Wed 29th Jul 2026, 2:55 am

পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশাল সাফল্য! কোন অনন্য জাদুতে দর্শক মন জয় করল ‘দ্য অডিসি’?

পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশাল সাফল্য! কোন অনন্য জাদুতে দর্শক মন জয় করল ‘দ্য অডিসি’?
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের উপাখ্যান মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন আখ্যান। যুদ্ধবিধ্বস্ত সৈনিক, পথভ্রষ্ট কিংবা গৃহত্যাগী মানুষও দীর্ঘকাল পর আপনজনদের সান্নিধ্য ফিরে পেতে চায়। এই চিরন্তন কাহিনিই যুগে যুগে বিভিন্ন রূপে বর্ণিত হয়েছে। প্রায় তিন সহস্রাব্দ পূর্বে গ্রিক মহাকবি হোমার এই আখ্যানকেই ‘দ্য অডিসি’ মহাকাব্যে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

হোমারের এই মহাকাব্য অতীতেও চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। তবে নোলানের ‘দ্য অডিসি’ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। তিনি কেবল মূল আখ্যানকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেননি, বরং এর এক নতুনতর ব্যাখ্যাও উপস্থাপন করেছেন। মূল কাহিনির অপরিহার্য অংশগুলোকে অক্ষুণ্ন রেখেও ওডিসিউসের চরিত্রে তিনি যুক্ত করেছেন এক ভিন্ন মাত্রা। হোমারের ওডিসিউস যেখানে অধিক আত্মবিশ্বাসী ও যুদ্ধজয়ী বীর হিসেবে চিত্রিত, নোলানের ওডিসিউস সেখানে এক পরিশ্রান্ত, অনুতপ্ত ও মানবিক সত্তা। হোমারের মূল মহাকাব্য, বিভিন্ন অনুবাদ এবং ঐতিহাসিক সূত্রাবলি থেকে তিনি কাহিনিটিকে নিজস্ব শৈলীতে বিন্যাস করেছেন। বিশেষত, এমিলি উইলসনের ইংরেজি অনুবাদের প্রভাব চিত্রটিতে সুস্পষ্ট।

ফলস্বরূপ, যারা মূল মহাকাব্যটি পাঠ করেছেন, তারা কাহিনির কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন সহজেই অনুধাবন করবেন। আবার ‘দ্য অডিসি’ সম্পর্কে যাদের পূর্বধারণা সীমিত, তাদের কাছেও ছবিটি দুর্বোধ্য মনে হবে না। নোলান আখ্যানটিকে এমনভাবে বিন্যাস করেছেন, যা একই সঙ্গে পরিচিত এবং অভিনব—উভয় অনুভূতিই জাগায়। এ কারণেই ‘দ্য অডিসি’ কোনো বিশাল যুদ্ধের দৃশ্য দিয়ে শুরু না হয়ে, শুরু হয় এক উপাখ্যানের মাধ্যমে।

চলচ্চিত্রটির প্রারম্ভে একজন চারণকবি ট্রোজান যুদ্ধের কাহিনি বর্ণনা করছেন। সম্মুখে উপবিষ্ট শ্রোতাদের কাছে এটি হয়তো বহুবার শ্রুত একটি আখ্যান, কিন্তু সেই গল্পের অন্তরালেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় আরেক নতুন গল্প। এই গল্পের নায়ক ওডিসিউস (ম্যাট ডেমন)। ট্রোজান যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পরেও আটটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, অথচ ইথাকার রাজা ওডিসিউস এখনো নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করতে পারেননি।

এদিকে, ইথাকায় ওডিসিউসের স্ত্রী পেনেলোপে প্রায় আঠারো বছর ধরে অদম্য ধৈর্যের সঙ্গে স্বামীর জন্য প্রতীক্ষা করছেন। পুত্র তেলেমাকাস (টম হল্যান্ড) পিতৃহীন অবস্থায় বেড়ে উঠেছে। রাজপ্রাসাদ পেনেলোপের পাণিপ্রার্থীদের ভিড়ে পরিপূর্ণ। তারা সকলেই পেনেলোপেকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক, কারণ তারা ধরে নিয়েছে যে ওডিসিউস আর জীবিত নেই। কিন্তু পেনেলোপে এখনও আশা ত্যাগ করেননি। পেনেলোপ বিশ্বাস করেন, তাঁর স্বামী ফিরে আসবেন।

**এক নজরে:**
* **চলচ্চিত্র:** ‘দ্য অডিসি’
* **বর্গ:** মহাকাব্যিক, অ্যাকশন-ফ্যান্টাসি
* **অনুপ্রেরণা:** হোমারের ‘অডিসি’
* **পরিচালনা:** ক্রিস্টোফার নোলান
* **অভিনয়:** ম্যাট ডেমন, অ্যান হ্যাথাওয়ে, রবার্ট প্যাটিনসন, টম হল্যান্ড, জেন্ডায়া, সামান্থা মর্টন, লুপিতা নিওঙ্গ’ও
* **দৈর্ঘ্য:** ২ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট

অন্যদিকে, সুদূর এক দ্বীপে ওডিসিউস স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে অবস্থান করছেন। তিনি কীভাবে সেখানে উপনীত হলেন, কেনই বা এত বছর ধরে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করতে পারেননি—এই প্রশ্নগুলির উত্তর চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য জুড়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। তিনি কি শেষ পর্যন্ত ইথাকায় ফিরতে সক্ষম হবেন, নাকি ঘরে ফেরার পূর্বেই সবকিছু হারাবেন? এই জিজ্ঞাসার অন্বেষণেই ‘দ্য অডিসি’ এগিয়ে চলে। একে একে উন্মোচিত হয় পৌরাণিক উপাখ্যানের বিভিন্ন চরিত্র—একচক্ষু সাইক্লোপস, দানবীয় লায়েস্ট্রিগোনিয়ান, জাদুবিদ্যা পারদর্শী সির্সি (সামান্থা মর্টন), ক্যালিপসো (শার্লিজ থেরন), সম্মোহনী সাইরেনবৃন্দ এবং ওডিসিউসের সহায়ক দেবী অ্যাথেনা (জেন্ডায়া)।

গত ১৭ জুলাই বিশ্বজুড়ে মুক্তি পায় ‘দ্য অডিসি’। মুক্তির পর থেকেই এটি বক্স অফিসে এক তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ছবিটির আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯০ মিলিয়ন ডলার (যা প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য)। বাংলাদেশেও এটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, যেখানে দৈনিক ৫০টিরও অধিক প্রদর্শনী হচ্ছে এবং মুক্তির এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় দুই কোটি টাকা আয় করেছে।

‘দ্য অডিসি’ উপভোগ করার সময় মনে হয়, গত দুই দশকে ক্রিস্টোফার নোলানের নির্মিত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলিকেও স্মরণে রাখা জরুরি। এটি কেবল যুদ্ধপরবর্তী এক পরিশ্রান্ত, বিশ্বস্ত মানুষের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের গল্প নয়, যা নোলানের প্রায় প্রতিটি কর্মেই পুনরাবৃত্ত হয়েছে—কখনো সন্তান, কখনো সহযোদ্ধা, কখনো পরিবার, আবার কখনো স্বীয় সত্তার কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রূপে। বরং, নোলানের অনন্য চলচ্চিত্রভাষার বহু পরিচিত দৃশ্যকল্প ও ভাবনা এখানে এক নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।

সমুদ্রতীরে স্মৃতির সাথে সংগ্রামরত বিভ্রান্ত মানুষ (‘ইনসেপশন’), খণ্ডিত স্মৃতি জুড়ে দিয়ে অতীত অন্বেষণের প্রয়াস (‘মেমেন্টো’), আহত নায়কের অবরুদ্ধ শহরে প্রত্যাবর্তন (‘দ্য ডার্ক নাইট’ ত্রয়ী), অন্ধ চরিত্র এবং বিজয়ের প্রতি তীব্র আকর্ষণ (‘দ্য প্রেস্টিজ’), জল ও স্থলে যুদ্ধের কৌশল (‘ডানকার্ক’), প্রতারণার জটিল বুনন (‘ইন্টারস্টেলার’), স্বীয় আবিষ্কারের পরিণাম দ্বারা তাড়িত বিজ্ঞানী (‘ওপেনহাইমার’), অপরাধবোধে নিদ্রাহীন এক প্রাক্তন সেনা (‘ইনসমনিয়া’)—এসবেরই প্রতিধ্বনি যেন ‘দ্য অডিসি’-তে এসে একীভূত হয়েছে। ছবিটি দেখতে দেখতে মনে হয়, নোলান যেন তাঁর সমগ্র কর্মজীবনেই ধীরে ধীরে ‘দ্য অডিসি’ নির্মাণের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন!

নোলান এই বিশাল ক্যানভাসের চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন চরিত্রের জন্য একদল তারকা অভিনয়শিল্পীকে নির্বাচন করেছেন। ওডিসিউসের ভূমিকায় ম্যাট ডেমন তাঁর চরিত্রটিকে অনবদ্য নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি কোনো অতিমানবীয় বীরের চিত্রায়ণে যাননি। বরং, দীর্ঘ যুদ্ধ, হারানো সহচর এবং স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় বিপর্যস্ত একজন মানুষের ক্লান্তি তাঁর মুখাবয়বে অসাধারণভাবে পরিস্ফুট হয়েছে।

অ্যান হ্যাথাওয়ের পেনেলোপে চরিত্রটির পর্দায় উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় পরিশ্রান্ত হলেও আশা না-ছাড়া এক নারীর অটল দৃঢ়তা তিনি অত্যন্ত সংযতভাবে তুলে ধরেছেন। তেলেমাকাস চরিত্রে টম হল্যান্ডও তাঁর সহজাত অভিনয়শৈলী প্রদর্শন করেছেন। পিতাকে কখনো না দেখেও তাঁকে অন্বেষণ করার যে অস্থিরতা ও কৌতূহল, তা তাঁর অভিনয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পেয়েছে। রবার্ট প্যাটিনসন অ্যান্টিনাস চরিত্রে প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন। তাঁর স্বল্প সময়ের উপস্থিতিতেও চরিত্রটির ক্ষমতালিপ্সা ও আত্মবিশ্বাস সুনিপুণভাবে পরিস্ফুট হয়েছে। তবে পেনেলোপে ও অ্যান্টিনাসের সম্পর্ক কাহিনিতে গভীরতা অর্জন করতে পারেনি। বরং, অন্ধ ভৃত্য ইউমেয়াসের চরিত্রে জন লেগুইজামোর অভিনয় দর্শক মন স্পর্শ করে যায়।

একইভাবে, লুপিতা নিওঙ্গ হেলেন ও ক্লাইটেমনেস্ট্রা—দুটি চরিত্রে অভিনয় করলেও তাঁকে আরও বেশি সুযোগ দেওয়া যেত। তবে স্বল্প উপস্থিতিতে সর্বাধিক নজর কেড়েছেন সামান্থা মর্টনের সির্সি চরিত্রটি। তিনি ক্ষুধার্ত নাবিকদের খাদ্য পরিবেশন করে একে একে শূকরে রূপান্তরিত করেন। দৃশ্যটি একই সঙ্গে ভয়াবহ ও শৈল্পিক। পরবর্তীতে সির্সির উক্তি—তিনি আসলে মানুষকে শূকরে পরিণত করেননি, বরং তাদের আসল রূপ প্রকাশ করেছেন—দর্শককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

নোলানের চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সময়ের সঙ্গে তাঁর নিপুণ খেলা। ‘দ্য অডিসি’-তেও সেই পরিচিত অসরলরৈখিক বর্ণনা ফিরে এসেছে। বর্তমানের ওডিসিউস, অতীতের যুদ্ধ, ইথাকায় প্রতীক্ষারত পেনেলোপ এবং পিতার সন্ধানে বেরিয়ে পড়া তেলেমাকাস—এই চারটি কাহিনির ধারা একই সঙ্গে অগ্রসর হয়। তবে এখানে এই অ-রৈখিক বর্ণনা গল্পের অনুধাবনে কোনো জটিলতা সৃষ্টি করে না; বরং এটি দর্শকদের ওডিসিউসের খণ্ড খণ্ড স্মৃতির সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হতে সাহায্য করে। এই দিকটিই চিত্রনাট্যের সবচেয়ে বড় সাফল্য। চলচ্চিত্রটির শুরুতেই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় না; বরং প্রতিটি স্মৃতির উন্মোচনের সঙ্গে সঙ্গে গল্পের নতুন একটি স্তর প্রকাশিত হতে থাকে। ফলে প্রায় তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও কৌতূহল শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে।

নোলান এখানে কেবল অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি বর্ণনা করেননি, তিনি একজন কিংবদন্তী চরিত্রকে একজন মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছেন। ট্রোজান যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এবং তাঁর নিজের সিদ্ধান্তের ভার তাঁকে বারবার তাড়া করে ফেরে। ফলস্বরূপ, তাঁর যাত্রা কেবল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার নয়, বরং নিজের অতীতের মুখোমুখি হওয়ারও এক প্রতীকি পথচলা। এই পরিবর্তন ছবিটিটিকে অধিকতর মানবিক করে তুলেছে। যুদ্ধজয়ের গৌরবের চেয়ে এখানে যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী পরিণতিই অধিক তাৎপর্যপূর্ণ।

কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ক্রিস্টোফার নোলানের অন্যতম উচ্চাভিলাষী সৃষ্টি। এটি বিশ্বের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যা সম্পূর্ণ ৭০ মিমি আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, বৃহৎ পর্দায় ছবিটির দর্শন এক ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা প্রদান করে। হোয়টে ভ্যান হোয়টেমার-এর সিনেমাটোগ্রাফি এবং প্রাচীন গ্রিক বাদ্যযন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে লুডভিগ গোরানসন-এর আবহসংগীত চলচ্চিত্রটির মহাকাব্যিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। হোয়টে ভ্যান সমুদ্রকে প্রচলিত নীল রঙের চিরাচরিত ধারণা থেকে মুক্ত করে এক নতুন রূপে উপস্থাপন করেছেন।

প্রাকৃতিক এবং অগ্নির আলোর ব্যবহার ছবিটির বহু দৃশ্যকে অধিকতর বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়: নোলান পৌরাণিক উপাদানগুলোকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, ঠিক ততটাই প্রাধান্য দিয়েছেন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে। সাইক্লোপস, সির্সি কিংবা সাইরেনের মতো ঘটনাগুলি কেবল রোমাঞ্চ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়; বরং এগুলি ওডিসিউসের যাত্রাপথের প্রতীকি বাধা। প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা যেন তাঁকে নিজের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সম্পাদনায় জেনিফার লেম আবারও তাঁর দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন। একাধিক সময়রেখা, অসংখ্য চরিত্র এবং দীর্ঘ যাত্রার আখ্যান হওয়া সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটির ছন্দ বেশিরভাগ সময় ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

‘দ্য অডিসি’ সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়। প্রায় তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্যের হওয়া সত্ত্বেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার জন্য আরও অধিক সময় বরাদ্দ করা যেত। বিশেষত, দুই ভয়ংকর সমুদ্রদানব স্কিলা-চ্যারিবডিস বা কিছু পৌরাণিক পর্ব খুব দ্রুত সমাপ্ত হয়ে যায়। ফলে মূল মহাকাব্যের বিশালতার তুলনায় কিছু অংশ অসম্পূর্ণ প্রতীয়মান হয়। একইভাবে, এত বড় তারকা সমাবেশ থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন অভিনেতাকে অত্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

যারা কেবল অবিরাম অ্যাকশন বা পৌরাণিক যুদ্ধ দেখতে আগ্রহী, তাদের কাছে চলচ্চিত্রটির কিছু অংশ ধীরগতির মনে হতে পারে। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ওডিসিউসের অপরাধবোধ প্রদর্শনের চেষ্টা থাকলেও, যুদ্ধের দৃশ্যগুলি এতটাই পরিপাটি ও রক্তহীন যে সেগুলি দর্শকের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় না। যাত্রা যত অগ্রসর হয়, ওডিসিউস তত পরিশ্রান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। তবে, চরিত্রের পাশাপাশি দর্শকের ধৈর্যও যেন ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে।

কারণ, নোলানের আগ্রহ যুদ্ধ প্রদর্শনের চেয়ে যুদ্ধ থেকে প্রত্যাগত মানুষটির মনস্তাত্ত্বিক দিকটির প্রতিই অধিক ছিল। তবে এটিই চলচ্চিত্রটির অন্যতম প্রধান শক্তি। ‘দ্য অডিসি’ শেষ পর্যন্ত দেবতা কিংবা দানবের আখ্যান না হয়ে, একজন মানুষের গল্প হয়ে ওঠে। সেই মানুষটি দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে অনুধাবন করে যে, সবচেয়ে কঠিন লড়াইটি হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং নিজের অন্তরাত্মার গভীরে।

চলচ্চিত্র জুড়ে অতীতের স্মৃতি, দুঃস্বপ্ন, বিভ্রম এবং খেয়ালি দেবতাদের উপস্থিতি মিলেমিশে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা তৈরি করেছে। আর এদিকে, গৃহে অপেক্ষমাণ স্ত্রী ও সন্তানেরা জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে পারছে না, যেন তারাও এক অদৃশ্য যুদ্ধের বন্দি।

চলচ্চিত্রটির অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য হলো ওডিসিউসের পাতাললোকে যাত্রা। মৃতদের সাথে কথোপকথনকালে তিনি যে জগতের সম্মুখীন হন, তা অদ্ভুত, ভয়াবহ এবং রহস্যময়। নোলান এখানে মৃতদের ‘ম্যাকবেথ’-এর ডাইনিদের মতো করে উপস্থাপন করেছেন।

মুক্তির পূর্বে এক সাক্ষাৎকারে নোলান জানিয়েছিলেন যে, এই চলচ্চিত্র নির্মাণে তিনি তাঁর বন্ধু এবং মেক্সিকান নির্মাতা গিয়ের্মো দেল তোরোর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছেন। চলচ্চিত্রটি দেখতে গিয়ে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একচক্ষু সাইক্লোপস, মানুষখেকো লায়েস্ট্রিগোনিয়ান এবং সমগ্র চলচ্চিত্রজুড়ে বিরাজমান হরর আবহ—এসবই দেল তোরোর প্রভাবকে সুস্পষ্ট করে তোলে।

সত্তর বছরেরও অধিক সময় পর হোমারের এই মহাকাব্য আবারও হলিউডে ফিরে এসেছে, যা একই সঙ্গে দৃষ্টিকে মুগ্ধ করে এবং মনকে পরিতৃপ্ত করে।