Sat 1st Aug 2026, 4:27 pm

বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রত্যাহার করল ফিফা: তীব্র ফুটবল মহলের বিরোধিতার মুখে নতিস্বীকার

বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রত্যাহার করল ফিফা: তীব্র ফুটবল মহলের বিরোধিতার মুখে নতিস্বীকার
বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগের বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে অবশেষে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিশ্বজুড়ে ফুটবল কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনার মুখে এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটার বিষয়টি আজ নিশ্চিত করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
এক বিবৃতিতে ইনফান্তিনো বলেছেন, ‘ফুটবলকে ঐক্যবদ্ধ ও উন্নত করার লক্ষ্য আমাদের সব সময়ই ছিল এবং থাকবে। এই নীতির ধারাবাহিকতায়, আলোচিত প্রস্তাবটি আর অগ্রসর হবে না।’
গত মঙ্গলবার ফিফা এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছিল। এর আওতায় ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার মাধ্যমে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল। অনুমান করা হয়েছিল, এই নতুন সংস্থার মোট মূল্য হবে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। এফএফই-র প্রধান কাজ ছিল বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো বড় মাপের টুর্নামেন্টগুলো পরিচালনা করা।
ফিফার তরফে জানানো হয়েছিল যে, এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে ২০২৭ সালের প্রথম দিকে তাদের ২১১টি সদস্যদেশ এককালীন ২ কোটি ডলার করে আর্থিক অনুদান পাবে। এছাড়া, ২০২৭-২০৩০ মেয়াদের জন্য দেশগুলোর বরাদ্দ ৮০ লাখ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
তবে, এফএফই-তে এমনকি ক্ষুদ্র পরিসরেও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হস্তান্তরের প্রস্তাবটি উন্মোচনের প্রথম দিন থেকেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, ‘এই প্রস্তাব বহাল থাকা পর্যন্ত’ তাদের কোনো জাতীয় দল ফিফার কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নেবে না। পরবর্তীতে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনফেডারেশন (কনকাকাফ)-ও এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
উয়েফার পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিশ্বকাপকে কেবল একটি বাণিজ্যিক বিনিয়োগ পণ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর কোনো অংশই কখনো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।’
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করে যখন গতকাল শুক্রবার ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেন। তিনি এই পরিকল্পনাকে ‘ফিফা, ফুটবল এবং দীর্ঘমেয়াদে ফুটবল খেলার ভবিষ্যতের জন্য একটি ক্ষতিকর প্রস্তাব’ হিসেবে অভিহিত করেন।
এমনকি দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবলের সভাপতি আলেজান্দ্রো ডমিনগুয়েজ, যিনি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত, তিনিও এই প্রকল্পের পরিধি, কাঠামো, ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দাবি করেন।
গভীর রাতে দেওয়া পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণায় ইনফান্তিনো পুনরায় উল্লেখ করেন যে, এই উদ্যোগটি সদস্যদেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছিল এবং কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেলেই এটি কার্যকর করা হতো।
ইনফান্তিনো আরও যোগ করেন, ‘সবার মতামত গুরুত্বের সঙ্গে শোনার পর এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই প্রস্তাবটি এমন বিভাজন তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি), যার ৪৭টি সদস্যদেশ রয়েছে, উয়েফা ও কনকাকাফের প্রতি তাদের সংহতি প্রকাশ করে। সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পরিস্থিতি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ফিফা বিশ্বকাপ বয়কটের মতো গুরুতর বিষয় জনসমক্ষে আলোচনায় এসেছে। যারা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন, তাদের প্রত্যেকেরই এতে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।’
যদিও গতকাল শুক্রবার সকালেই ফিফা এক বিবৃতিতে দাবি করেছিল যে, সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না’।
কিন্তু এসব সত্ত্বেও ফিফার ওপর থেকে চাপ বিন্দুমাত্র কমেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন উয়েফাকে ধন্যবাদ জানানোর একদিন পর, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ইনফান্তিনোকে ফিফা পরিচালনার জন্য ‘ভুল ব্যক্তি’ হিসেবে মন্তব্য করেন।
তীব্র চাপের মুখে ইনফান্তিনো এখন ঘোষণা করেছেন যে, তিনি সব পক্ষকে নিয়ে ঐক্য স্থাপনের উপর জোর দেবেন এবং ফুটবলের সার্বিক প্রসার ঘটাতে সচেষ্ট হবেন।
এক বিবৃতিতে ইনফান্তিনো বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে ফুটবল-সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আবার এক টেবিলে আনাই আমার প্রধান লক্ষ্য। সবার যৌথ স্বার্থ রক্ষা করে এবং বিশেষ করে যেসব দেশের সবচেয়ে বেশি সাহায্যের প্রয়োজন, সেগুলিতে ফুটবলের উন্নয়ন সাধন করে আমরা এগিয়ে যাব।’