একটি মাত্র পাঁচ মাসের সংক্ষিপ্ত দাম্পত্য জীবন, যা এমনই এক ভয়াবহ মোড়ে পৌঁছেছিল যে মৃত্যুর ঠিক কয়েক মিনিট আগে তৃষা শর্মা তাঁর ভাবিকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছিলেন, ‘ওকে বলো, স্ত্রীর যা অবশিষ্ট আছে, কাল এসে নিয়ে যাক। এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’
মধ্যপ্রদেশের ভোপালে ১২ মে রাতের ওই মর্মান্তিক বার্তাটি বর্তমানে ভারতে বহুল আলোচিত তৃষা শর্মা মৃত্যু মামলার অন্যতম প্রধান প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত ১৪ আগস্ট কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) আদালতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে যে, স্বামী সমর্থ সিং এবং শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের লাগাতার মানসিক নিপীড়নই তৃষাকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এই অভিযোগপত্রে শুধু মৃত্যুর রাতের ঘটনাই নয়, বিয়ের পর কয়েক মাস ধরে কীভাবে এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছিল, তারও বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপের বার্তা, ফোনকলের রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ, পারিবারিক জবানবন্দি এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ—সবকিছু মিলিয়ে এক হৃদয়বিদারক চিত্র উঠে এসেছে।
একসময় তৃষা শর্মা ‘মিস পুনে’ খেতাব অর্জন করেছিলেন এবং অভিনয় জগতেও তাঁর পদচারণা ছিল। পরবর্তীতে তিনি করপোরেট পেশায় নিযুক্ত হন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অনলাইন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং একই বছরের ৯ ডিসেম্বর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
সিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই সমর্থ তৃষাকে তাঁর অতীত সম্পর্ক নিয়ে অপমান করতেন, অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতেন এবং তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। অভিযোগ রয়েছে, তৃষা এসব বিষয়ে শাশুড়ির কাছে নালিশ করলে তিনি ছেলের পক্ষই অবলম্বন করতেন।
দাম্পত্য সম্পর্কের এই টানাপোড়েন আরও তীব্র হয় ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে। সে সময় তৃষার বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বাবার পাশে থাকার জন্য তিনি পিত্রালয়ে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, সমর্থ ও গিরিবালা তাঁকে দ্রুত ভোপালে ফিরে আসার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
এর মধ্যেই তৃষা জানতে পারেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এই গর্ভধারণ ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। স্বামীর অস্বাভাবিক আচরণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ায় তিনি গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তাঁদের দাম্পত্যে নতুন করে তীব্র বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।
সিবিআইয়ের দাবি অনুযায়ী, সমর্থ বারবার তৃষাকে অপমান করতেন। অন্যদিকে গিরিবালা গর্ভপাতের সিদ্ধান্তের জন্য তৃষাকে একাধিকবার ‘খুনি’ বলেও আখ্যায়িত করেন। অভিযোগপত্রে আর্থিক চাপের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন যে, তৃষার প্রায় ২০ লাখ রুপির শেয়ার বিনিয়োগ ছিল। সমর্থ ও তাঁর মা নাকি সেই অর্থ তাঁদের যৌথ ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছিলেন। তৃষা তা অস্বীকার করে জানান যে, এই অর্থ তাঁর বাবার।
এদিকে, তৃষার মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। ৩০ এপ্রিল মাকে পাঠানো এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তৃষা লেখেন, ‘আমার জীবন নরকে পরিণত হয়েছে।’
তৃষা শর্মা একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞেরও শরণাপন্ন হয়েছিলেন। চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, তৃষা তীব্র উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। তাঁকে উদ্বেগ প্রশমনের জন্য ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।
৬ মে তৃষা শর্মা তাঁর পূর্বের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। একই দিনে তিনি গর্ভপাতের প্রথম ওষুধ সেবন করেন। পরদিন ভোরে মাকে বারবার বার্তা পাঠিয়ে তিনি অনুরোধ করেন, তাঁকে যেন অবিলম্বে ওই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
