চাপের মুখে নত না হওয়া, বিরোধী দাবি উপেক্ষা করা, সিদ্ধান্তে অটল থাকা এবং আন্দোলন সত্ত্বেও মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে পদ থেকে না সরানো নরেন্দ্র মোদির সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। তবে, শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে এইবার তাঁকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে হলো। ‘তেলাপোকা আন্দোলনের’ এটি এক উল্লেখযোগ্য বিজয় এবং নরেন্দ্র মোদির জন্য এক বিরল পশ্চাদপসরণ।
তবে, কেবল এই একটি পদত্যাগের মাধ্যমেই কি চলমান সংকট নিরসন সম্ভব? যদিও আন্দোলনকারীরা তাঁদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন, তবুও এই আন্দোলন যে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং সরকারের প্রতি তরুণ সমাজের গভীর অনাস্থার মতো মৌলিক সংকটগুলি উন্মোচন করেছে, তা কি একজন মন্ত্রীর বিদায়েই সম্পূর্ণরূপে দূর হবে?
পূর্বের ন্যায় এইবারও শিক্ষার্থীদের প্রবল আন্দোলনের মুখে নরেন্দ্র মোদি ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। ‘তেলাপোকা আন্দোলনের’ এই সাফল্য মোদির রাজনৈতিক জীবনে একটি বিরল পশ্চাদপসরণ হিসেবে চিহ্নিত। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঠিক আগের দিন যন্তর মন্তরে একটি বড় প্রশ্ন ছিল: মোদি কি শেষ পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রীকে রক্ষা করবেন? পরদিন তার উত্তর মিলেছে। এখন আরও বৃহত্তর প্রশ্নটি হলো—একজন মন্ত্রীকে বিসর্জন দিয়ে মোদি আপাতত আন্দোলনকে স্তিমিত করতে পারলেও, এই ঘটনা কি তরুণ প্রজন্মকে বার্তা দিল যে সংঘবদ্ধ চাপের মুখে তাঁর সরকারকেও পিছু হটাতে বাধ্য করা সম্ভব?
যন্তর মন্তরে পদার্পণ করতেই মনে হয়েছিল, এটি কেবল একটি ‘ক্ষুদ্র ভারত’ নয়, বরং এক বিশাল ‘ক্ষুদ্র মহাকুম্ভে’ বিচরণ করছি। বাঙালি, বিহারি, গুজরাটি, মালয়ালি, তামিল, মাড়োয়ারি, ওড়িয়া বা অসমীয়া পরিচয়ে বিভক্ত হয়েও যারা জাতপাত, ধর্ম, গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বা জাতীয় সংকটে নিজেদের ‘ভারতীয়’ হিসেবে একত্রিত করেন, এই ছাত্র সমাবেশে তারা সেই পরিচিতি ও বিভেদের রাজনীতি পরিত্যাগ করে শুধুই ‘ভারতীয় শিক্ষার্থী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সুস্পষ্ট এবং অবিচল: শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দোষীদের শাস্তি, আত্মঘাতী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার।
তবে, এই পদত্যাগ কি সত্যিই চলমান সংকটের সমাধান? আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে তাঁদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করলেও, প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, ব্যাপক বেকারত্ব এবং সরকারের প্রতি তরুণদের আস্থাহীনতার মতো যে গভীর সংকট এই আন্দোলন উন্মোচন করেছে, তা কি একজন মন্ত্রীর বিদায়েই ঘুচবে? যন্তর মন্তরকে ঘিরে থাকা পার্লামেন্ট স্ট্রিট, জনপথ ও অশোক রোডের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দেখা গেছে অসংখ্য উদ্যমী তরুণ-তরুণী, সতর্ক নিরাপত্তা প্রহরী এবং কৌতূহলী জনসমাগম। সেখানে গান, ভাষণ ও স্লোগানে মুখরিত পরিবেশ, পতপত করে উড়ছে জাতীয় পতাকা, এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের স্টলগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। দিনরাত রিল তৈরি করছেন তরুণরা, পরিচিত-অপরিচিত ইউটিউবাররা ব্যস্ত সময় পার করছেন, এমনকি তথাকথিত ‘গোদি মিডিয়া’ হিসেবে পরিচিত সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকরাও কিছুটা সচকিত।
