‘লাপাতা লেডিজ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একজন পরিচালক হিসেবে যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছেন কিরণ রাও। বর্তমানে তিনি তাঁর নতুন প্রজেক্ট ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’ নিয়ে ব্যস্ত। এই অ্যান্থলজি চলচ্চিত্রটির প্রচারণার ফাঁকে তিনি আধুনিক তরুণ প্রজন্মের প্রেম, সম্পর্ক এবং যৌনতা বিষয়ক তার গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। কিরণের ভাষ্যে, পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান তরুণদের সম্পর্কের ধরন অনেক বেশি স্বাধীন ও উন্মুক্ত। এমনকি বিবাহের পূর্বে প্রেম কিংবা শারীরিক সম্পর্ককেও তারা এখন আর অস্বাভাবিক বলে গণ্য করে না। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা আইএএনএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন কিরণ। সাক্ষাৎকারে প্রশ্নকর্তা মন্তব্য করেন যে, কিরণের সৃষ্ট চরিত্রগুলিতে তরুণ প্রজন্মকে প্রেম ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা হালকা বা অগভীর হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। তবে কিরণ এই মন্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত নন। তিনি এই সম্পর্ককে 'হালকা' না বলে 'স্বাধীন' হিসাবে বর্ণনা করতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিরণ উল্লেখ করেন, ‘আমি বরং 'স্বাধীন' শব্দটিই ব্যবহার করতে পছন্দ করব। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আমাদের প্রজন্মের চেয়ে স্বাধীনতার অনুভূতি অনেক বেশি প্রবল। তারা নিজেদের ভাবনা ও অনুভূতি অনেক বেশি বাধাহীনভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম।’ এই পরিবর্তনের মূলে সময় ও সমাজের বিবর্তনকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন কিরণ। তাঁর ভাষায়, ‘বর্তমান বিশ্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিজেদের প্রকাশ করার পদ্ধতিতেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। আমরা মূলত সেই পরিবর্তনটিকেই আমাদের কাজে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি।’ ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’ চলচ্চিত্রে তাঁর গল্পের মূল কেন্দ্রে রয়েছে দুজন তরুণ-তরুণী। তারা দুজনেই অবিবাহিত এবং একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট। তাদের এই আকর্ষণ থেকে সম্পর্ক কোন মোড় নেয় এবং তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ফলে কী ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, সেটাই এই গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিরণ ব্যাখ্যা করেন, ‘দুজন তরুণ-তরুণী, যারা কোনো প্রথাগত সম্পর্কে আবদ্ধ নয়, কিন্তু একে অপরের প্রতি তীব্রভাবে আকৃষ্ট। এরপর কী ঘটতে পারে? তারা যখন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন কোন ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হতে পারে? এই অনুসন্ধানেই প্রকৃত আনন্দ নিহিত রয়েছে।’ তবে কিরণ নিজের প্রজন্মের সঙ্গে বর্তমান সময়ের সম্পর্কের পার্থক্যের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, একসময় সমাজে সম্পর্কের ধরন নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রত্যাশা বিদ্যমান ছিল। বিশেষ করে বিবাহ এবং প্রেমঘটিত সম্পর্কগুলিকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করে দেখা হতো। কিরণ বলেন, ‘আমাদের সময়ে এমন এক প্রত্যাশা ছিল যে, একজন ব্যক্তির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এমনকি শারীরিক সম্পর্ক কিংবা গভীর আবেগপূর্ণ ঘনিষ্ঠতাও বিবাহের পর, বিশেষত পারিবারিক সম্মতিতে হওয়া বিবাহের পরেই ঘটবে—এমনটাই ছিল প্রচলিত সামাজিক ধারণা।’ তিনি মনে করেন, সেই বাস্তবতা বর্তমানে পরিবর্তিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এখন পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই।’ কিরণের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বিবাহের পূর্বে গভীর ও আবেগপূর্ণ সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছেন। শুধু আবেগিক সংযোগ নয়, শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও এই ধরনের সম্পর্কের একটি স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ এখন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েও গভীর, তীব্র, আবেগপূর্ণ এবং শারীরিকভাবে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছে। এই কারণেই বর্তমান বিশ্ব পূর্বের চেয়ে ভিন্ন।’ এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’ এর গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার প্রয়াস করেছেন কিরণ। তাঁর কাছে এটি কেবল সম্পর্কের গল্প নয়, বরং নতুন প্রজন্মের স্বাধীনভাবে নিজেদের আবিষ্কার করার এক উপাখ্যানও বটে। কিরণ উল্লেখ করেন, ‘আমরা এমন একটি গল্প তৈরি করতে চেয়েছি, যা এই নতুন প্রজন্মের মানুষের সতেজতা এবং স্বাধীন মানসিকতাকে প্রতিফলিত করে।’ ‘লাস্ট স্টোরিজ’ ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় কিস্তিও মূলত প্রেম, যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পর্কের বহুমুখী জটিল দিকগুলিকে তুলে ধরেছে। কিরণের এই বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও প্রসারিত করেছে—যেখানে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রেমের সংজ্ঞা, সম্পর্কের কাঠামো এবং ব্যক্তিগত পছন্দ কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেটাই তাঁর বার্তার মূল প্রতিপাদ্য।