Mon 27th Jul 2026, 2:49 am

গ্যাস সংকট: আশু সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ

গ্যাস সংকট: আশু সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা সহসা নিরসনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এবং আগামী কয়েকদিন পর্যন্ত এর তীব্রতা বজায় থাকতে পারে। এলএনজি রূপান্তর করে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাসমান টার্মিনাল এখনও সচল করা সম্ভব হয়নি, যা এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।

রাজধানী ঢাকার কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, কাজীপাড়া, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, বাড্ডাসহ বিভিন্ন জনপদে গ্যাসের তীব্র সংকট জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বহু এলাকায় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম, আবার কোথাও কোথাও চুলা একেবারেই জ্বলছে না, যা দৈনন্দিন কার্যক্রমে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

দেশের আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর ও সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে একটি পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি বেসরকারি সামিট গ্রুপ। গত মঙ্গলবার এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

গত দেড় দশক ধরে দেশের গ্যাস খাত চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এক বিশাল ঘাটতি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ধরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে মোট সরবরাহকৃত গ্যাসের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে, যা এই খাতের ভঙ্গুরতা নির্দেশ করে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র মতে, এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালে দুটি বয়লার রয়েছে, যার মধ্যে একটি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অক্ষত বয়লারটি চালু করা সম্ভব হলে দৈনিক আরও ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যেতে পারে। যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাত থেকে আগত বিশেষজ্ঞ দল গত বৃহস্পতিবার থেকে টার্মিনালটি সচল করার জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম দেশী মিডিয়া পয়েন্টকে জানিয়েছেন, কারিগরি দল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু টার্মিনালটি এখনও পুরোপুরি চালু করার অবস্থায় আনা যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন যে, এটি সচল করতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে, তবে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সময়সীমা জানানো সম্ভব হচ্ছে না।

এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে বিদ্যুৎ খাতে, যেখানে গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট কমে গেছে, যা বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ খাতের পর শিল্প-কারখানাগুলোতেও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও, রান্নার কাজে এবং পরিবহনের জ্বালানি (সিএনজি) হিসেবে গ্যাসের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও, গত কয়েকদিন ধরে অনেকেই চুলা জ্বালাতে পারছেন না। অনেক গ্রাহক বিদ্যুৎচালিত চুলা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, আর নিম্ন আয়ের মানুষরা মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নেওয়ার জন্য গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে, যা জনদুর্ভোগের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। যদিও গত বছর থেকে গড়ে দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। তবে, অগ্নিদুর্ঘটনার কারণে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে, যা চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি করেছে।

গ্রাহকদের কাছে সৃষ্ট অসুবিধার জন্য পেট্রোবাংলা গতকাল একটি বিবৃতি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামত করে এটি পুনরায় চালু করার জন্য দেশি ও বিদেশি কারিগরি দল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

রাজধানী ও এর পার্শ্ববর্তী জেলায় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি জানিয়েছে যে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন সকল শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের স্বল্পচাপ অব্যাহত থাকবে।

মোহাম্মদপুরের গ্রাহকরা গত শুক্রবার মানববন্ধন করে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘আমরা মোহাম্মদপুরবাসী’ নামক গ্রুপে গ্রাহকরা নিয়মিতভাবে তাদের অসন্তোষ ও ভোগান্তির কথা জানাচ্ছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম দেশী মিডিয়া পয়েন্টকে বলেছেন, বাংলাদেশের গ্যাস খাত দীর্ঘকাল ধরে এক সূক্ষ্ম সুতার ওপর ঝুলছিল। একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পরেই এর ভঙ্গুরতা প্রকটভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিকল্প ব্যবস্থার কথা বহু দিন ধরেই বলা হচ্ছিল এবং স্থলভাগে আরেকটি টার্মিনাল থাকলে সম্ভবত বর্তমান সংকট এড়ানো যেত।