Mon 3rd Aug 2026, 3:12 am

বিশ্ব মঞ্চে অদম্য সংগ্রামের আখ্যান উপস্থাপনের প্রয়াস

বিশ্ব মঞ্চে অদম্য সংগ্রামের আখ্যান উপস্থাপনের প্রয়াস
বিউটি পার্লারে শোনা ঢাকার এক রহস্যময় লোককথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্রটি। সিনেমার নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন রুবাইয়াত হোসেন। বিদ্রূপের বিষয় হলো, নেতানিয়াহুর চেয়ে আমেরিকাকে ভালো চেনা রাজনৈতিক নেতা খুব কমই আছেন। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, মার্কিন রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে দক্ষতা আর ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিগলিতে তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু এই অতিরিক্ত জানাশোনাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।
আমি মনে করি, চাইলেই হঠাৎ একটা সিনেমা তৈরি হয়ে যায় না; গল্পগুলো সঠিক সময়েই নিজে থেকে আসে। ২০০৬ সালে ছোট একটি কাজ হিসেবে শুরু করলেও তখন এটি তৈরি করার মতো অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। এ ২০ বছরে দেশে-বিদেশে কাজ করে নানা অভিজ্ঞতা অর্জনের পর যখন সঠিক অভিনয়শিল্পী, প্রযোজক ও সহকর্মীদের একসঙ্গে পেলাম, তখনই সিনেমাটি বানানো সম্ভব হলো।

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর বিশেষত্ব কোথায়?

ঢাকার পরিচিত এক লোককথার ওপর ভিত্তি করে বানানো এটি এমন এক নারীবাদী সিনেমা, যা সৌন্দর্য, সামাজিক বাধা, ভয়, স্বাধীনতা আর নারীদের মনের ভেতরের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে ছুঁয়ে যায়। বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্ন, ভূত আর আবেগের মেলবন্ধন ঘটিয়ে একে শুধু চিন্তার বিষয় না বানিয়ে, মনের গভীর এক অনুভূতি হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সিনেমাটি বানাতে গিয়ে কোনো ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ ছিল কি?

এ সিনেমা তৈরি করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি ছিল আগে থেকে সবকিছু কড়া নিয়ন্ত্রণে রাখার অভ্যাস ছেড়ে দেয়া। দীর্ঘদিন আমার ধারণা ছিল, ভালো পরিচালক হতে হলে সবকিছু নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু সিনেমাটি আমাকে অন্যভাবে কাজ করতে শিখিয়েছে। শুটিংয়ের সময় দৃশ্য পাল্টেছি, চরিত্রগুলোকে তাদের মতো বদলে যেতে দিয়েছি, আর সম্পাদনার টেবিলে বসে গল্প নতুন করে সাজিয়েছি। আমি বুঝেছি, অনিশ্চয়তা কাজের বাধা নয়, বরং নতুন কিছু সৃষ্টির বড় শক্তি। সবকিছু নিজের মতো নিয়ন্ত্রণ করার জেদ ছেড়ে দেয়ায়ই সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো তৈরি হতে পেরেছে।

নারীদের স্বাধীনতার কথা সিনেমায় কীভাবে এল?

বাংলাদেশে বড় হওয়ার সময় নারীদের শরীর, ইচ্ছা আর চলাফেরার ওপর যে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি দেখেছি, সেটাই এ সিনেমার মূল আবেগ। দক্ষিণ এশীয় সৌন্দর্য ও রূপচর্চার আড়ালেও কীভাবে নারীত্ব বজায় রাখার কড়া সামাজিক নিয়ম লুকিয়ে থাকে, তা-ই দেখাতে চেয়েছি। সিনেমায় ‘‌কনে’ চরিত্রটি হলো আদর্শ নারীত্বের প্রতীক। পার্লার বা ঘরের চার দেয়াল যেমন সুরক্ষার জায়গা হতে পারে, তেমনই তা বন্দিশালাও হতে পারে। মূল চরিত্রটি সে সাজানো পরিচয় আর সামাজিক চাপ ভেঙে নিজের ইচ্ছা ও আত্মপরিচয় লড়াই করে ফিরিয়ে আনে।

আপনার সিনেমা কি শুধুই দুঃখ-কষ্ট বা নির্যাতনের কথা বলে?

আমার সিনেমা শুধু দুঃখ-কষ্ট বা নির্যাতনের গল্প বলে না, এটা মূলত স্বাধীনতার কথা বলে। মানসিকভাবে, শারীরিকভাবে কিংবা ভেতর থেকে স্বাধীন হওয়ার আনন্দ কেমন, তা বোঝানোই আমার মূল উদ্দেশ্য। স্থান পরিবর্তন করা, দেশ ছাড়া, নিজের মনের কথা শোনা কিংবা নীরব প্রতিবাদের মাধ্যমে আমার চরিত্রগুলো এ পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে বাঁচার পথ খুঁজে নেয়।

আপনার বেশির ভাগ সিনেমাই নারীদের নিয়ে। এ ধরনের গল্প আপনাকে বারবার কেন টানে?

নারীদের প্রতিদিনের সাধারণ জীবন আর তাদের মনের পেছনের গল্পগুলো আমাকে খুব টানে। পর্দায় নারীদের ভেতরের কথা দেখানোর সুযোগ এখনো অনেক বাকি। কেবল বড় কোনো ঘটনা নয়; ঘরের ভেতরে তাদের ছোট ছোট অভ্যাস, মানিয়ে চলা, আনন্দ, ভয় আর আড়ালের প্রতিবাদগুলোর মধ্যেও দারুণ সব গল্প থাকে। একজন নারীর চোখ দিয়ে পৃথিবীটা কেমন দেখায়, আমি সেখান থেকেই গল্প বলা শুরু করি। সে সাধারণ জীবনের গল্প থেকেই সমাজ, পরিবার ও স্বাধীনতার মতো বড় বড় বিষয় ফুটে ওঠে। আমি সব নারীর প্রতিনিধি হতে চাই না, তবে এমন চরিত্র তৈরি করতে চাই, যা দেখে একদম বাস্তব ও জীবনঘেঁষা মনে হবে।

সিনেমার কাস্ট ও টিম কীভাবে নির্বাচন করলেন?

এ সিনেমা বানানোর সময় অনেক সিদ্ধান্ত যুক্তি দিয়ে নয়, মন থেকে নিয়েছি। কাউকে বাছাই করার সময় আমার মনই বলে দিয়েছিল তারা সঠিক মানুষ। আমাদের ক্যামেরাম্যান লিওনোর তেলেসের কাজ আমার এত পছন্দ হয়েছিল যে তাকে ছাড়া এ সিনেমা বানানোর কথা ভাবতেই পারিনি। সহকারী পরিচালকদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে, যাদের অনেকেরই আগে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না। এমনকি আগে কখনো অভিনয় না করা একজন মানুষকেও আমরা মূল চরিত্রে নিয়ে নিয়েছি! ডিগ্রি বা পরিচিতির চেয়ে মানুষের ওপর ভরসা করতে শিখেছিলাম, যাদের সঙ্গে নিরাপদ বোধ করেছি, তারাই নিজেদের সেরাটা দিয়ে কাজ নিখুঁত করেছে।

আন্তর্জাতিক একদল নারী মিলে সিনেমাটি বানিয়েছেন। এ দলগত কাজ কীভাবে সাহায্য করল?

আমার প্রথম সিনেমা বানানোর সময় টিমের প্রধান পদগুলোয় সবাই পুরুষ ছিলেন। আর ১৫ বছর পর, এ সিনেমার চিত্রগ্রহণ থেকে শুরু করে প্রায় সব বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশ, পর্তুগাল, ফ্রান্স ও ভারতের নারীরা। নারীদের এ সহমর্মিতা ও মেধা পুরো কাজের পরিবেশটাই বদলে দিয়েছিল।

ঢাকা শহরটি এ সিনেমায় নিজেই যেন একটা চরিত্র। শহরটির অর্থ আপনার কাছে কী?

ঢাকা শহর চমৎকার এক বৈপরীত্যের জায়গা। এটি যেমন ভীষণ হিজিবিজি ও ক্লান্তিকর, তেমনই আবার খুব আপন আর সুন্দর। পুরনো ঐতিহ্য ধরে রেখেও আবার নিজেকে বদলে নিতে জানে। এখানে যেমন অনেক মায়া আছে, তেমনই আছে সমাজের কড়া নজরদারি। সিনেমাটির বেশির ভাগ দৃশ্য বাসাবাড়ি, ছাদ, বিউটি পার্লার বা বাগানের মতো চার দেয়ালের মাঝে রাখা হয়েছে, যা নারীদের বাধা সামলে চলার রূপক। এ সীমাবদ্ধতার ভেতরেও তাদের মজা করা, কল্পনা করা আর স্বাধীন অনুভূতির দৃশ্যগুলো আমি রেখেছি। ঢাকার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ভালোবাসার আর মানিয়ে চলার, সে অনুভূতিটাই সিনেমায় ফুটে উঠেছে।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরার পেছনের ভাবনাটা কী ছিল?

বাংলাদেশ অদম্য সহনশীলতার এক বড় উদাহরণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান সবই প্রমাণ করে বিপদের মুখেও এ দেশের মানুষের এক হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর দারুণ ক্ষমতা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিক ও নারীরা দেশকে সচল রাখছে। আমি সাধারণ বা একঘেয়ে নিয়মে দেশকে না দেখিয়ে, আমাদের এ জটিল, বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা আর অদম্য টিকে থাকার গল্প বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে চেয়েছি।

সিনেমাটি নিয়ে কাজ করেছেন ২০ বছর, দর্শক এটি দেখে কী অনুভূতি নিয়ে হল থেকে বের হবে বলে আশা করেন?

আমি চাই, দর্শক শুধু একটা গল্প বুঝতে পারার আনন্দ না নিয়ে পুরো সিনেমার অভিজ্ঞতাটা মনের ভেতর অনুভব করুক। আসল স্বাধীনতা কেমন, তা নিয়ে যেন সিনেমাটি প্রশ্ন তোলে। স্বাধীনতা মানে কেবল সমাজের দেয়া নিয়ম ভাঙা নয়, বরং সিনেমার ধরাবাঁধা নিয়ম কিংবা কারো কাছ থেকে অনুমতি নেয়ার মানসিকতা থেকেও মুক্ত হওয়া। হল থেকে বের হয়ে মানুষ যদি নিজের মনের কথার ওপর আরেকটু বেশি বিশ্বাস রাখতে পারে, তবেই আমার ২০ বছরের চেষ্টা সফল মনে করব। দিনশেষে আমি চাই, দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড যেন একটা মিষ্টি স্বপ্ন বা পুরনো স্মৃতির মতো দর্শকের মনে থেকে যায়।