Tue 1st Sep 2026, 11:13 am

সঠিক সময়ে না ঘুমালে আট ঘণ্টা ঘুমও ডেকে আনতে পারে দ্রুত বার্ধক্য

সঠিক সময়ে না ঘুমালে আট ঘণ্টা ঘুমও ডেকে আনতে পারে দ্রুত বার্ধক্য
মানবদেহের অভ্যন্তরে অবিরাম জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। এই প্রক্রিয়াগুলো মূলত দেহঘড়ি বা বায়োলজিক্যাল ক্লকের সময়সূচি অনুসারে পরিচালিত হয়, যা দিন ও রাতের পরিবর্তনের সাথে এদের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে। আপনার ঘুমের সময় এই প্রক্রিয়াগুলির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত, এবং এখানেই তারুণ্য বজায় রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ রহস্য নিহিত।

উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি রাত ১০টায় ঘুমাতে গিয়ে ভোর ৬টায় ওঠেন, যেখানে অন্য একজন রাত ২টায় ঘুমাতে গিয়ে সকাল ১০টায় জাগেন। উভয়ই আট ঘণ্টা ঘুমালেন, কিন্তু তাদের শরীরে ঘুমের প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে।

যদিও উভয়ের ঘুমের সময়কাল আট ঘণ্টা, যা পর্যাপ্ত বলে বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু একজন তার দেহঘড়ির প্রাকৃতিক ছন্দের বিপরীতে ভুল সময়ে ঘুমাচ্ছেন।

রাত মানবজাতির জন্য বিশ্রামের প্রাকৃতিক সময়। এই সময়েই ঘুমের গুণগত মান সর্বোত্তম থাকে।

গোধূলি লগ্নে অন্ধকার ঘনীভূত হওয়ার সাথে সাথে শরীর ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে, এবং এই সময়ে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়।

মেলাটোনিন হলো ঘুমের নিয়ন্ত্রক হরমোন। দিনের আলো ঘরে প্রবেশ করার সাথে সাথে মেলাটোনিনের মাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করে। একই সময়ে, ভোররাতে কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বাড়তে থাকে, যা সাধারণত 'স্ট্রেস হরমোন' নামে পরিচিত এবং আমাদের দৈনন্দিন কর্মোদ্যমের সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

এই সমস্ত জৈব-রাসায়নিক ও পরিবেশগত উপাদানের সম্মিলিত প্রভাব মানবদেহে প্রতিফলিত হয়। ফলস্বরূপ, যাদের ঘুমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোরের আলোর পর হয়, সাধারণত তাদের ঘুমের গুণগত মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে থাকে না।

উপরন্তু, দিনের আলো, কোলাহল এবং পারিপার্শ্বিক কর্মচাঞ্চল্য গভীর ঘুমের পথে বাধা সৃষ্টি করে। রাত ১০টায় ঘুমালে যে সুগভীর ঘুম অর্জিত হয়, রাত ২টায় ঘুমাতে গেলে তা সম্ভব হয় না।

মানসম্মত ঘুমের সময় একজন ব্যক্তি নিয়মিত বিরতিতে গভীর ও অগভীর ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রবেশ করেন। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য এই গভীর ও অগভীর ঘুমের চক্রটি সঠিকভাবে বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই চক্রটি আলো-অন্ধকারের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত এবং এর সাথে বিভিন্ন হরমোনের নিঃসরণও গভীরভাবে সংযুক্ত।

ঘুমের গভীরতম পর্যায়ে গ্রোথ হরমোনের সর্বোচ্চ নিঃসরণ ঘটে। এটি ক্রমবর্ধমান বয়সে সঠিক শারীরিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য, যা অনেকেই জানেন। তবে, প্রাপ্তবয়স্কদের দেহের প্রতিদিনের ক্ষয়পূরণ এবং মেরামতের জন্যও গ্রোথ হরমোন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, ঘুমের গুণগত মান যদি ভালো না হয়, তাহলে আট ঘণ্টা ঘুমানোর পরেও আপনি সম্পূর্ণ সতেজ অনুভব করবেন না।

রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিন, কর্টিসল, গ্রোথ হরমোন এবং অন্যান্য বহু হরমোনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সঠিক সময়ে ঘুম না হলে এই হরমোনগুলির সূক্ষ্ম ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে।

এমনকি ক্ষুধা উদ্দীপক হরমোন (ঘেরলিন) এবং তৃপ্তি নিয়ন্ত্রক হরমোন (লেপটিন)-এর ভারসাম্যও ব্যাহত হতে পারে।

যদি দেহের দৈনন্দিন ক্ষয়পূরণ প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন না হয় এবং এই অবস্থা দিনের পর দিন চলতে থাকে, তাহলে যে কেউ অকালে বার্ধক্যের শিকার হতে পারেন। হরমোনগুলির ভারসাম্যহীনতা শরীর ও মনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পর্যাপ্ত ঘুমের পরেও ক্লান্তিভাব বজায় থাকতে পারে। মেজাজ সহজেই খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে এবং মানসিক চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর ফলে ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকের মতো দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়।

ত্বকের স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা হ্রাস পেতে পারে, যার ফলে অল্প বয়সেই বলিরেখা দেখা দিতে পারে।

অতএব, সুস্থ জীবন এবং তারুণ্য ধরে রাখার জন্য কেবল ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমালেই হবে না, বরং সঠিক সময়ে ঘুমানো অপরিহার্য।

নিম্নলিখিত বিষয়গুলি মনোযোগ সহকারে পালন করুন—

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সকালে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলোতে সময় কাটান।

প্রয়োজনে দিনের বেলায় স্বল্প সময়ের জন্য 'ন্যাপ' নিতে পারেন, যা ক্ষতিকর নয়। তবে, আপনার ঘুমের প্রধান অংশ যেন রাতেই হয়, রাতের ঘুম রাতে সম্পন্ন করুন।

ঘুমের সময় কক্ষকে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট হন। প্রয়োজনে চোখের জন্য 'আই মাস্ক' ব্যবহার করতে পারেন।

যদি একান্তই রাতের শিফটে কাজ করার প্রয়োজন হয়, তবে দিনের বেলায় ঘুমের জন্য যতটা সম্ভব রাতের মতো অন্ধকার ও শান্ত পরিবেশ তৈরি করে ঘুমান। বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত রাত জাগা পরিহার করুন।

প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কিশোর-কিশোরীদের এবং শিশুদের ঘুমের চাহিদা অনেক বেশি। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য রাতের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।