Sat 11th Jul 2026, 12:15 am

পেনাল্টিতে ‘থমকে যাওয়া’ কৌশল: এমবাপ্পে-নেইমারদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

পেনাল্টিতে ‘থমকে যাওয়া’ কৌশল: এমবাপ্পে-নেইমারদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ফ্রান্সের ২-০ গোলের জয়ের রাতে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি মিস সম্ভবত ফরাসি সমর্থকদের স্মৃতিতে খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না। সেমিফাইনালে উত্তরণের উচ্ছ্বাসে তা সহজেই ম্লান হয়ে যাবে। তবে ফুটবলের ইতিহাস এমন ঘটনা সহজে ভোলে না। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপে ফরাসি খেলোয়াড়দের পেনাল্টি মিস অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। বৈশ্বিক এই মঞ্চে এটি মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো দেখা গেল। ২০১৪ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে করিম বেনজেমার পেনাল্টি মিসের পর এবার এমবাপ্পের শট ব্যর্থ হলো।

এমবাপ্পের সেই পেনাল্টি মিসের মুহূর্তটি পুনরায় পর্যালোচনা করা যাক। শট নেওয়ার ঠিক মাঝপথে ফরাসি এই তারকা মরক্কোর গোলকিপার ইয়াসিন বুনুর দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের জন্য গতি কমিয়েছিলেন। বুনু অবলীলায় তাঁর বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে তুলনামূলক দুর্বল সেই শটটি প্রতিহত করেন। যদিও এমবাপ্পে যে পদ্ধতিতে শটটি নিয়েছিলেন, তা ফুটবলে একটি সুপরিচিত এবং প্রায়শই সফল কৌশল। নেইমারসহ বহু খেলোয়াড় এই ‘থমকে যাওয়া’ কৌশল ব্যবহার করে অসংখ্যবার গোল করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকেই এটিকে গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করার একটি আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করেন।

তবে প্রশ্ন জাগে, পেনাল্টি শট নেওয়ার সময় দৌড়ানোর মাঝে গতি কমিয়ে দেওয়ার এই কৌশলটির প্রাসঙ্গিকতা কি এখন ফুরিয়ে এসেছে?

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, বল কিক করার ঠিক চূড়ান্ত মুহূর্ত ব্যতীত দৌড়ানোর যেকোনো পর্যায়ে খেলোয়াড়রা গতি কমাতে বা কৌশল পরিবর্তন করতে স্বাধীন। অতীতে জন অলড্রিজ, হুগো সানচেজ এবং পেলের মতো কিংবদন্তিরা পেনাল্টিতে অতিরিক্ত সুবিধা আদায়ে এই কৌশলের সহায়তা নিয়েছেন। তবে যদি গোলরক্ষক আগেভাগে কোনো একদিকে না ঝাঁপিয়ে নিজের অবস্থানে অবিচল থাকেন, সেক্ষেত্রে এই কৌশলটি মারাত্মকভাবে বুমেরাং হতে পারে।

চলতি বিশ্বকাপেও পেনাল্টি নেওয়ার সময় গতি কমিয়ে শুধু এমবাপ্পেই মিস করেননি। তাঁর সাথে এই তালিকায় যোগ দিয়েছেন ব্রুনো গিমারাইস, জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেন, লিওনেল মেসি এবং হ্যারি কেইন। যদিও কেইন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়বার পেনাল্টির সুযোগ পেয়ে ‘থমকে যাওয়া’ কৌশল পরিহার করে স্বাভাবিক শটেই গোল করতে সমর্থ হন।

‘দেশি মিডিয়া পয়েন্ট’ সূত্রে জানা গেছে, এই বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ মোট ২৬টি পেনাল্টি এই ‘থমকে যাওয়া’ কৌশল ব্যবহার করে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি শটই গোলপোস্টের ঠিকানা খুঁজে পায়নি, অর্থাৎ এই কৌশলের সফলতার হার মাত্র ৫৭ শতাংশ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আর্সেনাল কিংবদন্তি ইয়ান রাইট মন্তব্য করেন, ‘মনে হচ্ছে গোলরক্ষকরা এই ‘থমকে যাওয়া’ কৌশলটি এখন ভালোভাবে ধরে ফেলেছেন। তারা এই ধরনের শটের গতিপ্রকৃতি এবং পরিণতি সম্পর্কে বেশ সচেতন হয়ে উঠেছেন।’

তবে এর বিপরীতে যুক্তিও রয়েছে; মার্কো আরনাউতোভিচ, নেইমার, এমবাপ্পে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং কাই হাভার্টজের মতো তারকারা চলতি বিশ্বকাপেও একই কৌশল ব্যবহার করে পেনাল্টি থেকে গোল আদায় করেছেন।