৭ মে আরেক চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করলে তৃষা জানান যে, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা গর্ভপাতের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট ছিলেন। অভিযোগপত্র অনুসারে, সে সময় তৃষা প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন।
৮ মে দ্বিতীয় ওষুধ সেবনের পর তৃষা শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর প্রচণ্ড ব্যথা এবং রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সমর্থ এটিকে ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দেন এবং তাঁর শাশুড়িও তৃষাকে উপেক্ষা করেন।
৯ মে মাকে পাঠানো এক বার্তায় তৃষা অভিযোগ করেন যে, সমর্থ এমন প্রশ্নও তুলেছিলেন যে গর্ভপাত হওয়া সন্তানটি আদৌ তাঁর ছিল কিনা। তিনি লেখেন, ‘এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছেন যে, তৃষার পূর্বের নিয়োগকর্তা বলেছেন, বাড়িতে তৃষার ওপর সবসময় নজরদারি চালানো হতো। তাঁর ফোনালাপও পর্যবেক্ষণ করা হতো। ফলে, কখনো কখনো কাছের কোনো পার্কে গিয়ে তিনি কথা বলতেন।
মৃত্যুর দিন, অর্থাৎ ১২ মে সকালেই তৃষা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মায়ের কাছে তিন হাজার রুপি চান, যাতে রাজস্থানের নাসিরাবাদের ট্রেনের টিকিট কাটতে পারেন। তাঁর বাবা সেই অর্থ পাঠিয়ে দেন এবং তিনি টিকিটও কেটে ফেলেন।
এরপর সমর্থ দাম্পত্য কাউন্সেলিংয়ে যেতে রাজি হন। তাঁরা দুজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কাকলি রায়ের সঙ্গে দেখা করেন। অভিযোগপত্রে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সমর্থকে ধৈর্য ধরে স্ত্রীর কথা শোনার পরামর্শ দেন এবং দুজনকেই মাদক সেবন থেকে বিরত থাকতে বলেন।
সেদিন বিকেলে তৃষা একটি বিউটি পার্লারে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন, সমর্থ ও গিরিবালা বাইরে হাঁটছেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতে চাইলে তাঁরা তৃষাকে উপেক্ষা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এরপর মাকে ফোন করে তৃষা জানান যে, এই সম্পর্ক আর বাঁচানো সম্ভব নয়। তিনি চিরতরে ভোপাল ছেড়ে চলে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে ভাবি রাশি আবরোলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তৃষা কান্নায় ভেঙে পড়েন। অভিযোগ অনুসারে, তিনি জানান যে পিঠে ব্যথা থাকার কারণে স্বামীকে ঘরে ঘুমাতে বলেছিলেন। কিন্তু সমর্থ নাকি উল্টো আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে সেই শেষ বার্তাটি আসে, ‘এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ৯টা ৪০ মিনিটে তৃষা একাই ছাদে ওঠেন। এক মিনিট পর বাবাকে ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, সমর্থ খুব আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন, তিনি ভীষণ ভয় পাচ্ছেন এবং বাবা-মাকে দ্রুত সেখানে আসতে বলেন।
রাত ১০টা ৫ মিনিটে তৃষা মায়ের সঙ্গেও কথা বলেন। এরপর মা বারবার ফোন করলেও আর কোনো যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তিনি শাশুড়িকে ফোন করে জানান যে তাঁর মেয়ে কাঁদছে এবং তাকে খোঁজ নিতে অনুরোধ করেন।
সিসিটিভিতে দেখা যায়, রাত ১০টা ২৩ মিনিটে গিরিবালা এবং কিছুক্ষণ পর সমর্থ ছাদের দিকে যান। এরপর তৃষাকে নিচে নামিয়ে ভোপালের এইমসে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই মামলায় শুরু থেকেই নানা বিতর্ক বিদ্যমান ছিল। পরিবারের অভিযোগের পর আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। দিল্লি এইমসের বিশেষজ্ঞ বোর্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তৃষার মৃত্যু ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার ফলেই ঘটেছে। তাঁর শরীরে হামলার কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, সিবিআইয়ের অভিযোগ হত্যা সংক্রান্ত নয়; বরং দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণই তৃষাকে আত্মহননে বাধ্য করেছে। ফরেনসিক মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে যে, তৃষা দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক নির্যাতন, হতাশা এবং একাকিত্বের শিকার ছিলেন। পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থনের অভাবই তাঁকে এই চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে সিবিআই সমর্থ সিং ও গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে। তবে তদন্ত প্রক্রিয়া এখানেই শেষ নয়। তৃষার আইফোনের ফরেনসিক তথ্য এখনও বিশ্লেষণাধীন রয়েছে। বাড়ির সিসিটিভি রেকর্ডারের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সেটিও পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। একই সাথে, পণ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টিও সিবিআই পৃথকভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রদেশের ভোপালে ১২ মে রাতের ওই মর্মান্তিক বার্তাটি বর্তমানে ভারতে বহুল আলোচিত তৃষা শর্মা মৃত্যু মামলার অন্যতম প্রধান প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত ১৪ আগস্ট কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) আদালতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে যে, স্বামী সমর্থ সিং এবং শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের লাগাতার মানসিক নিপীড়নই তৃষাকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এই অভিযোগপত্রে শুধু মৃত্যুর রাতের ঘটনাই নয়, বিয়ের পর কয়েক মাস ধরে কীভাবে এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছিল, তারও বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপের বার্তা, ফোনকলের রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ, পারিবারিক জবানবন্দি এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ—সবকিছু মিলিয়ে এক হৃদয়বিদারক চিত্র উঠে এসেছে।
একসময় তৃষা শর্মা ‘মিস পুনে’ খেতাব অর্জন করেছিলেন এবং অভিনয় জগতেও তাঁর পদচারণা ছিল। পরবর্তীতে তিনি করপোরেট পেশায় নিযুক্ত হন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অনলাইন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং একই বছরের ৯ ডিসেম্বর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
সিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই সমর্থ তৃষাকে তাঁর অতীত সম্পর্ক নিয়ে অপমান করতেন, অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতেন এবং তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। অভিযোগ রয়েছে, তৃষা এসব বিষয়ে শাশুড়ির কাছে নালিশ করলে তিনি ছেলের পক্ষই অবলম্বন করতেন।
দাম্পত্য সম্পর্কের এই টানাপোড়েন আরও তীব্র হয় ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে। সে সময় তৃষার বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বাবার পাশে থাকার জন্য তিনি পিত্রালয়ে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, সমর্থ ও গিরিবালা তাঁকে দ্রুত ভোপালে ফিরে আসার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
এর মধ্যেই তৃষা জানতে পারেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এই গর্ভধারণ ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। স্বামীর অস্বাভাবিক আচরণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ায় তিনি গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তাঁদের দাম্পত্যে নতুন করে তীব্র বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।
সিবিআইয়ের দাবি অনুযায়ী, সমর্থ বারবার তৃষাকে অপমান করতেন। অন্যদিকে গিরিবালা গর্ভপাতের সিদ্ধান্তের জন্য তৃষাকে একাধিকবার ‘খুনি’ বলেও আখ্যায়িত করেন। অভিযোগপত্রে আর্থিক চাপের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন যে, তৃষার প্রায় ২০ লাখ রুপির শেয়ার বিনিয়োগ ছিল। সমর্থ ও তাঁর মা নাকি সেই অর্থ তাঁদের যৌথ ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছিলেন। তৃষা তা অস্বীকার করে জানান যে, এই অর্থ তাঁর বাবার।
এদিকে, তৃষার মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। ৩০ এপ্রিল মাকে পাঠানো এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তৃষা লেখেন, ‘আমার জীবন নরকে পরিণত হয়েছে।’
তৃষা শর্মা একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞেরও শরণাপন্ন হয়েছিলেন। চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, তৃষা তীব্র উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। তাঁকে উদ্বেগ প্রশমনের জন্য ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।
৬ মে তৃষা শর্মা তাঁর পূর্বের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। একই দিনে তিনি গর্ভপাতের প্রথম ওষুধ সেবন করেন। পরদিন ভোরে মাকে বারবার বার্তা পাঠিয়ে তিনি অনুরোধ করেন, তাঁকে যেন অবিলম্বে ওই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
৭ মে আরেক চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করলে তৃষা জানান যে, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা গর্ভপাতের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট ছিলেন। অভিযোগপত্র অনুসারে, সে সময় তৃষা প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন।
৮ মে দ্বিতীয় ওষুধ সেবনের পর তৃষা শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর প্রচণ্ড ব্যথা এবং রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সমর্থ এটিকে ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দেন এবং তাঁর শাশুড়িও তৃষাকে উপেক্ষা করেন।
৯ মে মাকে পাঠানো এক বার্তায় তৃষা অভিযোগ করেন যে, সমর্থ এমন প্রশ্নও তুলেছিলেন যে গর্ভপাত হওয়া সন্তানটি আদৌ তাঁর ছিল কিনা। তিনি লেখেন, ‘এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছেন যে, তৃষার পূর্বের নিয়োগকর্তা বলেছেন, বাড়িতে তৃষার ওপর সবসময় নজরদারি চালানো হতো। তাঁর ফোনালাপও পর্যবেক্ষণ করা হতো। ফলে, কখনো কখনো কাছের কোনো পার্কে গিয়ে তিনি কথা বলতেন।
মৃত্যুর দিন, অর্থাৎ ১২ মে সকালেই তৃষা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মায়ের কাছে তিন হাজার রুপি চান, যাতে রাজস্থানের নাসিরাবাদের ট্রেনের টিকিট কাটতে পারেন। তাঁর বাবা সেই অর্থ পাঠিয়ে দেন এবং তিনি টিকিটও কেটে ফেলেন।
এরপর সমর্থ দাম্পত্য কাউন্সেলিংয়ে যেতে রাজি হন। তাঁরা দুজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কাকলি রায়ের সঙ্গে দেখা করেন। অভিযোগপত্রে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সমর্থকে ধৈর্য ধরে স্ত্রীর কথা শোনার পরামর্শ দেন এবং দুজনকেই মাদক সেবন থেকে বিরত থাকতে বলেন।
সেদিন বিকেলে তৃষা একটি বিউটি পার্লারে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন, সমর্থ ও গিরিবালা বাইরে হাঁটছেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতে চাইলে তাঁরা তৃষাকে উপেক্ষা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এরপর মাকে ফোন করে তৃষা জানান যে, এই সম্পর্ক আর বাঁচানো সম্ভব নয়। তিনি চিরতরে ভোপাল ছেড়ে চলে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে ভাবি রাশি আবরোলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তৃষা কান্নায় ভেঙে পড়েন। অভিযোগ অনুসারে, তিনি জানান যে পিঠে ব্যথা থাকার কারণে স্বামীকে ঘরে ঘুমাতে বলেছিলেন। কিন্তু সমর্থ নাকি উল্টো আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে সেই শেষ বার্তাটি আসে, ‘এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ৯টা ৪০ মিনিটে তৃষা একাই ছাদে ওঠেন। এক মিনিট পর বাবাকে ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, সমর্থ খুব আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন, তিনি ভীষণ ভয় পাচ্ছেন এবং বাবা-মাকে দ্রুত সেখানে আসতে বলেন।
রাত ১০টা ৫ মিনিটে তৃষা মায়ের সঙ্গেও কথা বলেন। এরপর মা বারবার ফোন করলেও আর কোনো যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তিনি শাশুড়িকে ফোন করে জানান যে তাঁর মেয়ে কাঁদছে এবং তাকে খোঁজ নিতে অনুরোধ করেন।
সিসিটিভিতে দেখা যায়, রাত ১০টা ২৩ মিনিটে গিরিবালা এবং কিছুক্ষণ পর সমর্থ ছাদের দিকে যান। এরপর তৃষাকে নিচে নামিয়ে ভোপালের এইমসে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই মামলায় শুরু থেকেই নানা বিতর্ক বিদ্যমান ছিল। পরিবারের অভিযোগের পর আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। দিল্লি এইমসের বিশেষজ্ঞ বোর্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তৃষার মৃত্যু ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার ফলেই ঘটেছে। তাঁর শরীরে হামলার কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, সিবিআইয়ের অভিযোগ হত্যা সংক্রান্ত নয়; বরং দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণই তৃষাকে আত্মহননে বাধ্য করেছে। ফরেনসিক মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে যে, তৃষা দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক নির্যাতন, হতাশা এবং একাকিত্বের শিকার ছিলেন। পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থনের অভাবই তাঁকে এই চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে সিবিআই সমর্থ সিং ও গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে। তবে তদন্ত প্রক্রিয়া এখানেই শেষ নয়। তৃষার আইফোনের ফরেনসিক তথ্য এখনও বিশ্লেষণাধীন রয়েছে। বাড়ির সিসিটিভি রেকর্ডারের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সেটিও পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। একই সাথে, পণ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টিও সিবিআই পৃথকভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।