Thu 23rd Jul 2026, 2:32 am

যামি গৌতমের জাতীয় পুরস্কার: স্বপ্ন সমাপ্তি নয়, নতুন দিগন্তের সূচনা

যামি গৌতমের জাতীয় পুরস্কার: স্বপ্ন সমাপ্তি নয়, নতুন দিগন্তের সূচনা
“প্রত্যেক সফল যাত্রায় এমন এক সন্ধিক্ষণ আসে, যা সংকল্পের মর্মার্থ পুনরায় মনে করিয়ে দেয়। আমার জীবনে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তি আমার কাছে এমন এক সম্মান, যা আমি আমৃত্যু সযত্নে লালন করব,” ভারতের ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মাননা অর্জনের পর এক হৃদয়গ্রাহী বার্তায় মন্তব্য করেন ইয়ামি গৌতম। ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আর্টিকেল ৩৭০’ ছবিতে তাঁর অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ এই জাতীয় সম্মাননা লাভ করেছেন এই বলিউড অভিনেত্রী। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান যে, নিরন্তর অধ্যবসায়, অদম্য দৃঢ়তা এবং অভিনয়ের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠাই এই জাতীয় স্বীকৃতির মূল চালিকাশক্তি। উল্লেখ্য, ‘আর্টিকেল ৩৭০’ ছবিটি সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কারও অর্জন করেছে, যা ছবির সমগ্র কলাকুশলী ও সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য এক দ্বিগুণ আনন্দের উপলক্ষ।

ইয়ামি গৌতমের পিতা মুকেশ গৌতম পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র জগতের একজন স্বনামধন্য নির্মাতা। ফিল্মি পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠলেও ইয়ামির ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই সাদামাটা এবং অনুশাসনের আবহে পরিপুষ্ট। গ্ল্যামার জগতের ঝলমলে আভা থেকে দূরে, তিনি কঠোর নিয়মানুবর্তিতাকেই জীবনের পাথেয় করেছেন। Desi Media Point-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামি বলেন, “আজও আমি সেই কঠোর অনুশাসন মেনে চলি। যত সকালেই আমার শুটিং থাকুক না কেন, আমি ভোর তিনটায় পূজা সম্পন্ন করে তবেই বের হই।”

হিমাচলের শান্ত পাহাড়ি পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই কন্যা একদিন মুম্বাইয়ের মায়ানগরীতে নিজের মেধা ও ভাগ্য পরখ করতে এসেছিলেন। ছোট পর্দা দিয়েই তাঁর অভিনয় জীবনের অভিষেক ঘটে; ২০০৮ সালে ‘চাঁদ কে পার চলো’ ধারাবাহিকে তিনি প্রথম দর্শকদের সামনে আসেন। যদিও তাঁর বাবা পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র জগতের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব, ইয়ামি বড় পর্দায় তাঁর প্রথম কাজ শুরু করেন কন্নড় ছবি দিয়ে। বলিউডে তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি ‘ভিকি ডোনার’-এ তিনি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। সুজিত সরকার পরিচালিত এই ছবিতে তাঁকে বাঙালি মেয়ে অসীমা রায়ের চরিত্রে দেখা গিয়েছিল। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। হিন্দি ছাড়াও তিনি তামিল, তেলেগু, পাঞ্জাবি এবং মালয়ালম ভাষার ছবিতে অভিনয় করেছেন। পরবর্তীতে, ‘কাবিল’ ছবিতে হৃতিক রোশনের বিপরীতে তাঁর অভিনয় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং প্রশংসিত হয়। সেই সময় অনেকেই তাঁর অদম্য প্রতিভা ও দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। এরপর তাঁর কর্মজীবনের গতি ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়।

বড় পর্দার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম (ওটিটি)-এও ইয়ামির অভিনয় দক্ষতা সমানভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’, ‘বালা’, ‘আ থার্সডে’, ‘লস্ট’, ‘দশভি’, ‘আর্টিকেল ৩৭০’, ‘হক’ সহ অসংখ্য সফল চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। এই বলিউড অভিনেত্রী নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রূপে আবিষ্কার করার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর দর্শনে, কাজই তাঁর উপাসনা, এবং কর্মক্ষেত্রে তিনি সর্বদা নিষ্ঠা ও সততা বজায় রাখেন।

