Tue 25th Aug 2026, 4:24 am

ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ: ২১ আন্তর্জাতিক অধিনায়কের সম্মিলিত চিঠি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে

ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ: ২১ আন্তর্জাতিক অধিনায়কের সম্মিলিত চিঠি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে
২৫শে মার্চ, ১৯৯২। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শিরোপা হাতে দাঁড়িয়েছিলেন এক অদম্য নেতা। ৪৪ বছর বয়সেও তাঁর কোমরে হাত এবং চোখে সেই পরিচিত জেদ ছিল স্পষ্ট। বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রাক্কালে তিনি তাঁর দলকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, 'কোণঠাসা বাঘের মতো লড়ো।' সেই দিন পাকিস্তান এক বাঘের মতোই লড়াই করেছিল এবং ইমরান খান হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র জাতির এক অবিসংবাদিত নায়ক।

তেত্রিশ বছর পর, সেই কিংবদন্তি আজ সত্যিই কোণঠাসা অবস্থায়। রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে এক নির্জন কুঠুরিতে তিনি বন্দি। একসময়ের এই নায়ক এখন কারাবন্দী। তাঁর স্বাস্থ্য, দৃষ্টিশক্তি এবং তাঁর নীরবতা বর্তমানে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

তাঁর এই কঠিন সময়ে, ক্রিকেট মাঠের সেই পুরনো প্রতিপক্ষরাই আবার তাঁর সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন, যাঁদের সাথে তিনি ২২ গজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং কখনো কখনো সতীর্থ হিসেবে খেলেছেন।

বিশ্ব ক্রিকেটের সাবেক অধিনায়কদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্বাস্থ্য ও কারাবাস নিয়ে পুনরায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক যৌথভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে একটি চিঠি প্রেরণ করেছেন। এই চিঠির মূল প্রেক্ষাপট হলো ইমরান খানকে নিয়ে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশাবলীর বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের অসন্তোষ।

চিঠিতে তাঁরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আদালত নির্দেশ দিয়েছিল ইমরান খানকে একটি নির্দিষ্ট মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য। এই বোর্ডে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং তাঁর বোন ডা. উজমা খানেরও অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা ছিল। এছাড়াও, পরিবারকে প্রতি সপ্তাহে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

তবে, সাবেক অধিনায়কদের অভিযোগ, বাস্তবে আদালতের সেই নির্দেশের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ইমরান খানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে তাঁকে কেবল কয়েক ঘণ্টা রাখা হয়েছিল। তাঁকে পরীক্ষা করেছে রাষ্ট্র-নিযুক্ত একটি দল, যা আদালতের নির্দেশিত বোর্ড ছিল না। দ্রুত তাঁকে 'মেডিক্যালি ফিট' ঘোষণা করে আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে, প্রেরিত চিঠিতে তাঁরা তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছেন।

প্রথমত, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল বোর্ডকে ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা স্বাধীনভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে হবে। বিশেষত, তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয়ত, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাপ্তাহিক পারিবারিক সাক্ষাৎ যেন কোনো প্রকার প্রশাসনিক জটিলতা বা বিলম্ব ছাড়াই সুনিশ্চিত করা হয়।

তৃতীয়ত, মেডিকেল বোর্ড যেসকল চিকিৎসা সংক্রান্ত সুপারিশ প্রদান করবে, তা যেন অবিলম্বে কার্যকর করা হয়।

গত ছয় মাসের মধ্যে এটি সাবেক অধিনায়কদের পক্ষ থেকে পাঠানো দ্বিতীয় চিঠি। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে, ১৪ জন সাবেক অধিনায়ক একই বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানে সেই তালিকায় আরও সাত জন অধিনায়ক যুক্ত হয়েছেন। পূর্বে ইমরানের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, চোখের সমস্যার কারণে তিনি প্রায় এক চোখে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং সেসময় কারাগারে চিকিৎসাগত অবহেলার অভিযোগও উঠেছিল।

চিঠির স্বাক্ষরকারীরা নিজেদের পরিচয় ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁরা লিখেছেন, ‘আমরা রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, বরং ক্রিকেট মাঠে গড়ে ওঠা পারস্পরিক সম্পর্ক, সাবেক সতীর্থ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এই আবেদন জানাচ্ছি।’ একই সঙ্গে তাঁরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়।

এই চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের তালিকাও অত্যন্ত প্রভাবশালী। মাইকেল আথারটন, অ্যালান বোর্ডার, মাইক ব্রিয়ারলি, গ্রেগ চ্যাপেল, ইয়ান চ্যাপেল, অ্যালিস্টার কুক, মাইক গ্যাটিং, সুনীল গাভাস্কার, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ডেভিড গাওয়ার, নাসেন হুসেইন, ক্লাইভ লয়েড, কপিল দেব, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস, দিলীপ ভেংসরকার, স্টিভ ওয়াহ এবং জন রাইটের মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা এই আবেদনে সই করেছেন। এছাড়া, নারী ক্রিকেটের উল্লেখযোগ্য নাম বেলিন্ডা ক্লার্ক এবং অ্যালেক্স ব্ল্যাকওয়েলও তাঁদের সমর্থন জানিয়েছেন।

ইমরান খান ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় রায় প্রদান করা হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে ১০, ১৪ এবং ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে আরেকটি মামলায় তাঁর সাত বছরের কারাদণ্ড হয়।

এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ইমরান খানের বিচার প্রক্রিয়া এবং তাঁর কারাবন্দী অবস্থার ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইমরানের পুত্ররা দাবি করেছেন যে, তাঁকে 'ডেথ সেল'-এ রাখা হয়েছে, যেখানে তিনি মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। যদিও পাকিস্তান সরকার ধারাবাহিকভাবে এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছে।