Thu 6th Aug 2026, 1:02 am

সামার ’৩৬: ফরাসি রিভিয়েরার বিলাসবহুল হোটেলে রহস্যজনক হত্যা, নেপথ্যে কে?

সামার ’৩৬: ফরাসি রিভিয়েরার বিলাসবহুল হোটেলে রহস্যজনক হত্যা, নেপথ্যে কে?
একটি সার্থক ‘মার্ডার মিস্ট্রি’ বা হত্যারহস্যের কাহিনি কেবল ‘খুনি কে’ এই সহজ প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, যখন ‘কেন খুনটি ঘটল’—সেই গভীরতর অনুসন্ধানে প্রবেশ করে, তখনই তা দর্শকের মনে এক স্থায়ী প্রভাব ফেলে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা মানুষ, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, ক্ষমতা বিন্যাস এবং সমাজের বাস্তব চিত্র যখন এই রহস্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর নিছক একটি ধাঁধা থাকে না। আগাথা ক্রিস্টির কালজয়ী উপন্যাস থেকে শুরু করে আধুনিক ‘নাইভস আউট’ ফ্র্যাঞ্চাইজি পর্যন্ত অসংখ্য সফল রহস্যকাহিনি এই মূলমন্ত্রকেই ধারণ করেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই নেটফ্লিক্সের ফরাসি মিনি সিরিজ ‘সামার ’৩৬’ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সিরিজটি একটি ঐতিহাসিক মার্ডার মিস্ট্রি ও ড্রামা। এর মূল নির্মাতা মারি দেশাইরে ও ক্যাথরিন তুজে, এবং এতে অভিনয় করেছেন সোফিয়া এসাইদি, কনস্ট্যান্স গে, জুলি দ্য বোনা, ও নলওয়েন লেরয়। ফরাসি ভাষায় নির্মিত এই ছয় পর্বের সিরিজটি নেটফ্লিক্সে ৪৮ থেকে ৫৭ মিনিটের রানটাইমে উপলব্ধ। নির্মাতারা আগাথা ক্রিস্টির ক্লাসিক ‘হু ডান ইট’ ধাঁচের রহস্য থেকে অনুপ্রাণিত হলেও, তারা একে স্থাপন করেছেন ১৯৩৬ সালের ফ্রান্সের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সময়ে। ছয় পর্বের এই সিরিজে একদিকে ক্লাসিক ‘হু ডান ইট’ রহস্য রয়েছে, অন্যদিকে শ্রেণিবৈষম্য, ক্ষমতা ও চাপা ক্ষোভের মতো সামাজিক বিষয়াবলিকে গল্পের সঙ্গে নিপুণভাবে যুক্ত করা হয়েছে। ফ্রান্সে টেলিভিশনে সম্প্রচারের পর ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে এটি ১ জুলাই বিশ্বব্যাপী নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে মুক্তি পায়। এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এক গভীর রহস্যগল্প।

এই রহস্যের পটভূমি ১৯৩৬ সালের ফ্রান্স, যখন পপুলার ফ্রন্ট সরকার সবেমাত্র ক্ষমতায় এসেছে। ফরাসি ইতিহাসে এই প্রথমবার লাখো শ্রমজীবী মানুষ বেতনসহ ছুটি কাটানোর অধিকার লাভ করেন। এত দিন ভূমধ্যসাগর সংলগ্ন ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার সমুদ্রসৈকত ও বিলাসবহুল রিসোর্টগুলো ছিল কেবল অভিজাত শ্রেণির অবকাশযাপনের কেন্দ্র। এই নতুন নিয়মের ফলে সাধারণ শ্রমিক পরিবারও তাদের ছুটির দিনগুলো সেখানে কাটানোর সুযোগ পায়।

এই যুগান্তকারী সামাজিক পরিবর্তনের আবহে ফরাসি রিভিয়েরার এক বিলাসবহুল হোটেলের কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রভাবশালী সরকারি কৌঁসুলি আদ্রিয়াঁ জাকারের (আরনাড বিনার্ড) মরদেহ। তবে কে এই হত্যার মূল হোতা? কাহিনির স্তর উন্মোচিত হতে থাকলে বেরিয়ে আসে আরও গভীর প্রশ্ন—কেন খুন হলেন তিনি? হোটেলের অভ্যন্তরে উপস্থিত চারজন নারীর প্রত্যেকেরই নিহত ব্যক্তির প্রতি ছিল ব্যক্তিগত ক্ষোভ, দীর্ঘদিনের অসমাপ্ত হিসাব অথবা বহু পুরোনো কোনো গোপন সম্পর্ক। তদন্তের অগ্রগতিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে বহু মানুষের জটিল অতীত।

কাহিনির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কাল্পনিক রিভিয়েরা হোটেলের এক ছাদের নিচে জড়ো হয়েছে সমাজের বিচিত্র স্তরের মানুষ—ধনী শিল্পপতি, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, সাধারণ শ্রমিক পরিবার এবং হোটেল কর্মীরা। বাহ্যিকভাবে উৎসবের এক প্রফুল্ল মেজাজ বিরাজ করলেও, এই আড়ালের নিচে চাপা পড়েছিল বহু বছরের শ্রেণিদ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ এবং ক্ষমতার রেষারেষি। আর এই লুকায়িত সংঘাতই ধীরে ধীরে সমগ্র রহস্যকে আরও গভীর ও জটিল করে তোলে।

‘সামার ’৩৬’ এর মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে চারজন নারীকে কেন্দ্র করে—ইউজেনি বার্থিয়ে (সোফিয়া এসাইদি), লেউনি মোরেল (কনস্ট্যান্স গে), ব্লঁশ আকেরমান (জুলি দ্য বোনা) ও জুলিয়া ভিনসেন্ট (নলওয়েন লেরয়), যারা প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক অবস্থান থেকে এসেছেন। এই চারজনের জীবন একসময় সরকারি কৌঁসুলি আদ্রিয়াঁ জাকারকে ঘিরে জটিলভাবে জড়িয়ে পড়ে। কারো সাথে তার ছিল পুরোনো প্রেমঘটিত সম্পর্ক, কারো জীবনে তিনি ছিলেন অন্যায়ের প্রতিমূর্তি, আবার কারো সাথে জড়িত ছিল আর্থিক লেনদেন। ফলস্বরূপ, হত্যাকাণ্ডের পর এই চারজনই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজন হয়ে দাঁড়ায়।

এই চারটি কেন্দ্রীয় চরিত্রের মধ্যে ইউজেনি ও লেউনি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। ইউজেনি-এর ব্যক্তিগত জীবন ও অতীতের জটিল টানাপোড়েন গল্পে গভীর আবেগ সঞ্চার করে। অন্যদিকে, বাবাকে নির্দোষ প্রমাণ করার সংগ্রামে লিপ্ত লিওনি কেবল রহস্যের জটই নয়, বরং ন্যায়বিচারের মৌলিক প্রশ্নটিকেও সামনে নিয়ে আসে। ব্লঁশ ও জুলিয়ার কাহিনিও রহস্যের অগ্রযাত্রায় সহায়ক হয়, তবে তাদের চরিত্রগুলো আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরলে কাহিনি আরও সমৃদ্ধ হতে পারত।

উল্লেখ্য, ‘সামার ’৩৬’ এর গল্প কাল্পনিক হলেও এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বাস্তব। ১৯৩৬ সালে ফ্রান্সে প্রথমবার শ্রমজীবী মানুষের জন্য বেতনসহ ছুটি প্রবর্তনের ফলে যে ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, সেটিই এই সিরিজের মূল ভিত্তি। নির্মাতা মারি দেশেয়ার ও ক্যাথরিন তুজে নিশ্চিত করেছেন যে, আগাথা ক্রিস্টির ক্ল্যাসিক ‘হু ডান ইট’ রহস্যের ধরন থেকেই তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সিরিজটি প্রাথমিকভাবে ফ্রান্সের টেলিভিশন চ্যানেল টিএফ১-এ প্রচারিত হয় এবং ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে, যার প্রথম পর্ব প্রায় ৫৭ লাখ দর্শক উপভোগ করেন। পরবর্তীতে এটি নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মুক্তি পায়। ফ্রান্সের নিস, গ্রাস ও সসপেল শহরে সিরিজের বেশিরভাগ অংশের শুটিং হয়েছে, যা ফরাসি রিভিয়েরার দৃশ্যাবলীকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

এই চার নারীর পাশাপাশি সিরিজের কয়েকটি পার্শ্বচরিত্রও কাহিনিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিল্পপতি অঁরি (স্যাম কারম্যঅন), পুলিশ কর্মকর্তা আলফঁস রাভেন (ফ্রান্সোয়া-কাজাভিয়ে দেমেসো) এবং নিহত সরকারি কৌঁসুলি আদ্রিয়াঁ জাকার—প্রত্যেকেই রহস্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তবে, চিত্রনাট্যের কিছু দুর্বলতা এখানে পরিলক্ষিত হয়। চারটি প্রধান নারীকে ঘিরে একাধিক পারিবারিক সম্পর্ক, পুরোনো গোপন তথ্য এবং নতুন নতুন চরিত্রের আকস্মিক আবির্ভাব মাঝেমধ্যে গল্পের মূল সূত্রকে অনুসরণ করা দর্শকের জন্য কঠিন করে তোলে। বিশেষত প্রথম দুটি পর্বে চরিত্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে বেশ মনোযোগের প্রয়োজন হয়।

অভিনয়ের নিরিখে সিরিজটি হতাশ করে না। সোফিয়া এসাইদি ‘ইউজেনি’ চরিত্রে তাঁর নিপুণতার সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন রেখেছেন। কনস্ট্যান্স গে ‘লিওনি’র চরিত্রটিতে দৃঢ়তা ও অসহায়ত্বের দ্বৈত সত্তাকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। জুলি দ্য বোনা তাঁর ‘ব্লঁশ আকেরমান’ চরিত্রে আভিজাত্যের অন্তরালে লুকায়িত অস্থিরতাকে সংযত অভিনয়ে প্রকাশ করেছেন। আর নলওয়েন লেরয়ও ‘জুলিয়া’র চরিত্রে ভয়, লোভ ও দুর্বলতার মতো মানবীয় প্রবৃত্তিকে সাবলীলভাবে পর্দায় উপস্থাপন করেছেন।

‘সামার ’৩৬’ এর নির্মাণশৈলীতে যত্নের সুস্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হয়। ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগর-সংলগ্ন ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার নয়নাভিরাম সমুদ্রতীর, ১৯৩০-এর দশকের পোশাক-পরিচ্ছেদ, ক্ল্যাসিক গাড়ি এবং বিলাসবহুল হোটেলের অভ্যন্তরীণ সজ্জা—সবকিছুই সেই সময়ের চিত্রকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেছে। লোকেশন, কস্টিউম, আর্ট ডিরেকশন এবং পাসকাল লাফা-এর আবহসংগীত রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তবে, চিত্রনাট্য সবসময় সেই উচ্চ মান বজায় রাখতে পারেনি। রহস্যকে আরও জটিল করার প্রচেষ্টায় একাধিক চরিত্র, পারিবারিক সম্পর্ক এবং অতীতের গোপন তথ্য একসাথে উপস্থাপিত হয়েছে। সমস্যাটি চরিত্রের সংখ্যার মধ্যে নয়, বরং মাত্র ছয়টি পর্বের মধ্যে এতগুলি সম্পর্ককে সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরার চেষ্টায়। এর ফলে মাঝেমধ্যে মূল রহস্যের পরিবর্তে কে কার সাথে কীভাবে যুক্ত, সেটি বোঝাতেই দর্শককে অধিক মনোযোগ দিতে হয়। তা সত্ত্বেও, রহস্যের মূল প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। নির্মাতারা একাধিক সন্দেহভাজন এবং বিভ্রান্তিকর সূত্র ব্যবহার করেছেন, যা দর্শককে শেষ পর্যন্ত অনুমান প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখে। যদিও কিছু মোড় আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব, তবুও রহস্যের প্রতি সম্পূর্ণ আগ্রহ কখনই হারায় না।

১৯৩৬ সালের সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট এই সিরিজের একটি প্রধান শক্তি। শ্রমজীবী ও অভিজাত শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্ব এখানে কেবল একটি পটভূমি নয়, বরং চরিত্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সিদ্ধান্তগুলোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে, এই দিকটিকে আরও বিশদভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল। সিরিজের শুরুর দিকের কিছু পর্বে একই ধরনের পোশাক ও উপস্থাপনার কারণে কয়েকটি নারী চরিত্রকে পৃথকভাবে চিনতে কিছুটা সময় লাগে। এছাড়াও, মধ্যভাগে কাহিনির গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে, যা রহস্যের তীব্রতাকে কিছুটা হ্রাস করে। একটি ছয় পর্বের মিনি সিরিজ হিসেবে, চিত্রনাট্য যদি আরও সংক্ষিপ্ত ও সুসংহত হতো, তবে সিরিজটি আরও নিশ্ছিদ্র হতে পারত।

সব মিলিয়ে, ‘সামার ’৩৬’ একটি পুরোপুরি নিখুঁত মার্ডার মিস্ট্রি না হলেও, ১৯৩৬ সালের ফ্রান্সের সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট, চারটি ভিন্ন জীবনগাথা এবং নিপুণভাবে নির্মিত পিরিয়ডিক আবহ এই সিরিজটিকে অনন্য করে তুলেছে। এটি কেবল একজন খুনির সন্ধানের গল্প নয়, বরং পরিবর্তনশীল একটি সমাজেরও প্রতিচ্ছবি। চিত্রনাট্যের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, ইউরোপীয় পিরিয়ড মিস্ট্রি ঘরানার দর্শকদের জন্য ‘সামার ’৩৬’ নিঃসন্দেহে উপভোগ্য একটি সিরিজ।