তবে সামগ্রিক পরিসংখ্যান ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে: থমকে না গিয়ে স্বাভাবিক গতিতে দৌড়ে নেওয়া ৩৫টি পেনাল্টির মধ্যে গোল হয়েছে ২৪টি। অর্থাৎ, প্রচলিত বা স্বাভাবিক কৌশলে সফলতার হার ৬৮ শতাংশ, যা ‘থমকে যাওয়া’ কৌশলের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এবারের বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে গোল করার সামগ্রিক সফলতার হার মোটেও সন্তোষজনক নয়। টাইব্রেকার ব্যতীত পেনাল্টি মিসের হার দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশে। ১৯৬৬ সাল থেকে পেনাল্টির পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর এটি যেকোনো বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মিসের রেকর্ড। যদি টাইব্রেকারকেও এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে মিসের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে, যা ১৯৬৬ সালের পর থেকে যেকোনো বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ পেনাল্টি মিসের রেকর্ড।

জাতীয় দলের জার্সিতে এটি এমবাপ্পের দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। ফ্রান্সের হয়ে তিনি ১৬টি পেনাল্টির মধ্যে ১৪টিতেই গোল করেছেন। ক্লাব ফুটবলে তাঁর সফলতার হার অবশ্য কিছুটা কম—৬২টি পেনাল্টি থেকে ৫০টি গোল।

তবে, এমবাপ্পের পেনাল্টি শটের সামনে গত রাতে ছিলেন এক অত্যন্ত কঠিন প্রতিপক্ষ। মরক্কোর গোলকিপার ইয়াসিন বুনু চলতি বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ মোট ৯টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়েছেন এবং মাত্র দুটিতে গোল হজম করেছেন। অবশিষ্ট ৭টি শটের মধ্যে তিনি ৪টি সেভ করেছেন, ২টি গোলপোস্টে লেগে ফিরেছে এবং অন্যটি পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে গেছে। টাইব্রেকারসহ হিসেব করলে, বিশ্বকাপে বুনু এখন যৌথভাবে সর্বোচ্চ পেনাল্টি সেভ করা গোলকিপার। এর আগে জার্মানির টনি শুমাখার, আর্জেন্টিনার গয়কোচিয়া, স্পেনের ক্যাসিয়াস এবং ক্রোয়েশিয়ার লিভাকোভিচ—এই চারজন গোলরক্ষকও ৪টি করে পেনাল্টি সেভ করেছিলেন।

মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টি নেওয়ার আগে এমবাপ্পেকে যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল, সেটিও সম্ভবত তাঁর বিপক্ষে কাজ করেছে। ভিএআরের হস্তক্ষেপের কারণে পেনাল্টির বাঁশি বাজার প্রায় ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড পর এমবাপ্পে শটটি গ্রহণ করেন।

এ প্রসঙ্গে আয়ারল্যান্ডের সাবেক মিডফিল্ডার রয় কিন আইটিভিকে বলেন, ‘৩ মিনিটের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে বাধ্য করাটা অনুচিত। এমন জটিল মুহূর্তে সময়ই স্ট্রাইকারদের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ অপেক্ষার সুফল সাধারণত গোলরক্ষক এবং যে দল পেনাল্টি হজম করে, তারাই পেয়ে থাকে।’

ম্যাচ শেষে এমবাপ্পের নিজের কথাতেও স্পষ্ট হয় যে, পেনাল্টি শট নেওয়ার পূর্বে দীর্ঘ অপেক্ষায় তিনি তাঁর মনঃসংযোগ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘উসমান বলটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। এরপর আমি শট নেওয়ায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, ঠিক তখনই রেফারি বললেন, এটি পেনাল্টি নয়...আমি আবার বল তুলে নিয়ে মাঠে রাখলাম। রেফারি ফিরে এসে বললেন, হ্যাঁ, এটি পেনাল্টিই। কিন্তু এরপরই আবার বললেন, একটু অপেক্ষা করুন, দুই মিনিট আগের একটি খেলার মুহূর্ত পর্যালোচনা করতে হবে। শেষ পর্যন্ত আমি আমার মনঃসংযোগ হারিয়ে ফেললাম।’

এমবাপ্পের মানসিক অবস্থা ব্যাখ্যার চেষ্টা করে ইয়ান রাইট আরও বলেন, ‘পেনাল্টি নেওয়ার জন্য যত বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে, খেলোয়াড়ের মনে নিজের নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে তত বেশি সংশয় তৈরি হতে থাকে।’