Mon 17th Aug 2026, 5:31 pm

প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সকালের ঘুম: একটি অপরিহার্য দাবি

প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সকালের ঘুম: একটি অপরিহার্য দাবি
ভোরের প্রথম প্রহরে শরীয়তপুরের এক শহরতলির প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর চিত্র মনযোগ আকর্ষণ করে। ফটক খোলার পূর্বেই সেখানে অপেক্ষমাণ ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ভিড় জমে, যা রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও এক সাধারণ দৃশ্য। ঘুম জড়ানো চোখে এবং হাতে চিপসের প্যাকেট নিয়ে এই শিশুরা বিদ্যালয়ের সামনে উপস্থিত হয়, যা তাদের অপর্যাপ্ত বিশ্রামের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে, যেখানে চার বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী শিশুরা ভর্তি হতে পারে। এই স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য দৈনিক দুই ঘণ্টার ক্লাস নির্ধারিত। সকাল নয়টার মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক এবং সাড়ে নয়টা থেকে বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত ক্লাস পরিচালিত হয়। তাদের শিখন কার্যক্রমের মধ্যে সমাবেশ, ব্যায়াম, গল্প বলা, বর্ণ ও সংখ্যা পরিচিতি, চিত্রাঙ্কন এবং খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত।

পাঁচ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী শিশুদের সময়সূচি এবং শিখনচর্চা প্রাক্-প্রাথমিকের মতোই, যা বেলা সাড়ে এগারোটায় শেষ হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্যও একই সময়সূচি প্রযোজ্য। তবে, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস দুপুর বারোটা থেকে শুরু হয়ে বেলা দুটো পর্যন্ত চলে। এই বয়সের শিক্ষার্থীরা সাধারণত পর্যাপ্ত ঘুম শেষ করে এবং কোচিং কার্যক্রম সম্পন্ন করে বিদ্যালয়ে আসতে পারে, যা প্রাক্-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

শিশুসহ সকল বয়সীর জন্য পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম অত্যাবশ্যক। ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মিজ রেবেকা স্পেন্সার শিশুদের ঘুমের ঘাটতি এবং তার সম্ভাব্য প্রতিকার নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণার ফলস্বরূপ জানা গেছে যে, রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে প্রি-স্কুল শিশুদের জন্য দিনের বেলায় সংক্ষিপ্ত ঘুমের (ন্যাপ) ব্যবস্থা করা গেলে তা স্মৃতি সংরক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্বের অনেক দেশেই বিদ্যালয়ে শিশুদের ঘুমের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে এখনই এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে, তবে এ বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা অত্যন্ত জরুরি। এশিয়ার প্রগতিশীল দেশগুলোর মধ্যে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া শিশুদের ঘুমের গুরুত্ব অনুধাবন করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাপানে, নার্সারি, চাইল্ড কেয়ার ও প্রি-স্কুল স্তরে ১ থেকে ৪-৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দুপুরে ১-২ ঘণ্টার ঘুমের সুযোগ রাখা হয়েছে। চীনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও টিফিনের বিরতিতে ন্যাপের ব্যবস্থা বিদ্যমান; বিশেষত প্রাথমিক স্তরে অঞ্চলভেদে ৩০-৯০ মিনিটের ন্যাপের সুবিধা দেওয়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার ডে-কেয়ার, কিন্ডারগার্টেন এবং ছোট শিশুদের কেন্দ্রে ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টার ঘুমের ব্যবস্থা রয়েছে।

রেবেকা স্পেন্সার তাঁর গবেষণায় সপ্রমাণ করেছেন যে, যে সকল শিশু রাতের ঘুমের ঘাটতি পূরণের জন্য দুপুরে বা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমিয়েছিল, তারা শিক্ষালব্ধ বিষয়সমূহ পরবর্তীতে অধিকতর দক্ষতার সাথে স্মরণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও, তাঁর গবেষণা ন্যাপের মাধ্যমে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত প্রদান করে।

তবে এটিও উল্লেখ্য যে, কোনো শিশু রাতে পর্যাপ্ত ঘুম পেলে বয়স অনুযায়ী দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমের প্রয়োজন নাও হতে পারে। বিপরীতক্রমে, নবজাতক, ইনফ্যান্ট ও টডলারদের জন্য দিনের বেলায়, বিশেষত সকালে বা দুপুরে, নিয়মিত ঘুম (ন্যাপ) স্বাভাবিক ও উপকারী হিসেবে বিবেচিত।

গবেষকদের মতে, শিশুদের জন্য সকালের ঘুম, যা ভোরের পরবর্তী সময়ের বিশ্রাম বা পর্যাপ্ত সকালের ঘুম নামেও পরিচিত, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ছোট শিশুদের জন্য। কমপক্ষে ৮৬৪টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করে গবেষকবৃন্দ শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুমের নিম্নলিখিত উপকারিতাগুলো তুলে ধরেছেন:

১. মস্তিষ্কের বিকাশ ত্বরান্বিত করে: ঘুমের সময় শিশুর মস্তিষ্ক নতুন তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে এবং তার শেখার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
২. শারীরিক বৃদ্ধি ও গঠনে সহায়তা: গভীর ঘুমের পর্যায়ে গ্রোথ হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যা শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, হাড় ও মাংসপেশির সুষম বিকাশে অপরিহার্য।
৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে: পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করে এবং বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে।
৪. মেজাজ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শিশুদের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ, অমনোযোগিতা বা অতিরিক্ত চঞ্চলতা দেখা দিতে পারে, যা সুষম ঘুম দ্বারা হ্রাস করা সম্ভব।
৫. স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বৃদ্ধি: মানসম্মত ঘুম শেখা বিষয়াবলী মনে রাখতে এবং দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

বয়স অনুযায়ী শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় দৈনিক ঘুমের সময়কাল নিম্নরূপ (দিনের ঘুমসহ):
* ৪-১২ মাস: ১২-১৬ ঘণ্টা
* ১-২ বছর: ১১-১৪ ঘণ্টা
* ৩-৫ বছর: ১০-১৩ ঘণ্টা
* ৬-১২ বছর: ৯-১২ ঘণ্টা
* ১৩-১৮ বছর: ৮-১০ ঘণ্টা

উপরিউক্ত তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের জন্য সকালের ঘুম উপকারী প্রমাণিত হতে পারে। তবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, বয়স অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় মোট পর্যাপ্ত ও গুণগত ঘুম নিশ্চিত করা।

শিশুদের ঘুম, বিশেষত দিনের ঘুম (ন্যাপ) এবং দিনের প্রথম ভাগের বিশ্রামের উপকারিতা নিয়ে অসংখ্য উচ্চমানের গবেষণা পরিচালিত হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে, একটি বিষয় স্পষ্ট করা আবশ্যক যে, এই গবেষণাগুলো সাধারণত 'সকালের ঘুম'কে একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে না, বরং ২৪ ঘণ্টার মোট ঘুম (রাতের ও দিনের ঘুম) এবং বয়স-ভিত্তিক ন্যাপের ওপরই অধিক মনোযোগ নিবদ্ধ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৯ সালে প্রকাশিত তাদের নির্দেশিকায় উল্লেখ করেছে যে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুম, শারীরিক কার্যকলাপ এবং স্ক্রিন-টাইম—এই তিনটি বিষয়কে সম্মিলিতভাবে বিবেচনা করা উচিত। পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের সুষ্ঠু বিকাশ এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রচলিত দুই শিফটের 'আগে ছোট শিশু, পরে বড় শিশু' এই প্রথা পরিবর্তন করে 'আগে বড় শিশু (৮ থেকে ১০ বছর), পরে ছোট শিশু (৪ থেকে ৭ বছর)' নীতি গ্রহণ করা হলে ছোট শিশুরা সকালে অতিরিক্ত ঘুমের সুযোগ পাবে।

যদিও এই পরিবর্তনে বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সামান্য অসুবিধা হতে পারে এবং তাদের সকালের কোচিং-বাণিজ্যের সুযোগ হ্রাস পেতে পারে, তবুও শিশুদের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও বিকাশের স্বার্থে এটি একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।

অনেক দেশেই শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে ঘুমের ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক এটি চালু করা সম্ভব নাও হতে পারে, তবুও বিষয়টি নিয়ে গভীর আলোচনা ও নীতি নির্ধারণী বিবেচনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।