Sat 26th Sep 2026, 12:27 pm

একমাত্র ‘স্বদেশ’ সিনেমার পর অভিনয় ত্যাগ: শাহরুখ খানের সহ-অভিনেত্রী গায়ত্রী জোশির স্বামী এখন ৪৮ হাজার কোটির রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যের কর্ণধার

একমাত্র ‘স্বদেশ’ সিনেমার পর অভিনয় ত্যাগ: শাহরুখ খানের সহ-অভিনেত্রী গায়ত্রী জোশির স্বামী এখন ৪৮ হাজার কোটির রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যের কর্ণধার
বলিউডে গায়ত্রী জোশির পরিচিতি আসে মাত্র একটি সিনেমার মাধ্যমে। ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আশুতোষ গোয়ারিকর পরিচালিত ‘স্বদেশ’ ছবিতে তিনি কিং খান শাহরুখ খানের বিপরীতে ‘গীতা’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন। বলিউডে শাহরুখের মতো মেগাস্টারের সঙ্গে অভিষেক নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ সূচনা ছিল।
তবে সেই প্রতিশ্রুতিময় শুরু অপ্রত্যাশিতভাবে দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ‘স্বদেশ’-এর পর আর কোনো চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি গায়ত্রীকে। চলচ্চিত্র জগত থেকে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে গুটিয়ে নেন। এরপর তিনি প্রখ্যাত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী বিকাশ ওবেরয়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০২৬ সালের হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট অনুযায়ী, তাঁর স্বামী বর্তমানে ভারতের ৫৯তম ধনী ব্যক্তি, যার সম্পদের পরিমাণ ৪৮ হাজার ১০০ কোটি রুপি।
গায়ত্রীর বিনোদন জগতে যাত্রা অবশ্য ‘স্বদেশ’-এর বহু পূর্বেই শুরু হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে তিনি চ্যানেল ভি-তে একজন ভিডিও জকি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি মডেলিংয়ে মনোনিবেশ করেন, যেখানে ১৯৯৯ সালের ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন এবং পরের বছর ‘মিস ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল’ খেতাব অর্জন করে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন ‘মিস ইন্টারন্যাশনাল’ প্রতিযোগিতায়।
মডেলিং জীবনে গায়ত্রীকে বিভিন্ন স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে দেখা যায়। এখানেই শাহরুখ খানের সঙ্গে তাঁর একটি যৌথ বিজ্ঞাপনচিত্রের কাজ ছিল। এই পূর্বপরিচিতিই পরবর্তীতে তাঁর চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের পথ সুগম করে।
তারপর আসে তাঁর একমাত্র চলচ্চিত্র, আশুতোষ গোয়ারিকর পরিচালিত ‘স্বদেশ’। এই ছবিতে শাহরুখ খান নাসার বিজ্ঞানী মোহন ভার্গবের চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি নিজের শিকড়ের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরে আসেন। ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক তরুণের আত্মানুসন্ধানের এই গল্প। এখানে গায়ত্রী ‘গীতা’ নামের একজন শিক্ষিকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, যিনি গ্রামীণ জীবন ও সেখানকার উন্নয়নের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত।
অভিষেক চলচ্চিত্রেই শাহরুখ খানের বিপরীতে গায়ত্রীর অভিনয় ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। যদিও মুক্তির সময় ‘স্বদেশ’ বাণিজ্যিকভাবে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তবে কালের পরিক্রমায় এটি দর্শক ও সমালোচকদের কাছে এক বিশেষ মর্যাদার আসন লাভ করে। ছবির ‘গীতা’ চরিত্রটি গায়ত্রীর অভিনয় জীবনের অন্যতম স্মরণীয় কাজ হিসেবে চিহ্নিত। তবে, এমন একটি সফল অভিষেকের পরও গায়ত্রী আর অভিনয় জগতে ফিরে আসেননি।
২০০৫ সালে তিনি বিকাশ ওবেরয়ের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। এরপর তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে পরিবার। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর গায়ত্রী অভিনয় থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে এসে তাঁর সংসার এবং দুই সন্তানকে লালন-পালনেই নিজেকে উৎসর্গ করেন।
গায়ত্রীর চলচ্চিত্র জীবনের সবচেয়ে বড় বিস্ময় সম্ভবত এখানেই নিহিত যে, একজন নবাগত অভিনেত্রী হিসেবে শাহরুখ খানের মতো তারকার বিপরীতে সফল অভিষেকের পর যেখানে তাঁর জন্য একের পর এক সিনেমার দুয়ার উন্মুক্ত হওয়ার কথা ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি ক্যামেরার সামনে থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর তাঁকে আর কখনোই রূপালি পর্দায় দেখা যায়নি।
