Tue 11th Aug 2026, 5:05 pm

অস্ট্রেলিয়া ভিসায় প্রতারণা রোধে সচেতনতা: যাচাই করুন প্রকৃত প্রক্রিয়া ও এজেন্ট

অস্ট্রেলিয়া ভিসায় প্রতারণা রোধে সচেতনতা: যাচাই করুন প্রকৃত প্রক্রিয়া ও এজেন্ট
বাংলাদেশি নাগরিকদের অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস ও কর্মসংস্থানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে একদল অসাধু মাইগ্রেশন এজেন্ট ও প্রতারক চক্র বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করছে। সম্প্রতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে নকল পোর্টাল তৈরি করে ভুয়া স্পন্সরশিপ ও কর্মসংস্থান-ভিত্তিক ভিজিট ভিসা প্রদানের অভিযোগে বেশ কয়েকটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে।

অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী অভিবাসন বা কর্মসংস্থান ভিসার প্রলোভনে সৃষ্ট এই জালিয়াতি সম্পর্কে ঢাকাস্থ অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন সম্প্রতি এক সতর্কবার্তা জারি করেছে। হাইকমিশন জানিয়েছে যে, ভুয়া মাইগ্রেশন এজেন্টদের প্রতারণা এড়াতে ভিসাসংক্রান্ত যেকোনো পরামর্শের জন্য অবশ্যই নিবন্ধিত মাইগ্রেশন এজেন্ট অথবা আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া আবশ্যক।

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশিদের এই প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করতে এবং সঠিক অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা প্রদানের উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

১.

অস্ট্রেলিয়ায় যেকোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান বা দক্ষ ভিসায় আবেদনের মূল শর্ত হলো নির্দিষ্ট পেশায় উচ্চ দক্ষতার আনুষ্ঠানিক প্রমাণপত্র এবং ভাষাগত যোগ্যতা (যেমন: আইইএলটিএস বা সমমানের আন্তর্জাতিক ইংরেজি পরীক্ষায় সন্তোষজনক স্কোর)। ভাষা পরীক্ষা বা পেশাগত দক্ষতা মূল্যায়ন ব্যতীত সরকারিভাবে অস্ট্রেলিয়ায় সরাসরি কর্মসংস্থান ভিসা প্রাপ্তির কোনো সুযোগ নেই।

২.

একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ন্যায় অস্ট্রেলিয়ায় 'কফিল' বা সাধারণ ভিসা ক্রয়-বিক্রয় সম্ভব। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। অস্ট্রেলিয়ার ভিসা প্রদানের একমাত্র আইনি ক্ষমতা সরকারের অভিবাসন বিভাগের (ডিপার্টমেন্ট অফ হোম অ্যাফেয়ার্স) উপর ন্যস্ত। কোনো ব্যক্তি, নিয়োগকর্তা অথবা সংস্থা ভিসার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না, এমনকি কোনো আইনজীবীও এমন নিশ্চয়তা প্রদানের অধিকারী নন।

৩.

অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান ভিসা নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর। একজন অস্ট্রেলীয় নিয়োগকর্তা কেবলমাত্র তখনই বিদেশ থেকে কর্মী স্পন্সরশিপের জন্য আবেদন করতে পারেন, যখন স্থানীয় শ্রমবাজারে উপযুক্ত দক্ষ জনবলের অভাব পরিলক্ষিত হয়। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘসূত্রিতার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।

একজন নিবন্ধিত অভিবাসন বিশেষজ্ঞকে কিভাবে শনাক্ত করবেন?

অস্ট্রেলিয়া সরকারের আইন অনুসারে, ভিসা সংক্রান্ত পরামর্শ বা সেবা প্রদানের জন্য একজন এজেন্টকে অবশ্যই ‘অফিস অব মাইগ্রেশন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অথরিটি’ বা ‘ওমারা’ (OMARA)-এর অধীনে নিবন্ধিত হতে হয়।

একজন নিবন্ধিত এজেন্টকে সরকারের নির্ধারিত কিছু আইনি নিয়মকানুন ও আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়:

—তারা প্রদত্ত সেবার ধরন অনুযায়ী কেবল ন্যায্য ও যুক্তিসংগত পারিশ্রমিক গ্রহণ করবেন।

—সেবা প্রদান শুরুর পূর্বে তারা গ্রাহককে খরচ এবং সেবার পরিধি সম্পর্কে একটি লিখিত চুক্তিপত্র বা সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদান করবেন।

—আবেদনের ফলাফল প্রাপ্তির সাথে সাথেই তারা আবেদনকারীকে অবহিত করবেন।

—অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওমারা (OMARA) পোর্টালে (www.mara.gov.au) প্রবেশ করে অনলাইন তালিকায় যেকোনো নিবন্ধিত এজেন্টের নাম বা নম্বর সহজেই বিনামূল্যে যাচাই করা সম্ভব।

সিডনি ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞ মহলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে প্রতারকদের কিছু সাধারণ কৌশল চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে:

নকল ওয়েবসাইট: অস্ট্রেলিয়া সরকারের অফিসিয়াল ভিসা পোর্টালে '.gov.au' ডোমেইন যুক্ত থাকে। প্রতারকেরা প্রায় অভিন্ন নাম ব্যবহার করে '.com' বা '.net' ডোমেইনে নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে ভুয়া ভিসা যাচাইয়ের সুবিধা প্রদর্শন করে।

ভুল আশ্বাস: ‘কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই শতাধিক পদে নিয়োগ’, ‘কর্মসংস্থান ভিসা থেকে দুই মাসে নিশ্চিত স্থায়ী নাগরিকত্ব’, অথবা ‘কোনো সাক্ষাৎকার বা ইংরেজি দক্ষতার প্রয়োজন নেই’—এরূপ অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক আশ্বাস দেখলেই এটিকে প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করুন।

কাজের ভুয়া চুক্তিপত্র: অস্ট্রেলিয়ার সুপরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের প্যাড ও লোগো ব্যবহার করে সম্পূর্ণ জাল নিয়োগপত্র তৈরি করা হয় এবং অগ্রিম অর্থ দাবি করা হয়।

অনলাইন নম্বর থেকে কল: ওভারসিস বা ইন্টারনেট-ভিত্তিক ফোন নম্বর ব্যবহার করে অস্ট্রেলিয়া থেকে কল করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করা হয়।

১. ভিসাসংক্রান্ত কোনো আর্থিক লেনদেনের পূর্বে এজেন্টের নিবন্ধন নম্বর যাচাই করে নিন।

২. ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রেরণ করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকুন। প্রতিটি লেনদেনের জন্য লিখিত রসিদ সংগ্রহ করা আবশ্যক।

৩. অস্ট্রেলিয়ার ভিসাসংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের জন্য কেবলমাত্র সরকারের অফিসিয়াল অভিবাসনসংক্রান্ত ওয়েবসাইট (immi.homeaffairs.gov.au) অনুসরণ করুন।

৪. কোনো নিয়োগকর্তার কাছ থেকে কাজের প্রস্তাব পেলে সরাসরি সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে যোগাযোগের তথ্য যাচাই করে সত্যতা নিশ্চিত করুন।

অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসীদের মতামত—

অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এই বিষয়ে সচেতন থাকার উপর জোর দিয়েছেন। তানভীর আহমেদ মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশে অনেকেই মনে করেন যে অস্ট্রেলিয়ায় মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করলেই ভিসা লাভ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখানকার আইন অত্যন্ত কঠোর। দক্ষতা ও ভাষাগত প্রমাণ ছাড়া এখানে কর্মসংস্থান ভিসা পাওয়া অসম্ভব। ভুয়া এজেন্টের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে জীবনের সঞ্চয় নষ্ট করবেন না।’

শারমিন সুলতানা উল্লেখ করেন, ‘প্রতারকেরা বর্তমানে সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি ভুয়া লিঙ্ক প্রেরণ করে, যার ফলে অনেক অসচেতন ব্যক্তি এই ফাঁদে পা দেন। অর্থ প্রদানের পূর্বে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওমারা পোর্টালে গিয়ে এজেন্টের নিবন্ধন সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত সহজ, এই ন্যূনতম সচেতনতা সকলের থাকা বাঞ্ছনীয়।’

কায়সার চৌধুরী বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় কোনো 'শর্টকাট' পথ নেই। সঠিক নিয়ম অনুসরণ করে যদি আপনার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকে, তবেই আবেদন করুন। যাচাই না করে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীকে অর্থ প্রদান করা মানে নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনা।’

অস্ট্রেলিয়ায় একটি সুন্দর ও সফল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। তবে সেই স্বপ্ন যেন কোনো প্রতারকের চক্রান্তে পড়ে দুঃস্বপ্নে পরিণত না হয়। সঠিক তথ্য যাচাই, বৈধ পথ অবলম্বন এবং সর্বোচ্চ সচেতনতাই নিরাপদ অভিবাসনের মূল চাবিকাঠি।

* কাউসার খান, ডেসি মিডিয়া পয়েন্টের সিডনি প্রতিনিধি ও অভিবাসন আইনজীবী।