গত ২০ জুলাইয়ের উত্তপ্ত সংসদ ভবন অভিযানের পর যন্তর মন্তরের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ১৮টি মেট্রো স্টেশন এবং কনট প্লেস এলাকার সকল দোকান সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই বন্ধ করার নির্দেশ সেই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা হতোদ্যম হননি।
আন্দোলনের অভ্যন্তরে কিছু সংশয়ও বিদ্যমান ছিল। শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিনের অনশন শেষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে ফলের রস গ্রহণ করায় সরকারের সাথে কোনো সমঝোতার গুঞ্জন ওঠে। তবে, ছাত্রনেতারা সরকারের সাথে বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থেকে সরে না আসার ব্যাপারে তাঁদের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেন। পরদিন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটায়। এই ঘটনা একই সাথে একটি আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তি এবং সম্ভাব্য ভঙ্গুরতা উভয়কেই নির্দেশ করে – আন্দোলন যত ব্যাপক আকার ধারণ করে, এর নেতৃত্ব, সমঝোতার সম্ভাবনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সংশয়ও তত বাড়ে।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পরবর্তী দিনের পদত্যাগ শুধু সেই অনিশ্চয়তারই অবসান ঘটায়নি, বরং এটি প্রমাণ করে যে সরকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপকে উপেক্ষা করতে পারেনি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের এই ছাত্র জাগরণের বেশ কিছু সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট দাবি থেকে আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল – বাংলাদেশে কোটা সংস্কার নীতিকে ঘিরে এবং ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে। তবে, ভারতের আন্দোলন শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি, বেকারত্ব এবং তরুণদের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার বৃহত্তর প্রশ্নেও এর বিস্তার ঘটেছে।
তবে, অমিলগুলোও গভীর। ভারতের মতো বিশাল দেশে এত বিভাজন, বৈপরীত্য, একটি শক্তিশালী সরকার এবং নানা স্বার্থে বিভক্ত বিরোধী পক্ষ বিদ্যমান। কেন্দ্র-রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা এবং ভিন্ন মতাদর্শের প্রেক্ষাপট এই আন্দোলনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যদিও বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবুও ছাত্র ঐক্য কতদিন অটুট থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শাসক দল ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট এবং ‘স্থিতিশীলতা নষ্টের চক্রান্তের’ প্রশ্নটিও উত্থাপন করা হচ্ছে।
পরিচিত-অপরিচিত ইউটিউবারদের অবিরাম ব্যস্ততা এবং ‘গোদি মিডিয়া’ নামে পরিচিত সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকরাও কিছুটা সচকিত। রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি বা সংগঠনের লড়াই সব সময়ই অসম প্রকৃতির। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে উপেক্ষা করার পর সরকার অবশেষে সক্রিয় হয়েছে; ব্যবস্থা গ্রহণ করছে এবং শিক্ষার্থীদের আলোচনার টেবিলে এনেছে। সরকার তাদের গুরুত্ব দিচ্ছে, তাদের বোঝানো হচ্ছে যে তারাই দেশের ভবিষ্যৎ, দেশের সম্পদ, এবং তাদের স্বার্থই প্রাথমিক। যে আন্দোলন অরাজনৈতিক মোড়কে শুরু হয়েছিল, তা রাজনৈতিক রঙ নিলে কী পরিণতি হতে পারে, সেই প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। এই কারণেই কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি এবং ডিএমকে-এর মতো দলগুলো এই আন্দোলনে সরাসরি নিজেদের যুক্ত করছে না, যা বিজেপির জন্য একটি বড় হাতিয়ার। তবে, শাসক দলের মধ্যে শঙ্কাও বিদ্যমান। বিহার ও অন্ধ্র প্রদেশ উত্তাল হয়ে উঠলে আরজেডি ও টিডিপি-এর মতো জোটসঙ্গীরা কি শাসক জোটে থাকা নিরাপদ মনে করবে? এ প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন যে, শুধু নিট, সিবিএসই এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতিই নয়, রামমন্দিরের কোষাগার লুট নিয়েও হিন্দুত্ববাদী সমাজে অসন্তোষ দানা বাঁধছে।