অভিনয় জগত ত্যাগ করলেও গায়ত্রী জনজীবনের আলো থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হননি। স্বামী বিকাশ ওবেরয়ের সঙ্গে তাঁকে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা যায়। ২০২৩ সালে ইতালির সার্ডিনিয়ায় একটি মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনার পরও তাঁরা ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছিলেন। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গায়ত্রী ও বিকাশ দুজনেই প্রাণে বাঁচলেও, অন্য একটি গাড়িতে থাকা এক সুইস দম্পতির দুঃখজনক মৃত্যু হয়।
গায়ত্রীর স্বামী বিকাশ ওবেরয় ভারতের রিয়েল এস্টেট শিল্পে একটি সুপরিচিত নাম। তিনি ওবেরয় রিয়েলটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান মুম্বাইকে কেন্দ্র করে বিলাসবহুল আবাসন, অত্যাধুনিক বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং হোটেল ব্যবসায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে।
২০২৫ সালের হুরুন তালিকায় বিকাশ ওবেরয়ের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৯৬০ কোটি রুপি, যা তাঁকে ভারতের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় ৫৮তম স্থানে স্থান দিয়েছিল। এক বছর পর, ২০২৬ সালের প্রকাশিত তালিকায় তাঁর সম্পদ বেড়ে ৪৮ হাজার ১০০ কোটি রুপিতে দাঁড়ালেও, সামগ্রিক অবস্থানে তিনি এক ধাপ পিছিয়ে ৫৯তম স্থানে রয়েছেন। এই তালিকা গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়।
এক বছরে তাঁর সম্পদ ৫ হাজার ১৪০ কোটি রুপি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের কারণে গায়ত্রীর স্বামীর বর্তমান সম্পদ তাঁর একসময়ের সহশিল্পী শাহরুখ খানের মোট সম্পদের চেয়েও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
২০২৬ সালের হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট অনুসারে, শাহরুখ খানের মোট সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি রুপি। তিনি এই বছরও ভারতের সবচেয়ে ধনী অভিনেতা হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাঁর সম্পদের উৎস হিসেবে রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট এবং নাইট রাইডার্স স্পোর্টসের মতো বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত।
বিকাশ ও গায়ত্রীর বিলাসবহুল জীবনযাপনও প্রায়শই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় তাঁদের একটি নয়তলা প্রাসাদোপম বাড়ি রয়েছে, যার আয়তন প্রায় ৭৫ হাজার বর্গফুট। ইতালীয় স্থপতি ও ডিজাইনার পিয়েরো লিসোনি এই সুবিশাল বাড়িটির নকশা করেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে গায়ত্রী তাঁদের এই আবাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। বাড়ির নিচের দুটি বেজমেন্টে রয়েছে গাড়ি পার্কিং এবং ফিটনেস জোন। একটি সম্পূর্ণ তলা জুড়ে রয়েছে অত্যাধুনিক জিম, স্পা এবং একটি ১২ আসনের ব্যক্তিগত সিনেমা হল। বাড়ির উপরের অংশটি পরিবারের ব্যক্তিগত বসবাসের জন্য সংরক্ষিত। ছাদের ইনফিনিটি পুল থেকে আরব সাগরের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এছাড়াও বাড়িটি ভারতীয় শিল্পীদের বিভিন্ন শিল্পকর্মে সুসজ্জিত।
গায়ত্রী উল্লেখ করেন যে বিকাশ একসময় তাঁদের বাড়িটিকে ‘বুটিক হোটেল’ হিসেবে পরিচালনার কথা বলেছিলেন। তবে গায়ত্রীর নিজস্ব মত হলো, তিনি তাঁদের এই বাসস্থানকে কোনো হোটেলের সঙ্গে তুলনা করতে পছন্দ করেন না; এটি তাঁদের পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের একান্ত নিজস্ব আশ্রয়।
বলিউডে অনেক অভিনেতা ছোট চরিত্র থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে তারকা খ্যাতি অর্জন করেন। তবে গায়ত্রীর ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মডেলিং থেকে সরাসরি শাহরুখ খানের বিপরীতে নায়িকা হিসেবে অভিষেক, ব্যাপক প্রশংসা অর্জন—সবকিছু সত্ত্বেও তাঁর অভিনয় জীবন মাত্র একটি চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
‘স্বদেশ’ সিনেমার পর গায়ত্রী আর কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি। তাঁর পরবর্তী জীবনে পরিবারই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।