Sat 19th Sep 2026, 3:34 pm

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষা: সুপ্ত ভূকম্পন ফাটলগুলির সক্রিয়তা

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষা: সুপ্ত ভূকম্পন ফাটলগুলির সক্রিয়তা
উত্তর কোরিয়ার পুংগেরি পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্রে ২০১৭ সালের পর থেকে ভূমিকম্পের সংখ্যা ও তীব্রতা অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, দেশটির পারমাণবিক কার্যক্রমের ফলে ঐ অঞ্চলের ভূত্বকের দীর্ঘকাল সুপ্ত থাকা ভূমিকম্পপ্রবণ ফাটলগুলি পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া পুংগেরি এলাকায় মোট ছয়টি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা পরিচালনা করে। এর মধ্যে মাউন্ট মানতাপ এলাকায় ২০১৭ সালে পরিচালিত সর্বশেষ পরীক্ষাটি ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী, যার বিস্ফোরণ শক্তি ছিল প্রায় ১৬০ কিলোটন। এই বিস্ফোরণের পর ৬.৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয় এবং ধারণা করা হয় যে, পরীক্ষা কেন্দ্রের একটি ভূগর্ভস্থ কাঠামো ধসে পড়েছিল। ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর ছোট আকারের ভূমিকম্প হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে সাধারণত এই ধরনের ভূকম্পন বিস্ফোরণের কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হ্রাস পায়। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন এবং এটি নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের বিজ্ঞানীরা ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত ভূকম্পন তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, এই সময়ের মধ্যে মাউন্ট মানতাপের আশেপাশে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প শনাক্ত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ভূমিকম্পগুলির সংখ্যা ও মাত্রা সময়ের সঙ্গে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কোয়াং হি কিম, যিনি এই গবেষণার প্রধান লেখক, জানিয়েছেন যে ২০১৩ সালের তৃতীয় পারমাণবিক পরীক্ষার পর প্রথম ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। তবে ২০১৭ সালের ষষ্ঠ ও বৃহত্তম বিস্ফোরণের পর ভূকম্পন কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায় এবং পরবর্তী বেশ কয়েক বছর ধরে এটি কমার পরিবর্তে আরও বাড়তে থাকে। এই ভূমিকম্পগুলি সাধারণত খুব শক্তিশালী নয়, বেশিরভাগের মাত্রা ২ থেকে ৩-এর মধ্যে এবং এগুলো অগভীর ভূগর্ভে সংঘটিত হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন যে, কোরীয় উপদ্বীপ সাধারণত একটি স্থিতিশীল ভূত্বকের উপর অবস্থিত। তবে গবেষকরা মাউন্ট মানতাপের নিচে পূর্ব বিদ্যমান কিছু 'ইন্ট্রাপ্লেট' ফাটল বা প্রাচীন ভূত্বকের ফাটলের সন্ধান পেয়েছেন। তাঁদের অনুমান, ২০১৭ সালের শক্তিশালী বিস্ফোরণ এই ফাটলগুলির কিছু অংশকে পুনরায় সক্রিয় করে থাকতে পারে।

গবেষকদের মতে, পাহাড়টির খাড়া ও অসম ভূতাত্ত্বিক আকৃতির কারণে ভূগর্ভের কিছু ফাটল আগে থেকেই ভেঙে পড়ার কাছাকাছি অবস্থায় ছিল। পারমাণবিক বিস্ফোরণ সেই ভঙ্গুর ফাটলগুলিকে সক্রিয় করার জন্য একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সানইয়ং পার্ক, যিনি এই গবেষণার সাথে সরাসরি যুক্ত নন, মন্তব্য করেছেন যে, ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর ভূকম্পন কার্যকলাপ সাধারণত দ্রুত কমে যায়, কিন্তু মাউন্ট মানতাপের ক্ষেত্রে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে এবং সময়ের সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। বিজ্ঞানীদের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, বিস্ফোরণের ফলে ভূগর্ভের একটি বৃহৎ অংশে ফাটল সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তীতে এই ফাটলগুলির মধ্য দিয়ে পানি প্রবেশ করলে ভূগর্ভের চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা পুরোনো ফাটলগুলিকে অপেক্ষাকৃত সহজে স্থানচ্যুত করে ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। তবে এই গবেষণায় ভূগর্ভস্থ পানির ভূমিকার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা দীর্ঘমেয়াদে ভূকম্পন কার্যকলাপ বৃদ্ধি করতে পারে—এই ধরনের তথ্য ভবিষ্যতে পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্রগুলির পর্যবেক্ষণকে আরও জটিল করে তুলবে। কারণ, সেক্ষেত্রে বিস্ফোরণের কারণে সৃষ্ট ভূকম্পন এবং স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ভূমিকম্পের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তবে, গবেষকদের কাছে এমন কোনো প্রমাণ নেই যা নিশ্চিত করে যে ২০১৭ সালের পর উত্তর কোরিয়া পুংগেরিতে আর কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। তাদের ঐ পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশাধিকার নেই এবং উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব ভূকম্পন-সংক্রান্ত তথ্যও তাদের হাতে নেই।