যদিও ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি এখনো তাঁর রাজনৈতিক ‘তরি’ তীরে ভেড়াতে সক্ষম হতে পারেন; পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। যন্তর মন্তরের উত্তেজনা প্রশমিত হলেও, রাজনৈতিক অঙ্গন চঞ্চল থাকবে। এটি আপাতত একটি সাময়িক স্বস্তি, তবে চূড়ান্ত পরিণতি এখনো নির্ধারিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক আচরণে স্পষ্ট যে কৃষক আন্দোলনের পর আবারও তিনি বিচলিত। সিএএ এবং এনআরসি মোকাবিলায় হিন্দুত্ববাদকে হাতিয়ার করা সম্ভব হলেও, এইবার তা কার্যকর হয়নি। শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতেই হয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ফলাফল কী হতে পারে, সেই প্রজ্ঞা প্রধানমন্ত্রীর আছে। তাঁর সামনে শেখ হাসিনার পতন একটি উন্মুক্ত বইয়ের মতো দৃষ্টান্ত হয়ে আছে, যা শিক্ষামন্ত্রীর এই ইস্তফা তাঁকে গুরুতরভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে।
ছাত্র আন্দোলনের পরিধি যদি কৃষক, শ্রমিক, বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম, পুলিশ এবং জোটসঙ্গীদের একাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে তা একটি গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে পারে, যেমনটি বাংলাদেশে ঘটেছিল। ভারতে এখনো তেমন কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না; এই আন্দোলন আপাতত শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মোদি সরকারের জন্য এটি সৌভাগ্য যে, এই আন্দোলন এখনো রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি চ্যালেঞ্জ করার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফাটল ধরেনি। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিলেও নরেন্দ্র মোদি এখনো তাঁর রাজনৈতিক পথ সুগম করতে পারেন। পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। যন্তর মন্তরে শান্তি ফিরলেও, রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকবে। এটি কেবল সাময়িক স্বস্তি, চূড়ান্ত উপসংহার টানার সময় এখনো আসেনি।
তবে, কেবল এই একটি পদত্যাগের মাধ্যমেই কি চলমান সংকট নিরসন সম্ভব? যদিও আন্দোলনকারীরা তাঁদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন, তবুও এই আন্দোলন যে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং সরকারের প্রতি তরুণ সমাজের গভীর অনাস্থার মতো মৌলিক সংকটগুলি উন্মোচন করেছে, তা কি একজন মন্ত্রীর বিদায়েই সম্পূর্ণরূপে দূর হবে?
পূর্বের ন্যায় এইবারও শিক্ষার্থীদের প্রবল আন্দোলনের মুখে নরেন্দ্র মোদি ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। ‘তেলাপোকা আন্দোলনের’ এই সাফল্য মোদির রাজনৈতিক জীবনে একটি বিরল পশ্চাদপসরণ হিসেবে চিহ্নিত। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঠিক আগের দিন যন্তর মন্তরে একটি বড় প্রশ্ন ছিল: মোদি কি শেষ পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রীকে রক্ষা করবেন? পরদিন তার উত্তর মিলেছে। এখন আরও বৃহত্তর প্রশ্নটি হলো—একজন মন্ত্রীকে বিসর্জন দিয়ে মোদি আপাতত আন্দোলনকে স্তিমিত করতে পারলেও, এই ঘটনা কি তরুণ প্রজন্মকে বার্তা দিল যে সংঘবদ্ধ চাপের মুখে তাঁর সরকারকেও পিছু হটাতে বাধ্য করা সম্ভব?
