Sat 5th Sep 2026, 4:40 pm

রাশিয়ার চোখে গ্রেট ব্রিটেন কেন আর 'গ্রেট' হিসেবে বিবেচিত নয়?

রাশিয়ার চোখে গ্রেট ব্রিটেন কেন আর 'গ্রেট' হিসেবে বিবেচিত নয়?
সম্প্রতি রুশ কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সচেতনভাবে 'গ্রেট ব্রিটেন' বা 'ইউনাইটেড কিংডম' (যুক্তরাজ্য) পদবিগুলো পরিহার করে কেবল 'ব্রিটেন' শব্দটি ব্যবহার করছে। যে দেশ সম্পর্কে কয়েক দশক আগেও বলা হতো 'ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না', সেই দেশকে আজ রুশ কর্মকর্তারা কেন নিছক 'ব্রিটেন' নামে ডাকছেন, তা অনেকের মনেই প্রশ্ন তৈরি করেছে।

২০২৫ সালের রুশ কূটনৈতিক কার্যক্রম পর্যালোচনা বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে এই বিষয়টি উত্থাপন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। লাভরভ এই নতুন শব্দচয়নের (কেবল 'ব্রিটেন') কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, "কাউকে অপমান করা উদ্দেশ্য নয়, তবে আমার মতে দেশটির এভাবেই অভিহিত হওয়া উচিত। কারণ, 'গ্রেট ব্রিটেন' একমাত্র দেশ, যা নিজেই নিজেকে 'মহান' বলে দাবি করে। 'গ্রেট লিবিয়ান জামাহিরিয়া' ছিল আরেকটি উদাহরণ, কিন্তু সেই রাষ্ট্র এখন আর বিদ্যমান নেই।"

রাশিয়ার এই আকস্মিক শব্দচয়নের পরিবর্তনকে কেবল একটি কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এটি রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গভীরতর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত। এটি রাশিয়ার কাছে ব্রিটেনের ভাবমূর্তি এবং অবস্থান সম্পর্কে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। উল্লেখ্য, 'গ্রেট' শব্দটির ব্যবহার মূলত কোনো দেশের মহত্ত্ব বা গুরুত্ব বোঝানোর জন্য ছিল না, বরং ভৌগোলিক বিভাজনের উদ্দেশ্যে এটি গ্রহণ করা হয়েছিল—ফ্রান্সের ব্রিটানি অঞ্চল থেকে ব্রিটেনকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করতে এই নামকরণ করা হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যে রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কেলিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মস্কো তাৎক্ষণিকভাবে লন্ডনে কোনো নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়নি। দ্য টাইমসের একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশের পর মস্কো-লন্ডন কূটনৈতিক সম্পর্কের মর্যাদা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে যে লন্ডনের কার্যকলাপের কারণে উভয় দেশের সম্পর্ক ইতিমধ্যেই সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, রাশিয়ায় নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নাইজেল কেসি উভয় দেশের বর্তমান সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। তবে, এটি স্পষ্ট যে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের মর্যাদা হ্রাস করার অর্থ কেবল রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে তাঁর দায়িত্ব 'চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স' (Charge d'Affaires) নামক নিম্নপদস্থ কোনো কূটনীতিকের হাতে অর্পণ করা নয়। বরং এটি অন্য পক্ষের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি অসন্তোষের একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা এবং উভয় দেশের সম্পর্ককে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনার একটি প্রক্রিয়া। ভবিষ্যতে যদি পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়, তবে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারে, যা সাধারণত সরাসরি সামরিক সংঘাতের প্রাক্কালে ঘটে থাকে। এমন একটি ঘটনা বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুতর পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

ঐতিহাসিকভাবে, রুশ সাম্রাজ্যের যুগে গ্রেট ব্রিটেন ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী পরাশক্তি। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের (১৮৫৩-১৮৫৫) সময় রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রতিকূল জোট গঠনে ব্রিটেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সময়ে, মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব খর্ব করতে দেশটি ধারাবাহিক নীতি অনুসরণ করেছিল। এই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই 'দ্য গ্রেট গেম' নামক ভূ-রাজনৈতিক পরিভাষার জন্ম দেয়। ১৯০৫ এবং ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের মধ্যবর্তী সময়ে, লন্ডনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার রাজনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। সোভিয়েত যুগে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তাঁর বিখ্যাত 'ফুলটন ভাষণ' প্রদান করেন, যা শীতল যুদ্ধের সূচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। এর পূর্বে তাঁর সরকার 'অপারেশন আনথিঙ্কেবল' পরিকল্পনা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যেখানে সোভিয়েত সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক হামলার কথা ভাবা হয়েছিল।

বর্তমানে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার 'কৌশলগত পরাজয়' ঘটাতে কিয়েভের প্রচেষ্টায় লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অবাক করার মতো নয়। ইউক্রেনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য 'কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং'-এর অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে, কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে যেকোনো সমঝোতা ঠেকাতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।