ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা হ্রাস পেলে রোগী ও তাঁর স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। যদিও নিম্ন প্লেটলেট সংখ্যা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহন করে, এটিই রোগীর রক্তক্ষরণের সম্ভাব্য তীব্রতা বা সামগ্রিক রোগের জটিলতা মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি নয়। বস্তুত, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে প্লেটলেট হ্রাসই একমাত্র উদ্বেগের কারণ নয়। বরং প্লাজমা লিকেজ, গুরুতর রক্তক্ষরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যাপক ক্ষতিই অধিকতর গুরুতর জটিলতা হিসেবে বিবেচিত। প্লাজমা লিকেজকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। এর অর্থ হলো, রক্তনালীর অভ্যন্তর থেকে রক্তের তরল উপাদান (প্লাজমা) বহির্গত হয়ে পার্শ্ববর্তী টিস্যুতে প্রবেশ করা। প্লাজমা লিকেজের ফলস্বরূপ ফুসফুসের চারিপার্শ্বে অথবা উদর গহ্বরে তরল জমা হতে পারে। এর গুরুতর মাত্রায় রক্তচাপের আকস্মিক পতন, হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। সীমিত পরিসরে পরিচালিত কিছু প্রাথমিক গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর রক্তে প্লেটলেটের মাত্রা বৃদ্ধিতে পেঁপেপাতার রস সহায়ক হতে পারে। তবে, এই গবেষণাগুলোতে রস প্রস্তুতপ্রণালী ও মাত্রার মানদণ্ড সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় এর কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত টানা কঠিন। আরও উল্লেখযোগ্য যে, পেঁপেপাতার রস সেবনের মাধ্যমে ডেঙ্গু জ্বরের গুরুতর জটিলতা বা মৃত্যুহার কমার কোনো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এটি ডেঙ্গু জ্বরের একটি বৈশিষ্ট্য যে, রোগীর রক্তে প্লেটলেটের মাত্রা হ্রাস পেলেও সুস্থতার (রিকভারি) পর্যায়ে তা সাধারণত স্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। ফলস্বরূপ, পেঁপেপাতার রস সেবনের পর প্লেটলেট সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সেটি যে কেবল ওই রসের কারণেই হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সুতরাং, এ ধরনের ঘরোয়া প্রতিকারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে বাড়িতে নিশ্চিন্তে থাকা মোটেও সমীচীন নয়। অধিকন্তু, এর কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকিও বিদ্যমান। পেঁপেপাতার রসকে প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে গণ্য করে চিকিৎসকের পরামর্শ বা নিয়মিত ফলোআপ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে, যা গুরুতর জটিলতা শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসা প্রদানে বিলম্ব ঘটাতে পারে। মানবদেহে পেঁপেপাতার রসের নিরাপত্তা এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে যথেষ্ট উচ্চমানের গবেষণা এখনও অনুপস্থিত। কিছু প্রাণী-ভিত্তিক গবেষণায় এর যকৃতের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, সতর্কতা অবলম্বনপূর্বক চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ব্যতীত নিয়মিত পেঁপেপাতার রস সেবন থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। ডেঙ্গু জ্বরের যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যাবশ্যক। শুধুমাত্র কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) এবং প্লেটলেটের মাত্রার উপর নির্ভর করা উচিত নয়। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রস্রাবের পরিমাণ, সিবিসি (হেমাটোক্রিট, শ্বেতকণিকা, প্লেটলেট) এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পরীক্ষাসমূহের সামগ্রিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে রোগীর অবস্থা নিরূপণ করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ফলোআপের নির্দেশনা প্রদান করেন। জ্বর অথবা শারীরিক অস্বস্তির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে। তবে, অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (এনএসএআইডি), যা বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধের অন্তর্ভুক্ত, রোগীর রক্তক্ষরণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। নিম্নলিখিত বিপদচিহ্নগুলো দেখা দিলে রোগীকে অবিলম্বে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা অপরিহার্য: তীব্র পেটে ব্যথা, ক্রমাগত বমি, রক্ত বমি, কালো মলত্যাগ, নাক, মাড়ি বা শরীরের অন্য কোনো স্থান থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাত, মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা রক্তপিণ্ড নির্গমন, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, তীব্র অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাবের পরিমাণ হ্রাস, ত্বক ঠান্ডা বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক তন্দ্রাচ্ছন্নতা এবং আচরণগত পরিবর্তন। জ্বর কমে যাওয়া মানেই রোগী বিপদমুক্ত, এমন ধারণা করা ঠিক নয়। অনেক সময় জ্বর কমার পর বা ওই সময়ে রোগীর মধ্যে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই এই পর্যায়ে বর্ণিত বিপদচিহ্নগুলোর প্রতি বিশেষ সজাগ দৃষ্টি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র প্লেটলেট হ্রাস ডেঙ্গু রোগীদের নিয়মিত প্লেটলেট পরিসঞ্চালনের কারণ নয়। রোগীর রক্তক্ষরণের পরিমাণ এবং সামগ্রিক ক্লিনিক্যাল অবস্থা বিবেচনা করে একজন চিকিৎসকই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
