একসময় মডেলিং জগতে প্রবেশের জন্য তাঁকে সম্পূর্ণ অযোগ্য বিবেচিত করা হয়েছিল। কারণ, তাঁর গাত্রবর্ণ ছিল কৃষ্ণবর্ণ, উচ্চতা ছিল অস্বাভাবিক এবং শরীর ছিল লিকলিকে। ভারতের প্রচলিত সৌন্দর্য ধারণায় এই বৈশিষ্ট্যগুলিকেই বড় ‘ত্রুটি’ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু যে বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে নিজ দেশে অঞ্জলি মেন্ডিস বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন, কয়েক হাজার মাইল দূরের প্যারিসে গিয়ে সেগুলোই তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। কিংবদন্তি ফরাসি ডিজাইনার পিয়ের কারদাঁ তাঁকে প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হন এবং পরদিন থেকেই অঞ্জলি মেন্ডিস তাঁর ফ্যাশন হাউসের মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেন।
মাত্র ৬৫ রুপি বেতনের একজন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষিকা থেকে প্যারিসের আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনের এক পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার এই উত্থান সত্যিই এক রূপকথা। তবে এই রূপকথার পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল বহু প্রত্যাখ্যানের গ্লানি, তীব্র আর্থিক সংকট, পারিবারিক শোকের দীর্ঘ ছায়া, একাকীত্ব এবং এক গভীর ভালোবাসার করুণ পরিণতি।
দুরন্ত শৈশব, ভিন্ন স্বপ্নের হাতছানি
অঞ্জলি মেন্ডিসের জন্মনাম ছিল ফিলিস মেন্ডিস। ১৯৪৬ সালের ২৯ জানুয়ারি, ভারতের স্বাধীনতার ঠিক এক বছর আগে তিনি জন্ম নেন। গোয়ান ক্যাথলিক পরিবারে সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তাঁর বাবা, কেজেটান মেন্ডিস, সুইস ঘড়ি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং মা একটি বৃহৎ সংসার সামলাতেন। আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও, অঞ্জলির শৈশব ছিল আনন্দময় ও প্রাণবন্ত।
ছোটবেলায় অঞ্জলি ছিলেন অত্যন্ত দুরন্ত স্বভাবের। তিনি গাছে উঠতেন, ক্রিকেট খেলতেন এবং ছেলেদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ করতেন। নিজের ভাষায়, ছেলেদের সামনে নিজেকে জাহির করার জন্য তিনি নানা কাণ্ড ঘটাতেন। তখন কে জানত, এই দুরন্ত বালিকাটিই একদিন ইউরোপের অভিজাত ফ্যাশন অঙ্গনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন!
তবে ছোটবেলা থেকেই অঞ্জলির শারীরিক গঠন অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। তিনি ছিলেন অস্বাভাবিক লম্বা। স্কুলে তাঁর উচ্চতা নিয়ে নানা মন্তব্য শুনতে হতো। ক্লাসে সামনে বসলে পেছনের শিক্ষার্থীদের দেখতে সমস্যা হতো, তাই তাঁকে প্রায়ই পেছনের বেঞ্চে বসতে হতো।
পড়াশোনায় তিনি খুব ভালো ছিলেন না, বরং বই পড়তেই বেশি ভালোবাসতেন। এনিড ব্লাইটন এবং বারবারা কার্টল্যান্ডের বই ছিল অঞ্জলির প্রিয়। একবার পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ায় এক বন্ধুর কাছে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, একদিন তিনি খুব বিখ্যাত হবেন। সেই সময়ে হয়তো এটি কিশোরীর অভিমান বলে মনে হয়েছিল, কিন্তু কয়েক বছর পর সেই কথাই সত্যি হয়।
৬৫ রুপি বেতনের কর্মজীবন
কলেজে পড়ার সময় পরিবারের আর্থিক সংকট বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পড়াশোনার খরচের জন্য মায়ের কাছে অতিরিক্ত টাকা চাইলে মা তাঁকে কাজ করার পরামর্শ দেন। তখন মডেলিংয়ের কথা তাঁর মাথায় ছিল না। তিনি একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নেন, যেখানে মাসে মাত্র ৬৫ রুপি বেতন পেতেন।
পরিস্থিতি আরও কঠিন হয় যখন অঞ্জলির বাবার চাকরি চলে যায়। পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ায় তিনি কলেজের পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে সচিব হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে বিজ্ঞাপন জগতের পরিচিত ব্যক্তি ববি সিস্তারের সচিব হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তখন অঞ্জলির চেহারা ছিল প্রচলিত মডেলদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। চোখে মোটা চশমা, লম্বা হাত-পা, দীর্ঘ চুল ও রোগা শরীর— অথচ পরে এই চেহারাই আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।
মডেলিংয়ে আগমন, এক কাকতালীয় ঘটনা
মডেলিংয়ে অঞ্জলির প্রবেশ ছিল একেবারেই পরিকল্পনাহীন। একদিন বাসে যাওয়ার সময় এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেই তরুণী তাঁকে একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ফ্যাশন শোর কথা বলেন এবং সেখানে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন। কৌতূহল থেকে অঞ্জলি ফ্যাশন শো সমন্বয়কারী জিনি নওরোজির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
জিনি প্রথমেই অঞ্জলির চোখের চশমার দিকে নজর দেন। মডেলিং করতে হলে চশমা খুলতে হবে। এরপর অঞ্জলি কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার শুরু করেন এবং একটি ফ্যাশন শোতে প্রথমবারের মতো র্যাম্পে হাঁটেন।
সেই সময় ভারতীয় ফ্যাশন জগতে জিনাত আমান, শোভা রাজাধ্যক্ষসহ কয়েকজন পরিচিত মুখ ছিলেন। শোভা রাজাধ্যক্ষই পরে লেখক ও কলামিস্ট শোভা দে নামে পরিচিত হন। অঞ্জলির সঙ্গে তাঁদের বন্ধুত্বও তৈরি হয়।
কিন্তু র্যাম্পে অঞ্জলির উপস্থিতি নিয়ে সবাই খুশি ছিলেন না। তাঁর গায়ের রং নিয়ে মন্তব্য করা হতো। এমনকি ফ্যাশন জগতের মানুষদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছিল, এত সুন্দর মেয়েদের মধ্যে কেন এমন কৃষ্ণবর্ণ মেয়েকে বেছে নেওয়া হচ্ছে।
অঞ্জলি অবশ্য নিজের চেহারা বদলে ফেলার চেষ্টা করেননি। তাঁর লম্বা পা, দীর্ঘ শরীর, গাঢ় ত্বক— সবকিছুকেই তিনি নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই ভারতীয় ফ্যাশন জগতে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। একটি ফটোশুট থেকে প্রায় পাঁচ হাজার রুপি আয় করেন তিনি। সেই অর্থই তাঁকে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়।
তাঁর স্বপ্ন ছিল প্যারিস।
হাতে মাত্র ১৫০ ফ্রাঁ, গন্তব্য প্যারিস
১৯৭১ সাল। তখন প্যারিস ছিল বিশ্বের ফ্যাশন সাম্রাজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। পিয়ের কারদাঁ, ইভ সাঁ লোরাঁ, গিভঁশি, উঙ্গারোর মতো ডিজাইনারদের নাম বিশ্বজুড়ে আলোচিত। সেই জগতে ভারতের এক তরুণীর প্রবেশ প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল।
অঞ্জলির হাতে ছিল রিটার্ন টিকিট এবং মাত্র ১৫০ ফ্রাঁ। তবু তিনি প্যারিসে পৌঁছে গেলেন।
১৯৭১ সালের ৬ জুন প্যারিসে নামার পরদিনই তিনি পিয়ের কারদাঁর সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভারতীয় পোশাকে সজ্জিত হয়ে— শাড়ি, খোঁপা, কপালে টিপ— এই সাজেই তিনি কারদাঁর বুটিকে চলে গেলেন।
সমস্যা ছিল ভাষা। ফরাসি জানতেন না অঞ্জলি। ইংরেজিতে জানালেন, তিনি মডেল হতে চান। সেখানে থাকা কর্মীরা প্রথমে তাঁর কথা বুঝতেই পারেননি। ভারতীয় পোশাকে তাঁকে দেখে কেউ কেউ ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো কোনো ভারতীয় রাজপরিবারের সদস্য।
শেষ পর্যন্ত একজন ইংরেজিভাষী কর্মীর মাধ্যমে তাঁর কথা বোঝা গেল। জানানো হলো, পিয়ের কারদাঁ বিকেল পাঁচটায় তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন।
অঞ্জলি অপেক্ষা করতে থাকলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সেদিন তাঁর হাতে টাকা ছিল খুব সামান্য। সকাল থেকে প্রায় কিছুই খাননি। অপেক্ষার সময় তিনি বই পড়েই কাটিয়েছিলেন।
কারদাঁর সেই ‘ফান্তাস্তিক’ মন্তব্য
বিকেল পাঁচটায় দরজা খুলে ঢুকলেন পিয়ের কারদাঁ। ফ্যাশন জগতের এই কিংবদন্তি ডিজাইনারের সামনে দাঁড়িয়ে ভারতীয় তরুণী অঞ্জলি। কারদাঁ তাঁকে হাঁটতে বললেন।
অঞ্জলি শাড়ি পরেই হাঁটলেন। কারদাঁ তাঁর পায়ের দিকে তাকালেন। তিনি অঞ্জলির দীর্ঘ শরীর ও লম্বা পা খেয়াল করলেন। শাড়িটি একটু ওপরে তুলে পা দেখাতেও বলেছিলেন তিনি। তারপরই কারদাঁর মুখে এল সেই শব্দ—‘ফান্তাস্তিক’ (দারুণ)।
আর অঞ্জলির জীবনের মোড় ঘুরে গেল। কারদাঁ তাঁকে পরদিন থেকেই নিজের হাউস মডেল হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিলেন।
ভারতে যে গাত্রবর্ণ অঞ্জলির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল, প্যারিসে সেটিই হয়ে গেল তাঁর আলাদা সৌন্দর্যের পরিচয়। ভারতে যে উচ্চতাকে সমস্যা বলা হয়েছিল, কারদাঁর পোশাক পরিয়ে সেটিই র্যাম্পে হয়ে উঠল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। রোগা শরীরটিও হয়ে উঠল আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের উপযোগী।
অঞ্জলি তখন বুঝতে পারেন, সমস্যা আসলে তাঁর শরীরে ছিল না, সমস্যা ছিল মানুষের চোখে।
মডেল থেকে কারদাঁর মিউজ
প্যারিসে নতুন জীবন শুরু হলেও সবকিছু সহজ ছিল না। ভাষা জানতেন না, সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা এবং ফ্যাশন দুনিয়ার প্রতিযোগিতাও ছিল তীব্র। তবু দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেন অঞ্জলি।
এ সময় অঞ্জলির নামও বদলে যায়। জন্মের নাম ফিলিস মেন্ডিস। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় সহজে উচ্চারণ করা যায়, এমন একটি নাম দরকার ছিল। শেষ পর্যন্ত ‘অঞ্জলি’ নামটি বেছে নেওয়া হয়। সেই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
পিয়ের কারদাঁর সঙ্গে অঞ্জলির সম্পর্ক শুধু পেশাগত ছিল না। কারদাঁ তাঁকে নিজের ফ্যাশন হাউসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রায় এক যুগ ধরে অঞ্জলি তাঁর হয়ে কাজ করেন। তাঁর জন্য বিশেষভাবে পোশাক তৈরি করা হতো।
একসময় অঞ্জলি শুধু কারদাঁর মডেল ছিলেন না, হয়ে ওঠেন তাঁর মিউজ (অনুপ্রেরণা)।
কারদাঁর পাশাপাশি গিভঁশি, উঙ্গারো ও শাপারেলির মতো আন্তর্জাতিক ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করেছেন অঞ্জলি। সেই সময় আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মঞ্চে ভারতীয় নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। আর গাঢ় ত্বকের একজন ভারতীয় নারী হিসেবে অঞ্জলির সাফল্য ছিল আরও ব্যতিক্রমী। পরে তাঁকে ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক সুপারমডেলদের একজন হিসেবে স্মরণ করা হয়।
সাফল্যের মধ্যেও ব্যক্তিগত জীবনে শোক
পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি অঞ্জলির ব্যক্তিগত জীবনেও তখন নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। প্যারিসেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় এক ইংরেজ পুরুষের। সম্পর্কটি ধীরে ধীরে গভীর হয়। একসময় তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। অঞ্জলি তখন ক্যারিয়ারের শীর্ষে। সামনে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং ব্যক্তিগত জীবনে ভালোবাসার মানুষটি পাশে।
কিন্তু সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিয়ের আগেই অঞ্জলির প্রেমিক ক্যানসারে আক্রান্ত হন। অসুস্থতা দ্রুত বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান।
অঞ্জলির জীবনে এটি ছিল ভয়াবহ ধাক্কা। যে মানুষটির সঙ্গে তিনি ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন, সেই মানুষটিই হঠাৎ চলে গেলেন। অঞ্জলি পরে জানিয়েছিলেন, সেই সময় তাঁর জীবনের অর্থই যেন হারিয়ে গিয়েছিল। এরপরও তিনি জীবন থামিয়ে রাখেননি, কিন্তু সেই সম্পর্কের পর আর বিয়ে করেননি।
ব্যক্তিগত জীবনের এই শোকের পাশাপাশি একের পর এক পরিবারের সদস্যকেও হারাতে হয় অঞ্জলিকে। ১৯৭৯ সালে তাঁর মা স্ট্রোকে মারা যান। কিছুদিন পর বাবাকেও হারান তিনি।
র্যাম্প ছেড়ে ভিন্ন জীবনপথে
প্যারিস তখন অঞ্জলির ঘর হয়ে উঠেছে। ফ্যাশন জগতে তিনি প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু অঞ্জলির জীবন শুধু র্যাম্পের মধ্যে আটকে থাকেনি। একসময় মডেলিং থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শীর্ষে থেকে একজন মডেলের স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানো সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু অঞ্জলি বুঝেছিলেন, জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে তাঁকে অন্য কিছু করতে হবে।
পিয়ের কারদাঁ তখন অঞ্জলিকে ভারতে নিজের ব্যবসায়িক কার্যক্রম দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। এভাবেই অঞ্জলি মডেল থেকে ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে চলে যান। প্রায় ১৮ বছর কারদাঁর ভারতীয় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
অর্থাৎ, অঞ্জলির সামনে একসময় মডেল হওয়ার দরজাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তিনিই পরে একটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সাম্রাজ্যের ভারতীয় কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
র্যাম্পের জীবন থেকে সরে যাওয়ার পর রান্নার প্রতিও অঞ্জলির আগ্রহ বাড়ে। ভারতীয় খাবারের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর। প্যারিসের জীবনে ভারতীয় রান্নাকে নিজের পরিচয়ের একটি অংশ হিসেবে ধরে রাখেন। পরে মা থেকে মেয়ের কাছে ভারতীয় রান্নার ঐতিহ্য তুলে ধরার ভাবনা নিয়ে বইও প্রকাশ করেন।
শেষ অধ্যায়
২০০০ সালে পিয়ের কারদাঁর ফ্যাশন হাউসের ৫০ বছর পূর্তি হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অফিসের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করে। অঞ্জলিও কারদাঁর ভারতীয় ব্যবসার দায়িত্ব থেকে সরে আসেন। ২০১০ সালের ১৭ জুন ফ্রান্সের প্রোভঁসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান অঞ্জলি মেন্ডিস। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর।
মাত্র ৬৫ রুপি বেতনের একজন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষিকা থেকে প্যারিসের আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনের এক পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার এই উত্থান সত্যিই এক রূপকথা। তবে এই রূপকথার পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল বহু প্রত্যাখ্যানের গ্লানি, তীব্র আর্থিক সংকট, পারিবারিক শোকের দীর্ঘ ছায়া, একাকীত্ব এবং এক গভীর ভালোবাসার করুণ পরিণতি।
দুরন্ত শৈশব, ভিন্ন স্বপ্নের হাতছানি
অঞ্জলি মেন্ডিসের জন্মনাম ছিল ফিলিস মেন্ডিস। ১৯৪৬ সালের ২৯ জানুয়ারি, ভারতের স্বাধীনতার ঠিক এক বছর আগে তিনি জন্ম নেন। গোয়ান ক্যাথলিক পরিবারে সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তাঁর বাবা, কেজেটান মেন্ডিস, সুইস ঘড়ি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং মা একটি বৃহৎ সংসার সামলাতেন। আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও, অঞ্জলির শৈশব ছিল আনন্দময় ও প্রাণবন্ত।
ছোটবেলায় অঞ্জলি ছিলেন অত্যন্ত দুরন্ত স্বভাবের। তিনি গাছে উঠতেন, ক্রিকেট খেলতেন এবং ছেলেদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ করতেন। নিজের ভাষায়, ছেলেদের সামনে নিজেকে জাহির করার জন্য তিনি নানা কাণ্ড ঘটাতেন। তখন কে জানত, এই দুরন্ত বালিকাটিই একদিন ইউরোপের অভিজাত ফ্যাশন অঙ্গনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন!
তবে ছোটবেলা থেকেই অঞ্জলির শারীরিক গঠন অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। তিনি ছিলেন অস্বাভাবিক লম্বা। স্কুলে তাঁর উচ্চতা নিয়ে নানা মন্তব্য শুনতে হতো। ক্লাসে সামনে বসলে পেছনের শিক্ষার্থীদের দেখতে সমস্যা হতো, তাই তাঁকে প্রায়ই পেছনের বেঞ্চে বসতে হতো।
পড়াশোনায় তিনি খুব ভালো ছিলেন না, বরং বই পড়তেই বেশি ভালোবাসতেন। এনিড ব্লাইটন এবং বারবারা কার্টল্যান্ডের বই ছিল অঞ্জলির প্রিয়। একবার পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ায় এক বন্ধুর কাছে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, একদিন তিনি খুব বিখ্যাত হবেন। সেই সময়ে হয়তো এটি কিশোরীর অভিমান বলে মনে হয়েছিল, কিন্তু কয়েক বছর পর সেই কথাই সত্যি হয়।
৬৫ রুপি বেতনের কর্মজীবন
কলেজে পড়ার সময় পরিবারের আর্থিক সংকট বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পড়াশোনার খরচের জন্য মায়ের কাছে অতিরিক্ত টাকা চাইলে মা তাঁকে কাজ করার পরামর্শ দেন। তখন মডেলিংয়ের কথা তাঁর মাথায় ছিল না। তিনি একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নেন, যেখানে মাসে মাত্র ৬৫ রুপি বেতন পেতেন।
পরিস্থিতি আরও কঠিন হয় যখন অঞ্জলির বাবার চাকরি চলে যায়। পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ায় তিনি কলেজের পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে সচিব হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে বিজ্ঞাপন জগতের পরিচিত ব্যক্তি ববি সিস্তারের সচিব হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তখন অঞ্জলির চেহারা ছিল প্রচলিত মডেলদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। চোখে মোটা চশমা, লম্বা হাত-পা, দীর্ঘ চুল ও রোগা শরীর— অথচ পরে এই চেহারাই আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।
মডেলিংয়ে আগমন, এক কাকতালীয় ঘটনা
মডেলিংয়ে অঞ্জলির প্রবেশ ছিল একেবারেই পরিকল্পনাহীন। একদিন বাসে যাওয়ার সময় এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেই তরুণী তাঁকে একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ফ্যাশন শোর কথা বলেন এবং সেখানে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন। কৌতূহল থেকে অঞ্জলি ফ্যাশন শো সমন্বয়কারী জিনি নওরোজির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
জিনি প্রথমেই অঞ্জলির চোখের চশমার দিকে নজর দেন। মডেলিং করতে হলে চশমা খুলতে হবে। এরপর অঞ্জলি কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার শুরু করেন এবং একটি ফ্যাশন শোতে প্রথমবারের মতো র্যাম্পে হাঁটেন।
সেই সময় ভারতীয় ফ্যাশন জগতে জিনাত আমান, শোভা রাজাধ্যক্ষসহ কয়েকজন পরিচিত মুখ ছিলেন। শোভা রাজাধ্যক্ষই পরে লেখক ও কলামিস্ট শোভা দে নামে পরিচিত হন। অঞ্জলির সঙ্গে তাঁদের বন্ধুত্বও তৈরি হয়।
কিন্তু র্যাম্পে অঞ্জলির উপস্থিতি নিয়ে সবাই খুশি ছিলেন না। তাঁর গায়ের রং নিয়ে মন্তব্য করা হতো। এমনকি ফ্যাশন জগতের মানুষদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছিল, এত সুন্দর মেয়েদের মধ্যে কেন এমন কৃষ্ণবর্ণ মেয়েকে বেছে নেওয়া হচ্ছে।
অঞ্জলি অবশ্য নিজের চেহারা বদলে ফেলার চেষ্টা করেননি। তাঁর লম্বা পা, দীর্ঘ শরীর, গাঢ় ত্বক— সবকিছুকেই তিনি নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই ভারতীয় ফ্যাশন জগতে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। একটি ফটোশুট থেকে প্রায় পাঁচ হাজার রুপি আয় করেন তিনি। সেই অর্থই তাঁকে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়।
তাঁর স্বপ্ন ছিল প্যারিস।
হাতে মাত্র ১৫০ ফ্রাঁ, গন্তব্য প্যারিস
১৯৭১ সাল। তখন প্যারিস ছিল বিশ্বের ফ্যাশন সাম্রাজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। পিয়ের কারদাঁ, ইভ সাঁ লোরাঁ, গিভঁশি, উঙ্গারোর মতো ডিজাইনারদের নাম বিশ্বজুড়ে আলোচিত। সেই জগতে ভারতের এক তরুণীর প্রবেশ প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল।
অঞ্জলির হাতে ছিল রিটার্ন টিকিট এবং মাত্র ১৫০ ফ্রাঁ। তবু তিনি প্যারিসে পৌঁছে গেলেন।
১৯৭১ সালের ৬ জুন প্যারিসে নামার পরদিনই তিনি পিয়ের কারদাঁর সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভারতীয় পোশাকে সজ্জিত হয়ে— শাড়ি, খোঁপা, কপালে টিপ— এই সাজেই তিনি কারদাঁর বুটিকে চলে গেলেন।
সমস্যা ছিল ভাষা। ফরাসি জানতেন না অঞ্জলি। ইংরেজিতে জানালেন, তিনি মডেল হতে চান। সেখানে থাকা কর্মীরা প্রথমে তাঁর কথা বুঝতেই পারেননি। ভারতীয় পোশাকে তাঁকে দেখে কেউ কেউ ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো কোনো ভারতীয় রাজপরিবারের সদস্য।
শেষ পর্যন্ত একজন ইংরেজিভাষী কর্মীর মাধ্যমে তাঁর কথা বোঝা গেল। জানানো হলো, পিয়ের কারদাঁ বিকেল পাঁচটায় তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন।
অঞ্জলি অপেক্ষা করতে থাকলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সেদিন তাঁর হাতে টাকা ছিল খুব সামান্য। সকাল থেকে প্রায় কিছুই খাননি। অপেক্ষার সময় তিনি বই পড়েই কাটিয়েছিলেন।
কারদাঁর সেই ‘ফান্তাস্তিক’ মন্তব্য
বিকেল পাঁচটায় দরজা খুলে ঢুকলেন পিয়ের কারদাঁ। ফ্যাশন জগতের এই কিংবদন্তি ডিজাইনারের সামনে দাঁড়িয়ে ভারতীয় তরুণী অঞ্জলি। কারদাঁ তাঁকে হাঁটতে বললেন।
অঞ্জলি শাড়ি পরেই হাঁটলেন। কারদাঁ তাঁর পায়ের দিকে তাকালেন। তিনি অঞ্জলির দীর্ঘ শরীর ও লম্বা পা খেয়াল করলেন। শাড়িটি একটু ওপরে তুলে পা দেখাতেও বলেছিলেন তিনি। তারপরই কারদাঁর মুখে এল সেই শব্দ—‘ফান্তাস্তিক’ (দারুণ)।
আর অঞ্জলির জীবনের মোড় ঘুরে গেল। কারদাঁ তাঁকে পরদিন থেকেই নিজের হাউস মডেল হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিলেন।
ভারতে যে গাত্রবর্ণ অঞ্জলির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল, প্যারিসে সেটিই হয়ে গেল তাঁর আলাদা সৌন্দর্যের পরিচয়। ভারতে যে উচ্চতাকে সমস্যা বলা হয়েছিল, কারদাঁর পোশাক পরিয়ে সেটিই র্যাম্পে হয়ে উঠল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। রোগা শরীরটিও হয়ে উঠল আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের উপযোগী।
অঞ্জলি তখন বুঝতে পারেন, সমস্যা আসলে তাঁর শরীরে ছিল না, সমস্যা ছিল মানুষের চোখে।
মডেল থেকে কারদাঁর মিউজ
প্যারিসে নতুন জীবন শুরু হলেও সবকিছু সহজ ছিল না। ভাষা জানতেন না, সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা এবং ফ্যাশন দুনিয়ার প্রতিযোগিতাও ছিল তীব্র। তবু দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেন অঞ্জলি।
এ সময় অঞ্জলির নামও বদলে যায়। জন্মের নাম ফিলিস মেন্ডিস। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় সহজে উচ্চারণ করা যায়, এমন একটি নাম দরকার ছিল। শেষ পর্যন্ত ‘অঞ্জলি’ নামটি বেছে নেওয়া হয়। সেই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
পিয়ের কারদাঁর সঙ্গে অঞ্জলির সম্পর্ক শুধু পেশাগত ছিল না। কারদাঁ তাঁকে নিজের ফ্যাশন হাউসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রায় এক যুগ ধরে অঞ্জলি তাঁর হয়ে কাজ করেন। তাঁর জন্য বিশেষভাবে পোশাক তৈরি করা হতো।
একসময় অঞ্জলি শুধু কারদাঁর মডেল ছিলেন না, হয়ে ওঠেন তাঁর মিউজ (অনুপ্রেরণা)।
কারদাঁর পাশাপাশি গিভঁশি, উঙ্গারো ও শাপারেলির মতো আন্তর্জাতিক ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করেছেন অঞ্জলি। সেই সময় আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মঞ্চে ভারতীয় নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। আর গাঢ় ত্বকের একজন ভারতীয় নারী হিসেবে অঞ্জলির সাফল্য ছিল আরও ব্যতিক্রমী। পরে তাঁকে ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক সুপারমডেলদের একজন হিসেবে স্মরণ করা হয়।
সাফল্যের মধ্যেও ব্যক্তিগত জীবনে শোক
পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি অঞ্জলির ব্যক্তিগত জীবনেও তখন নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। প্যারিসেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় এক ইংরেজ পুরুষের। সম্পর্কটি ধীরে ধীরে গভীর হয়। একসময় তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। অঞ্জলি তখন ক্যারিয়ারের শীর্ষে। সামনে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং ব্যক্তিগত জীবনে ভালোবাসার মানুষটি পাশে।
কিন্তু সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিয়ের আগেই অঞ্জলির প্রেমিক ক্যানসারে আক্রান্ত হন। অসুস্থতা দ্রুত বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান।
অঞ্জলির জীবনে এটি ছিল ভয়াবহ ধাক্কা। যে মানুষটির সঙ্গে তিনি ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন, সেই মানুষটিই হঠাৎ চলে গেলেন। অঞ্জলি পরে জানিয়েছিলেন, সেই সময় তাঁর জীবনের অর্থই যেন হারিয়ে গিয়েছিল। এরপরও তিনি জীবন থামিয়ে রাখেননি, কিন্তু সেই সম্পর্কের পর আর বিয়ে করেননি।
ব্যক্তিগত জীবনের এই শোকের পাশাপাশি একের পর এক পরিবারের সদস্যকেও হারাতে হয় অঞ্জলিকে। ১৯৭৯ সালে তাঁর মা স্ট্রোকে মারা যান। কিছুদিন পর বাবাকেও হারান তিনি।
র্যাম্প ছেড়ে ভিন্ন জীবনপথে
প্যারিস তখন অঞ্জলির ঘর হয়ে উঠেছে। ফ্যাশন জগতে তিনি প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু অঞ্জলির জীবন শুধু র্যাম্পের মধ্যে আটকে থাকেনি। একসময় মডেলিং থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শীর্ষে থেকে একজন মডেলের স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানো সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু অঞ্জলি বুঝেছিলেন, জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে তাঁকে অন্য কিছু করতে হবে।
পিয়ের কারদাঁ তখন অঞ্জলিকে ভারতে নিজের ব্যবসায়িক কার্যক্রম দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। এভাবেই অঞ্জলি মডেল থেকে ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে চলে যান। প্রায় ১৮ বছর কারদাঁর ভারতীয় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
অর্থাৎ, অঞ্জলির সামনে একসময় মডেল হওয়ার দরজাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তিনিই পরে একটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সাম্রাজ্যের ভারতীয় কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
র্যাম্পের জীবন থেকে সরে যাওয়ার পর রান্নার প্রতিও অঞ্জলির আগ্রহ বাড়ে। ভারতীয় খাবারের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর। প্যারিসের জীবনে ভারতীয় রান্নাকে নিজের পরিচয়ের একটি অংশ হিসেবে ধরে রাখেন। পরে মা থেকে মেয়ের কাছে ভারতীয় রান্নার ঐতিহ্য তুলে ধরার ভাবনা নিয়ে বইও প্রকাশ করেন।
শেষ অধ্যায়
২০০০ সালে পিয়ের কারদাঁর ফ্যাশন হাউসের ৫০ বছর পূর্তি হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অফিসের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করে। অঞ্জলিও কারদাঁর ভারতীয় ব্যবসার দায়িত্ব থেকে সরে আসেন। ২০১০ সালের ১৭ জুন ফ্রান্সের প্রোভঁসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান অঞ্জলি মেন্ডিস। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর।