যন্তর মন্তরে পদার্পণ করতেই মনে হয়েছিল, এটি কেবল একটি ‘ক্ষুদ্র ভারত’ নয়, বরং এক বিশাল ‘ক্ষুদ্র মহাকুম্ভে’ বিচরণ করছি। বাঙালি, বিহারি, গুজরাটি, মালয়ালি, তামিল, মাড়োয়ারি, ওড়িয়া বা অসমীয়া পরিচয়ে বিভক্ত হয়েও যারা জাতপাত, ধর্ম, গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বা জাতীয় সংকটে নিজেদের ‘ভারতীয়’ হিসেবে একত্রিত করেন, এই ছাত্র সমাবেশে তারা সেই পরিচিতি ও বিভেদের রাজনীতি পরিত্যাগ করে শুধুই ‘ভারতীয় শিক্ষার্থী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সুস্পষ্ট এবং অবিচল: শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দোষীদের শাস্তি, আত্মঘাতী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার।
তবে, এই পদত্যাগ কি সত্যিই চলমান সংকটের সমাধান? আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে তাঁদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করলেও, প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, ব্যাপক বেকারত্ব এবং সরকারের প্রতি তরুণদের আস্থাহীনতার মতো যে গভীর সংকট এই আন্দোলন উন্মোচন করেছে, তা কি একজন মন্ত্রীর বিদায়েই ঘুচবে? যন্তর মন্তরকে ঘিরে থাকা পার্লামেন্ট স্ট্রিট, জনপথ ও অশোক রোডের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দেখা গেছে অসংখ্য উদ্যমী তরুণ-তরুণী, সতর্ক নিরাপত্তা প্রহরী এবং কৌতূহলী জনসমাগম। সেখানে গান, ভাষণ ও স্লোগানে মুখরিত পরিবেশ, পতপত করে উড়ছে জাতীয় পতাকা, এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের স্টলগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। দিনরাত রিল তৈরি করছেন তরুণরা, পরিচিত-অপরিচিত ইউটিউবাররা ব্যস্ত সময় পার করছেন, এমনকি তথাকথিত ‘গোদি মিডিয়া’ হিসেবে পরিচিত সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকরাও কিছুটা সচকিত।
গত ২০ জুলাইয়ের উত্তপ্ত সংসদ ভবন অভিযানের পর যন্তর মন্তরের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ১৮টি মেট্রো স্টেশন এবং কনট প্লেস এলাকার সকল দোকান সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই বন্ধ করার নির্দেশ সেই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা হতোদ্যম হননি।
আন্দোলনের অভ্যন্তরে কিছু সংশয়ও বিদ্যমান ছিল। শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিনের অনশন শেষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে ফলের রস গ্রহণ করায় সরকারের সাথে কোনো সমঝোতার গুঞ্জন ওঠে। তবে, ছাত্রনেতারা সরকারের সাথে বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থেকে সরে না আসার ব্যাপারে তাঁদের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেন। পরদিন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটায়। এই ঘটনা একই সাথে একটি আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তি এবং সম্ভাব্য ভঙ্গুরতা উভয়কেই নির্দেশ করে – আন্দোলন যত ব্যাপক আকার ধারণ করে, এর নেতৃত্ব, সমঝোতার সম্ভাবনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সংশয়ও তত বাড়ে।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পরবর্তী দিনের পদত্যাগ শুধু সেই অনিশ্চয়তারই অবসান ঘটায়নি, বরং এটি প্রমাণ করে যে সরকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপকে উপেক্ষা করতে পারেনি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের এই ছাত্র জাগরণের বেশ কিছু সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট দাবি থেকে আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল – বাংলাদেশে কোটা সংস্কার নীতিকে ঘিরে এবং ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে। তবে, ভারতের আন্দোলন শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি, বেকারত্ব এবং তরুণদের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার বৃহত্তর প্রশ্নেও এর বিস্তার ঘটেছে।
