Wed 16th Sep 2026, 11:15 am

দেশে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি, শিল্প খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং লোডশেডিংয়ে স্বস্তি

দেশে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি, শিল্প খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং লোডশেডিংয়ে স্বস্তি
দেড় মাসেরও অধিক সময় পর দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত সোমবার রাত থেকে এই সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, যা মঙ্গলবার আরও কিছুটা প্রসারিত হয়েছে।

পেট্রোবাংলার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, বর্ধিত গ্যাস সরবরাহের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প গ্রাহকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত গ্যাসের সিংহভাগই বর্তমানে শিল্প খাতে প্রবাহিত হচ্ছে।

পেট্রোবাংলা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি তদারকি করে, যা মূলত এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) দ্বারা পরিচালিত হয়। এলএনজি সরবরাহ সংশ্লিষ্ট দুই জন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা Desi Media Point-কে জানিয়েছেন যে, পূর্বে ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে সময়মতো এলএনজি কার্গো পৌঁছাতে না পারায় সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। বর্তমানে কার্গোগুলি নিয়মিতভাবে আসছে।

পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে ১০টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা থাকলেও একাধিকবার দরপত্র আহ্বানের পরও সবগুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, কারণ বিশ্ববাজারে দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে এ মাসে ৯টি কার্গো নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে গানভরের দুটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির অধীনে আরামকোর দুটি এবং উন্মুক্ত বাজার থেকে পাঁচটি কার্গো কেনা হয়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও, বর্তমানে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে, এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়ে থাকে। গত সোমবার রাত ১০টায় এলএনজি সরবরাহ ছিল ৯৮ কোটি ঘনফুট, যা গতকাল রাত আটটায় বেড়ে ১০১ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। এতে মোট গ্যাস সরবরাহ ২৬৩ ঘনফুটে পৌঁছেছে, যার মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে এসেছে ১৬২ কোটি ঘনফুট।

গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় দৈনিক ২৬৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, যার মধ্যে ৯৯ কোটি ঘনফুট আসতো এলএনজি থেকে। বর্তমানে এলএনজি থেকে প্রায় একই পরিমাণ সরবরাহ পাওয়া গেলেও, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন ৪ কোটি ঘনফুট কমেছে।

আরপিজিসিএল সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে আরামকোর দুটি, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ও পস্কোর একটি করে এলএনজি কার্গো ইতোমধ্যে সরবরাহ সম্পন্ন করেছে। এছাড়া, আজ ১৬ সেপ্টেম্বর গানভর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এনার্জি, ২৫ সেপ্টেম্বর আরামকো এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গানভরের একটি করে কার্গো আসার কথা রয়েছে, যা এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধির আরও সুযোগ তৈরি করবে। এরই মধ্যে অক্টোবরের জন্য ১১টি এলএনজি কার্গো কেনার প্রক্রিয়া চলমান। আটটি কার্গো ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে এবং অবশিষ্ট তিনটি ক্রয়ের জন্য গতকাল দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কায়েমপুর এলাকার ফকির নিটওয়্যার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ ইমতিয়াজ রাজীব মন্তব্য করেছেন, “১০ পিএসআই চাপ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ৪ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে, যা পূর্বের তুলনায় কিছুটা বেশি।” একইভাবে, নারায়ণগঞ্জ ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন Desi Media Point-কে জানিয়েছেন, “কারখানা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ গতকাল পর্যন্তও পর্যাপ্ত ছিল না।”

লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রেও কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে। গত সোমবার দিবাগত রাতে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হলেও, গতকাল দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি ছিল। যা গত মাসে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের অধিক লোডশেডিংয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস নির্দেশ করে।

যদিও গ্যাস সংকটের কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা ছিল, কয়লার স্বল্পতা ও কারিগরি ত্রুটির কারণে তা সম্ভব হয়নি, যার ফলস্বরূপ গত এক মাস ধরে দেশব্যাপী লোডশেডিং চলছে। এটি নিরসনে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও, ফার্নেস তেলের পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তা বৃদ্ধি করা যায়নি। তবে, ২০ সেপ্টেম্বরের পর তেল থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

গত বুধবার মধ্যরাতে কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পায় এবং লোডশেডিং বেড়ে যায়। তবে, গত রবিবার দুপুর ১২টা থেকে আদানির দ্বিতীয় ইউনিট পুনরায় চালু হওয়ায় পিক আওয়ারে কেন্দ্রটি থেকে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পূর্বে গত রবিবার সকাল সাড়ে ১১টায় বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। একটি ইউনিট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও গতকাল কেন্দ্রটি থেকে ৬১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও প্রায় দুই দিন সময় লাগতে পারে।

পটুয়াখালীতে চীন ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার প্রতিটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতাসম্পন্ন। এর মধ্যে, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় বর্তমানে ৫৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যদিও এখানে পর্যাপ্ত কয়লার মজুত রয়েছে। একই জেলার অন্য একটি কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ বৃদ্ধির পর গতকাল ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারছে না, যা গত এক মাস ধরে চলমান। যদিও জ্বালানি তেল থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে, সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়ে গেছে। পূর্বে উল্লেখিত লোডশেডিংয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাসে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের অধিক লোডশেডিংয়ের তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে।