Fri 31st Jul 2026, 2:44 am

চীনের উপর যুক্তরাষ্ট্রের অব্যবহৃত কৌশলগত অর্থনৈতিক প্রভাব: মিত্রতার শক্তি

চীনের উপর যুক্তরাষ্ট্রের অব্যবহৃত কৌশলগত অর্থনৈতিক প্রভাব: মিত্রতার শক্তি
ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চীনকে সুবিধাজনক অবস্থানে দেখা হলেও, গভীরতর বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রকাশিত কিন্তু বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি এবং কৌশলগত ক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও ২০২৫ সালের এপ্রিলে ওয়াশিংটনের শুল্কারোপের প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং বিরল খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসনকে এক প্রকার পিছু হটতে বাধ্য করেছিল, এবং এর পরের বছর মে মাসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ট্রাম্প-শি জিনপিং শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সীমিত লক্ষ্য অর্জনও ব্যর্থ হয়েছিল—যেখানে ট্রাম্প ৫০০ বোয়িং বিমান বিক্রির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে গিয়েও মাত্র ২০০টির সম্মতি পেয়েছিলেন—এমন দৃশ্যত চীনের সাফল্যের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করলেও, এই নৈরাশ্যবাদ একটি মৌলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে: চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা এখনো অপরিমেয়। ওয়াশিংটন দুর্বল হয়ে বেইজিংয়ের কাছে নতি স্বীকার করছে এমনটি নয়, বরং চীন তার সীমিত অর্থনৈতিক হাতিয়ারগুলো দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করেছে, যখন ওয়াশিংটন তার বিশাল কৌশলগত শক্তি সত্ত্বেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বেইজিংয়ের ওপর ওয়াশিংটনের কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত সুবিধা রয়েছে, যার মূল কারণ চীনের উচ্চপ্রযুক্তিগত যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং তার রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বাজার বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অপরিসীম নির্ভরশীলতা।

বেইজিংয়ের হাতে কিছু শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাতিয়ার রয়েছে। ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সংঘাতে চীন তার অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র, বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধের কৌশলটি প্রয়োগ করেছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথম বিধিনিষেধ আরোপের পর থেকে বেইজিং এগুলোকে দর কষাকষির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে কখনো কঠোর, আবার কখনো শিথিল করেছে। যদিও ২০২৫ সালের নভেম্বরে ওয়াশিংটনের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে কিছু বিধিনিষেধ স্থগিত করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের জুনে পুনরায় চাপ বৃদ্ধি পায়। বৈশ্বিক বিরল খনিজ উত্তোলনের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার ৯০ শতাংশ চীনের দখলে। এই নির্ভরশীলতা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বিরল খনিজ রপ্তানির বার্ষিক মূল্য ১০০ কোটি ডলারের কম। তবে সরবরাহ বন্ধ হলে অনেক মার্কিন উৎপাদন শিল্প সংকটে পড়ে। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা এই ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকলেও, পূর্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বর্তমানে ওয়াশিংটন বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে এবং অভ্যন্তরীণ ও বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোতে বিরল খনিজ উৎপাদনকারীদের অর্থায়ন বাড়াতে সচেষ্ট। ২০২৫ সালে মার্কিন পেন্টাগন উত্তর আমেরিকার প্রধান বিরল খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ‘এমপি ম্যাটেরিয়ালস’-এ ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং এই বরাদ্দ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে, বিরল খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তিন দশক ধরে চীন প্রক্রিয়াকরণ খাতে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, যা অর্জনে বিশেষায়িত জ্ঞান, নির্দিষ্ট উৎপাদন সুবিধা, এবং পরিবেশগত ক্ষতির (প্রতি টন বিরল খনিজ প্রক্রিয়াকরণে ২,০০০ টন বিষাক্ত বর্জ্য) বিনিময়ে বিপুল ভর্তুকি প্রদানে বেইজিংয়ের সদিচ্ছা জড়িত ছিল। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর পক্ষে এমন পরিবেশগত বা সামাজিক মূল্য গ্রহণ করা কঠিন, এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর আইনি ও পরিবেশগত অনুমোদন প্রক্রিয়া নতুন খনি ও কারখানার অনুমোদনকে দীর্ঘমেয়াদী মামলায় পর্যবসিত করে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ায়।

চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৃষিপণ্য সয়াবিন আমদানি স্থগিত করার মাধ্যমেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালে মার্কিন সয়াবিন রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি চীনে গিয়েছিল। ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সয়াবিন ক্রয় আকস্মিকভাবে বন্ধ করায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বার্ষিক রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়ে, যা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলোতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল। সয়াবিন চীনা ক্রেতাদের ওপর সবচেয়ে নির্ভরশীল মার্কিন পণ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা তামার স্ক্র্যাপের রপ্তানি ছিল মাত্র ২৮০ কোটি ডলার। তবে, সয়াবিনের জন্য ব্রাজিলের মতো বিকল্প উৎসের প্রাপ্যতা চীনের এই অস্ত্রের কার্যকারিতা সীমিত করে। বিরল খনিজ ও সয়াবিন উভয়ই মার্কিন-চীন অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সামগ্রিক চিত্রের ব্যতিক্রমী উদাহরণ, যেখানে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এসব অস্ত্র স্বল্পমেয়াদে কার্যকর হলেও, একবার প্রয়োগের পর এর শক্তি ক্রমশ হ্রাস পায়। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি এবং ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে চীনের আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, বেইজিংয়ের পক্ষে এই খাতগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা কঠিন হবে। এমন পদক্ষেপ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর হাতে বাজারের সুযোগ তৈরি করবে। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত শত শত ওষুধের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান চীন থেকে এলেও, চীনের অধিকাংশ সক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (API) প্রথমে ইউরোপ ও ভারতে প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ বন্ধ করলে তা বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলবে, এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে কাঁচামাল মজুত করে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে চীনের প্রভাব কমাতে পারে।

চীনের প্রভাবের উপর অধিক মনোযোগ দিতে গিয়ে প্রায়শই বেইজিংয়ের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো উপেক্ষা করা হয়। প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে জটিল ক্ষেত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো তার একক আধিপত্য বজায় রেখেছে। ২০২৫ সালে, বৈশ্বিক উচ্চপ্রযুক্তি খাত থেকে অর্জিত মোট লাভের ৫৮ শতাংশ মার্কিন সংস্থাগুলোর পকেটে যায়, যখন ন্যাটো মিত্র ও পূর্ব এশিয়ার অংশীদাররা আরও ২৬ শতাংশ লাভ অর্জন করে। এর বিপরীতে, হংকংসহ চীনের সমস্ত প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে এই খাতের মাত্র ৮ শতাংশ লাভ করতে সক্ষম হয়। উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের বিক্রিতেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে। চীনের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের সামগ্রিক উৎপাদন খাতের আমদানিকৃত মধ্যবর্তী পণ্যের (intermediate goods) উপর গভীর নির্ভরতা। এক দশক ধরে স্বাবলম্বী হওয়ার জোর চেষ্টা সত্ত্বেও, বেইজিংকে এখনো বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণে মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করতে হয়। চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনে এই উপাদানগুলো অপরিহার্য হওয়ায়, এর সরবরাহ ব্যাহত হলে চীনের সম্পূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল অচল হয়ে পড়তে পারে। একা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চীনের এই কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী পণ্যের সরবরাহ বন্ধ করে বড় আঘাত হানা কঠিন হলেও, এশিয়া ও ইউরোপের মিত্রদের সাথে একত্রিত হয়ে চাপ সৃষ্টি করলে তা অত্যন্ত মারাত্মক রূপ নেবে। কারণ, চীন যে পরিমাণ মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করে, তার সিংহভাগই আসে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো থেকে। চীনের বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্তের উপর নির্ভরতাও তাদের অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলে। চীন প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে। মার্কিন জোট যদি সম্মিলিতভাবে চীন থেকে আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের অর্থনীতির চেয়ে চীনের জন্য অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হবে। এককভাবে লড়াই না করে বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলে চীনকে সহজে কোণঠাসা করা সম্ভব। যদি যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে চীনের সাথে সমস্ত বাণিজ্য বন্ধ করে, তবে চীনের অর্থনৈতিক ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বেশি হবে, যা একটি চূড়ান্ত বিজয় নয়। তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যদি যৌথভাবে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে চীনের অর্থনৈতিক ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির তুলনায় ৫ থেকে ১১ গুণ বেশি হবে।

চীনের উপর অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুবর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্প প্রশাসন মিত্রদের উপর শুল্ক আরোপ এবং তাদের যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগে বাধ্য করে ভুল পথ অনুসরণ করেছিল। ওয়াশিংটন চীনের উপর চাপ সৃষ্টি না করে বন্ধুদের উপর আঘাত হানায় তার নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়েছে, যা চীনকে এককভাবে মোকাবিলায় কঠিন করে তুলেছে। তবে, এখনো সময় আছে; ওয়াশিংটন তার মিত্রদের সাথে সমন্বয় করে চীনের একচেটিয়া নীতিকে প্রতিহত করতে পারে। কিছু পদক্ষেপ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালে বেইজিংয়ের বিরল খনিজ অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামে একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট গঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সংক্রান্ত সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত রাখা এবং বিরল খনিজ, ডেটা অবকাঠামো ও উন্নত উৎপাদনে চীনের প্রভাব হ্রাস করা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইসরায়েল, জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য এটি প্রতিষ্ঠা করে, পরবর্তীতে জার্মানি, ভারত, নেদারল্যান্ডস, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরও অনেক দেশ এতে যোগ দেয়। প্যাক্স সিলিকাকে একটি সূচনা মাত্র হিসেবে দেখা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের সম্মিলিত অর্থনৈতিক শক্তি এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটনের নেতৃত্ব এই অপ্রকাশিত শক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত কি না। (বেন এ ভেগেল, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাইট-হেনেসি স্কলার এবং স্টিফেন জি ব্রুকস, ডার্টমাউথ কলেজের অধ্যাপক; ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে অনূদিত)।