Sun 6th Sep 2026, 5:19 pm

টিকটক সিইও-এর তরুণ প্রজন্মের প্রতি অনুপ্রেরণামূলক বার্তা

টিকটক সিইও-এর তরুণ প্রজন্মের প্রতি অনুপ্রেরণামূলক বার্তা
আজ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার স্মরণে আসছে সিঙ্গাপুরে কাটানো আমার শৈশবের সেই অনিশ্চিত পথপরিক্রমা, যা আমাকে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করেছে। পেছনের দিনগুলোতে ফিরে তাকালে উপলব্ধি হয়, শিক্ষাই সেই শাশ্বত পাসপোর্ট যার কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই। বস্তুত, শিক্ষাই আপনার পৃথিবীর সীমারেখাকে নিরন্তর প্রসারিত করে।

আমার জন্ম আশির দশকে, সিঙ্গাপুরের ইউকাং অঞ্চলে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে আমি নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে খুব একটা কল্পনা করতে পারতাম না। আমার পাড়া, প্রাত্যহিক রুটিন এবং পরিচিত পরিবেশই ছিল আমার পৃথিবী। তবে একসময় দেশের অন্য প্রান্তে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের একটি অসাধারণ সুযোগ আসে। ইউকাং থেকে বুকিত তিমাহ ভৌগোলিকভাবে হয়তো খুব বেশি দূরে ছিল না, কিন্তু সেই অল্পবয়সী ছেলেটির জন্য এটি ছিল এক বিশাল পদক্ষেপ। এই নতুন অভিজ্ঞতা আমাকে আমার 'স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডি' থেকে বেরিয়ে আসতে উৎসাহিত করেছিল।

এই উপাখ্যানটি প্রকৃতপক্ষে সমগ্র সিঙ্গাপুরের প্রতিচ্ছবি। ভৌগোলিকভাবে আমরা হয়তো একটি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র, কিন্তু আমাদের অদম্য কৌতূহল এবং প্রতিকূলতা জয়ের সক্ষমতাই বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমাদের এক সুবিশাল প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করেছে।

এখন আপনাদের সেই প্রভাব বিস্তারের যুগ। প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের কর্মপ্রচেষ্টা তুলে ধরার সুযোগ আজ আপনাদের হাতে। গভীর ও বিশেষায়িত একাডেমিক জ্ঞান, অদম্য আবেগ এবং প্রচলিত ধারাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রস্তুতি নিয়েই আপনারা স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

আমার চলার পথ হয়তো আপনাদের থেকে ভিন্ন ছিল, তবে আমার কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে আমি কৌতূহলকে অনুসরণ করেছি। শৈশব থেকেই আমার এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, সাধারণ প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রমী কিছু করার মাধ্যমেই প্রকৃত প্রভাব সৃষ্টি করা সম্ভব। যখন আমি শিশু ছিলাম, আমার বাবা একটি '২৮৬' কম্পিউটার (আশির দশকের একটি জনপ্রিয় ব্যক্তিগত কম্পিউটার) কিনেছিলেন। এর সামনে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতাম। যদিও চমৎকার কোনো সফটওয়্যার তৈরির কথা বলতে পারলে আমি আনন্দিত হতাম, তবে বাস্তবতা হলো, আমি মূলত অনেক গেম খেলতাম। তবুও, কিবোর্ডের সামনে কাটানো সেই সময়গুলো প্রযুক্তির প্রতি আমার অনুরাগ আরও গভীর করে তুলেছিল।

পরবর্তীতে আমি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে অর্থনীতি অধ্যয়ন করি এবং বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাক্সে কর্মজীবন শুরু করি। এরপর হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে এমবিএ ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি হই। বিশ্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গতিপ্রকৃতি বোঝার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই আমি এই পথ বেছে নিয়েছিলাম। সেই সময়েই নতুন উদ্ভাবনী ধারণা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আসতে শুরু করে। আমার চোখের সামনেই এক বিশাল রূপান্তর সংঘটিত হচ্ছিল; পারিপার্শ্বিকতার দ্রুত পরিবর্তন বাস্তবিকই আমাকে বিস্মিত করেছিল।

সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তির প্রতি আমার শৈশবের সেই সুপ্ত আকর্ষণ পুনরায় জাগরিত হলো। প্রকৃত কৌতূহলের এটিই সবচেয়ে সুন্দর দিক—এর ভিত্তি অত্যন্ত সুদৃঢ়। এই কৌতূহল শেষ পর্যন্ত আপনাকে সেই পথে ফিরিয়ে আনে যেখানে আপনার প্রকৃত আবেগ নিহিত। আমি এমন প্রযুক্তির অংশ হতে চেয়েছিলাম, যা সমগ্র বিশ্বকে বদলে দেবে; যা মানুষের জগৎকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে। আমি আর শুধু দর্শক হিসেবে পাশ থেকে চেয়ে থাকতে রাজি ছিলাম না।

অচিরেই আমি উপলব্ধি করি যে, ফিনান্সে আমার অভিজ্ঞতা প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন হতে পারে। অ্যানালগ যুগে বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে ডিজিটাল রূপান্তরের যুগে কর্মজীবন গঠন, এবং বর্তমানে এআই যুগে টিকটকের নেতৃত্ব প্রদান—এই সকল অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছি—প্রযুক্তি কেবল হার্ডওয়্যার বা কোডিং এর সমষ্টি নয়; প্রযুক্তি হলো মানুষের সুপ্ত সম্ভাবনাকে উন্মোচন করা; কোটি কোটি মানুষের কাছে একটি ধারণা পৌঁছে দেওয়া; এবং যার একটি গল্প বলার আছে, তাকে একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করিয়ে দেওয়া।

এখন আপনাদের নেতৃত্ব প্রদানের সময়। আপনারা কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন এক নতুন, অপরিচিত এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) যুগে। ইতিহাসের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ সন্ধিক্ষণে আমরা উপনীত, যেখানে পরিবর্তন শুধু সাধারণ গতিতে নয়, বরং চক্রবৃদ্ধি হারে এবং অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সংঘটিত হচ্ছে।

এই সময়কালকে আপনারা কীভাবে মোকাবিলা করবেন? আমার শৈশবে যদি এমন সুযোগ পেতাম, আমি কী করতাম? আমি আপনাদের বলব—অজানাকে কৌতূহল সহকারে অন্বেষণ করুন। এমন সব পরিস্থিতিতে নিজেকে যুক্ত করুন যেখানে আপনিই সবচেয়ে অনভিজ্ঞ। অনিশ্চয়তাকে স্বাগত জানান। আপনার মেধাবী সহপাঠীদের নিয়ে গঠিত নেটওয়ার্কের উপর আস্থা রাখুন, কারণ এইরাই আপনার সমাজ বা সম্প্রদায়, এবং কঠিন সময়ে এই সম্প্রদায়ই আমাদের টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

শিক্ষার এই 'পাসপোর্ট' আপনাদের যেখানেই নিয়ে যাক না কেন, কৌতূহলকে সবসময় সঙ্গী করে রাখুন। কারণ, কৌতূহলই আপনাদের সামনে নতুন বিশ্বের মানচিত্র উন্মোচন করবে। পরিশেষে, আমি বলতে চাই, আপনাদের সৃজনশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ আনন্দকে বাঁচিয়ে রাখুন। কারণ, আপনারাই সেই প্রজন্ম, যারা ইতিবাচক উদ্ভাবনের এক নতুন যুগের সূচনা করবে।