তিনি বলেন, “আমার কর্মজীবনের শুরু থেকেই আমি এই পথেই চলতে চেয়েছিলাম। প্রচলিত আছে যে, যা তুমি মনপ্রাণ দিয়ে আকাঙ্ক্ষা করবে, তা-ই প্রাপ্ত হবে। আজ আমি আমার পছন্দের বিষয়গুলি অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারছি। অনেক সময় অনেকে আমাকে অবমূল্যায়ন করেছেন, আর সেটিকে আমি ইতিবাচক চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছি।” অভিনেত্রী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, তিনি অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের হৃদয়ে এক স্থায়ী আসন লাভ করতে চান। এই আকাঙ্ক্ষায় তিনি যে সম্পূর্ণ সফল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

‘আর্টিকেল ৩৭০’-এর মতো গম্ভীর এবং বাস্তবসম্মত ছবির পাশাপাশি ‘ধুমধাম’-এর মতো হালকা মেজাজের চলচ্চিত্রেও ইয়ামি সমান স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছেন। একটি প্রকল্প নির্বাচনের মানদণ্ড সম্পর্কে ইয়ামি বলেন, “আমার কাছে চিত্রনাট্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে। প্রথম পাঠের পর যে ‘আন্তরিক অনুভূতি’ জাগ্রত হয়, সেটিই আমাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। গল্প যত বাস্তবভিত্তিক হয়, আমার আগ্রহ তত বৃদ্ধি পায়। এরপর আমি চরিত্র এবং পরিচালকের প্রতি মনোনিবেশ করি।”

৩৭ বছর বয়সী ইয়ামি তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে উল্লেখ করেছেন, “সেরা অভিনেত্রীর এই স্বীকৃতি বহু বছরের নিরলস নিষ্ঠা ও সাধনার ফল।” তাঁর নিজস্ব ভাষায়, “গত ১৪ বছর ধরে আমি কেবল আমার অভিনয়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করেছি। আমি একাগ্রতার সাথে কাজ করে গেছি এবং আমার অভিনয়কেই আমার পরিচয় বহন করতে দিয়েছি। এই সম্মান আমার সেই সুদীর্ঘ যাত্রার চূড়ান্ত পরিণতি, যে পথ ছিল আশা, অধ্যবসায়, দৃঢ়তা এবং চলচ্চিত্রের প্রতি অটুট ভালোবাসায় পূর্ণ। বছরের পর বছর আমি এই স্বপ্ন হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছিলাম। আজ আমি গভীর কৃতজ্ঞতা ও বিনয়ের সাথে সেই স্বপ্নকে বরণ করে নিচ্ছি।” তিনি আরও লেখেন, “আমার কাছে এটি কেবল আর পাঁচটি ছবির মতো ছিল না। এটি এমন এক আখ্যান, যার গভীরে আমি বিশ্বাস করতাম। প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা, প্রতিটি আলোচনা এবং শুটিংয়ের প্রতিটি দিন আমরা সততা ও দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে এই গল্পটি তুলে ধরার লক্ষ্যেই উৎসর্গ করেছি।”

“এই পুরস্কার কোনো স্বপ্নের পরিসমাপ্তি নয়, বরং এক বৃহত্তর দায়িত্বের শুভ সূচনা। নিজেকে আরও পরিশীলিত করা, নতুন ঝুঁকি গ্রহণ করা এবং এমন সব আখ্যান উপস্থাপন করা যা বাস্তবিক অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ, এটাই এখন আমার মূল লক্ষ্য। এই সম্মান সেই সকল মানুষের উদ্দেশ্যে নিবেদিত, যাঁরা এখনো নিজেদের সাফল্যের মুহূর্তের প্রতীক্ষায় রয়েছেন। আপনারা কখনো বিশ্বাস হারাবেন না,” পোস্টের শেষাংশে লিখেছেন এই গুণী অভিনেত্রী।

২০২১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও পরিচালক আদিত্য ধরের সাথে ইয়ামি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০২৪ সালে তাঁদের কোলজুড়ে আসে পুত্রসন্তান বেদাভিদ। অভিনয়ের পাশাপাশি স্বামী ও পুত্রকে নিয়ে তিনি এক আনন্দময় পারিবারিক জীবন যাপন করছেন। একজন প্রতিষ্ঠিত তারকা হওয়া সত্ত্বেও, তিনি বলিউডের চাকচিক্যময় জগৎ থেকে দূরে এক সাধারণ জীবনধারা অনুসরণ করেন। তাঁর মতে, জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ইয়ামি আরও বলেন যে, তাঁর পরিবারই তাঁর প্রধান শক্তির উৎস।