তবে, অমিলগুলোও গভীর। ভারতের মতো বিশাল দেশে এত বিভাজন, বৈপরীত্য, একটি শক্তিশালী সরকার এবং নানা স্বার্থে বিভক্ত বিরোধী পক্ষ বিদ্যমান। কেন্দ্র-রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা এবং ভিন্ন মতাদর্শের প্রেক্ষাপট এই আন্দোলনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যদিও বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবুও ছাত্র ঐক্য কতদিন অটুট থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শাসক দল ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট এবং ‘স্থিতিশীলতা নষ্টের চক্রান্তের’ প্রশ্নটিও উত্থাপন করা হচ্ছে।
পরিচিত-অপরিচিত ইউটিউবারদের অবিরাম ব্যস্ততা এবং ‘গোদি মিডিয়া’ নামে পরিচিত সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকরাও কিছুটা সচকিত। রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি বা সংগঠনের লড়াই সব সময়ই অসম প্রকৃতির। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে উপেক্ষা করার পর সরকার অবশেষে সক্রিয় হয়েছে; ব্যবস্থা গ্রহণ করছে এবং শিক্ষার্থীদের আলোচনার টেবিলে এনেছে। সরকার তাদের গুরুত্ব দিচ্ছে, তাদের বোঝানো হচ্ছে যে তারাই দেশের ভবিষ্যৎ, দেশের সম্পদ, এবং তাদের স্বার্থই প্রাথমিক। যে আন্দোলন অরাজনৈতিক মোড়কে শুরু হয়েছিল, তা রাজনৈতিক রঙ নিলে কী পরিণতি হতে পারে, সেই প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। এই কারণেই কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি এবং ডিএমকে-এর মতো দলগুলো এই আন্দোলনে সরাসরি নিজেদের যুক্ত করছে না, যা বিজেপির জন্য একটি বড় হাতিয়ার। তবে, শাসক দলের মধ্যে শঙ্কাও বিদ্যমান। বিহার ও অন্ধ্র প্রদেশ উত্তাল হয়ে উঠলে আরজেডি ও টিডিপি-এর মতো জোটসঙ্গীরা কি শাসক জোটে থাকা নিরাপদ মনে করবে? এ প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন যে, শুধু নিট, সিবিএসই এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতিই নয়, রামমন্দিরের কোষাগার লুট নিয়েও হিন্দুত্ববাদী সমাজে অসন্তোষ দানা বাঁধছে।
যদিও ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি এখনো তাঁর রাজনৈতিক ‘তরি’ তীরে ভেড়াতে সক্ষম হতে পারেন; পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। যন্তর মন্তরের উত্তেজনা প্রশমিত হলেও, রাজনৈতিক অঙ্গন চঞ্চল থাকবে। এটি আপাতত একটি সাময়িক স্বস্তি, তবে চূড়ান্ত পরিণতি এখনো নির্ধারিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক আচরণে স্পষ্ট যে কৃষক আন্দোলনের পর আবারও তিনি বিচলিত। সিএএ এবং এনআরসি মোকাবিলায় হিন্দুত্ববাদকে হাতিয়ার করা সম্ভব হলেও, এইবার তা কার্যকর হয়নি। শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতেই হয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ফলাফল কী হতে পারে, সেই প্রজ্ঞা প্রধানমন্ত্রীর আছে। তাঁর সামনে শেখ হাসিনার পতন একটি উন্মুক্ত বইয়ের মতো দৃষ্টান্ত হয়ে আছে, যা শিক্ষামন্ত্রীর এই ইস্তফা তাঁকে গুরুতরভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে।
ছাত্র আন্দোলনের পরিধি যদি কৃষক, শ্রমিক, বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম, পুলিশ এবং জোটসঙ্গীদের একাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে তা একটি গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে পারে, যেমনটি বাংলাদেশে ঘটেছিল। ভারতে এখনো তেমন কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না; এই আন্দোলন আপাতত শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মোদি সরকারের জন্য এটি সৌভাগ্য যে, এই আন্দোলন এখনো রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি চ্যালেঞ্জ করার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফাটল ধরেনি। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিলেও নরেন্দ্র মোদি এখনো তাঁর রাজনৈতিক পথ সুগম করতে পারেন। পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। যন্তর মন্তরে শান্তি ফিরলেও, রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকবে। এটি কেবল সাময়িক স্বস্তি, চূড়ান্ত উপসংহার টানার সময় এখনো আসেনি।
