একটি প্রশ্ন আমাকে কতবার যে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে ফিরিয়ে এনেছে, তা নিরূপণ করা কঠিন।
দার্শনিক এপিকটিটাস বলেছিলেন, 'আপনার সঙ্গে কী ঘটল, তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি তার প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানালেন।' বিষয়টি শুনতে সরল মনে হলেও বাস্তবে মোটেও সহজ নয়। কারণ, কোনো ঘটনা ঘটার পর এবং আপনার প্রতিক্রিয়ার মাঝখানে একটি ক্ষুদ্র ব্যবধান থাকে। সেই ব্যবধানের মধ্যেই প্রকৃত উত্তর নিহিত থাকে।
একটি উত্তপ্ত বস্তুর কথা চিন্তা করুন। খুব দ্রুত ধরলে হাত পুড়ে যাবে। আবার অনেক দেরি করলে সেটি ঠান্ডা হয়ে কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক সময়ে ধরতে পারলে সেটিকে নিজের মতো করে গড়ে তোলা যায়। অনুভূতিগুলোও অনেকটা এমনই।
খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিলে তা এমন এক অবস্থানে চলে যায়, যা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে; যেখানে আপনি বিষয়টিকে নিয়ে যেতে চাননি। আবার খুব বেশি দেরি করলেও মুহূর্তটি হারিয়ে যায়। কিন্তু যথেষ্ট সময় নিয়ে, স্থির থেকে, সেটিকে ভিন্নভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমার স্ত্রী ঠিক সেটাই করে। তার নিজেকে প্রমাণ করার কোনো তাড়া নেই। 'জিততেই হবে'—এই মানসিকতাই তার মধ্যে অনুপস্থিত।
আবেগের নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত কাঁচা বুদ্ধিমত্তা হয়তো দৃশ্যত চমৎকার লাগে, কিন্তু এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমস্যা হ্রাস না করে বরং বৃদ্ধি করে। আমি আমার নিজের জীবনেই এটি প্রত্যক্ষ করেছি। খুব দ্রুত অগ্রসর হতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে কী প্রয়োজন ছিল, সেটাই আমি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি।
আমার স্ত্রী তা করে না। সে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। আর যখন সে তা করে, সেটি সঠিক স্থানে গিয়ে পৌঁছায়। সেটি উচ্চকণ্ঠ বা ধারালো নয়; বরং আরও নির্ভুল এবং কার্যকরভাবে।
সুতরাং, হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে আমার স্ত্রী আমার চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান। সে বেশি জানে বলে নয়, কিংবা দ্রুত ভাবে বলেও নয়; বরং সে জানে, কখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিকোণ থেকে:
রাউফুন নাহার, সহকারী অধ্যাপক, এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট মন্তব্য করেছেন:
বিষয়টি অবশ্যই ব্যক্তিভেদে স্বতন্ত্র। এটি ড. টমাস জেফরির ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত। তবে ঢালাওভাবে বলা যাবে না যে সমস্যা সমাধানে নারীরা বেশি 'পজ-প্র্যাকটিস' করেন, পুরুষেরা কম। এ বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল উঠে এসেছে।
আমাদের মস্তিষ্কের একটি অংশ আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়। তবে 'পজ-প্র্যাকটিস' এর মাধ্যমে সাধারণত সমস্যা সমাধানকারী যৌক্তিক অংশকে সঙ্গে নিয়ে আবেগ ও যুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে সঠিক, টেকসই ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়।
আমরা সাধারণত বলে থাকি 'যত গতি তত ক্ষতি'। এটি পূর্বে উল্লিখিত অশ্বের উদাহরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যে সিদ্ধান্ত যত দ্রুত নেওয়া হয়, সেটি ভুল হওয়ার আশঙ্কা তত বেশি। তাই গতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।
নারী না পুরুষ কারা বেশি 'পজ-প্র্যাকটিস' করে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, অ্যাটাচমেন্ট থিওরি অনুসারে, নারীদের মধ্যে আবেগীয় সত্তার অধিক ব্যবহার, দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার প্রবণতা বা সম্পর্কে আবেগীয়ভাবে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বেশি লক্ষণীয়। আমাদের মতো রক্ষণশীল সমাজের জন্য তা আরও বেশি প্রযোজ্য।
পার্থক্য কোথায়? নারীরা সহনশীলতা প্রদর্শন করতে চান; তাঁরা চান পুরুষ তাঁদের কথা শুনুক এবং সময় দিক। অন্যদিকে, পুরুষদের বৈশিষ্ট্য হলো 'এই আছি, এই নেই'। এর পেছনে মেয়েশিশু ও ছেলেশিশুর প্রতি প্যারেন্টিংয়ে ভিন্নতা এবং কিছু হরমোনাল প্রভাবও বিদ্যমান।
মেয়েদের মধ্যে অক্সিটোসিন হরমোনের প্রভাবে সহানুভূতির আবেগ অধিক কার্যকর থাকে। ইস্ট্রোজেন হরমোন মায়া বা সন্তানের সঙ্গে আবেগ ও ভালোবাসার বন্ধন তৈরিতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ছেলেশিশুকে যদি প্যারেন্টিংয়ের শুরু থেকেই সহানুভূতি, মায়া, আবেগের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ শেখানো হয়, তবে তার ভেতরে অক্সিটোসিন, ইস্ট্রোজেন হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়।
একই ব্যাপার ঘটে নতুন বাবারা যখন সদ্যজাত শিশুর সঙ্গে সময় কাটান। তখন তাঁদের ভেতরেও এই সহানুভূতি, মায়া ও বন্ধনের অনুভূতি অধিক কার্যকর হয়।
শেষ কথা: এককথায় বলতে গেলে, পুরো বিষয়টি যথেষ্ট জটিল। তাই হুট করে মন্তব্য করা কঠিন। কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি সব সময় কেবল যৌক্তিক অংশ ব্যবহার করাও এক ধরনের 'টক্সিক পজিটিভিটি'। এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়েই পরিস্থিতি বুঝে প্রতিক্রিয়া দেখানোই বিচক্ষণতা।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে
