Tue 29th Sep 2026, 1:15 pm

সরকারি চাকরির শেষ সিঁড়িতে ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’: স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

সরকারি চাকরির শেষ সিঁড়িতে ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’: স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
বহু বছরের অধ্যবসায়, কঠোর পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকারের ধাপ পেরিয়ে সরকারি চাকরির কাঙ্ক্ষিত নিয়োগপত্রের দোরগোড়ায় পৌঁছেও প্রার্থীরা স্বস্তির বদলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। সরকারি চাকরির দীর্ঘ এবং প্রতিযোগিতামূলক পথ পাড়ি দেওয়ার পর একেবারে শেষ ধাপে এসে অনেকের সামনে তৈরি হচ্ছে আরেকটি অদৃশ্য পরীক্ষা – পুলিশ ভেরিফিকেশন। এই প্রক্রিয়ায় অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, ঠিকানার সঠিকতা, ও নথিপত্রের তথ্যের মিল যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর নিজের কিংবা তার পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলস্বরূপ, মেধা ও যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও অনেকের ভাগ্য আটকে যাচ্ছে এমন এক যাচাই প্রক্রিয়ায়, যার পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ড অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। এছাড়া, পুলিশ ভেরিফিকেশনের ভয় দেখিয়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও প্রায়শই শোনা যায়। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগকে ঘিরে এই পুরোনো প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এসেছে।

**প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ভেরিফিকেশন বিতর্ক**

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়েছিল গত ৮ ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে নতুন করে শিক্ষকদের বাদ পড়ার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন জেলার প্রার্থীরা দাবি করেন, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও তাদের নাম নিয়োগপত্রে অনুপস্থিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় ১,২০০ জনের নিয়োগপত্র ইস্যু না হওয়ার দাবি করা হলেও, সরকারিভাবে এখনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি।

প্রাথমিকের সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী রাহুল দাস সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের কাছে অভিযোগ করেন, তিনি বা তার পরিবারের কেউ কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও তাকে কেন বাদ দেওয়া হলো, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি আরও জানান যে পুলিশ তার কাছে টাকা চেয়েছিল, এবং ১০০০ টাকা দিয়ে তিনি রিকোয়েস্ট করে ফিরে এসেছিলেন। শামিম আহমেদ লিটন নামের আরেকজন ফেসবুকে লেখেন যে, পারিবারিক রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে তাকে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান যে, ১ অক্টোবরের মধ্যে যারা নিয়োগপত্র পাননি, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পর্যায়ক্রমে তাদের নিয়োগপত্র পাঠানো হবে। তিনি পুলিশ ভেরিফিকেশনকে সরকারি নিয়োগের একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন। এতে কেবল কতজন শিক্ষক বাদ পড়েছেন তা নয়, বরং কোন মানদণ্ডে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থীর বক্তব্য জানানোর সুযোগ আছে কিনা – এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

**ভেরিফিকেশনে রাজনৈতিক পরিচয় কেন?**

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রার্থীর পটভূমি যাচাইয়ের দীর্ঘদিনের চর্চা রয়েছে। এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয় যখন প্রার্থী নিজে রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত না থাকলেও তার বাবা, চাচা, ভাই বা অন্য কোনো আত্মীয়ের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্ন উঠেছে যে, কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক পরিবারের সন্তান হওয়া কি একজন মানুষের অপরাধ, নাকি নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল প্রার্থীর নিজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, যোগ্যতা ও চাকরির দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাই বিবেচ্য হওয়া উচিত। এই প্রশ্নগুলোই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

**কোথা থেকে এলো পুলিশ ভেরিফিকেশন?**

পুলিশ ভেরিফিকেশনের শিকড় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। ঔপনিবেশিক শাসনামলে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ শুধু মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হতো। ফলে প্রার্থীর পরিচয়, সামাজিক অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের একটি চর্চা গড়ে ওঠে। তবে, সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার ও সরকারি চাকরিতে সমতার ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। তাই ঔপনিবেশিক আমলের রাজনৈতিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক এই যাচাই ব্যবস্থার কোন অংশ আধুনিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন এবং কোন অংশ সংস্কার করা উচিত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান সময়ে মূল প্রশ্ন হলো, এই যাচাই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রার্থীর অধিকারসম্মতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

**অন্যান্য দেশে ভেরিফিকেশন কীভাবে হয়?**

বিশ্বের অনেক দেশে চাকরির আগে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক প্রচলিত থাকলেও এর ধরন ও উদ্দেশ্য ভিন্ন। যুক্তরাজ্যে ডিসক্লোজার অ্যান্ড ব্যারিং সার্ভিস (ডি-বি-এস) এবং জার্মানিতে সার্টিফিকেট অব কন্ডাক্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে মূলত প্রার্থীর অপরাধসংক্রান্ত রেকর্ড, পরিচয় ও নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের উপযোগিতা যাচাই করা হয়। এসব দেশে কোন পদে কী ধরনের তথ্য যাচাই করা যাবে, তা আইন ও নির্ধারিত নীতিমালার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ, ব্যাকগ্রাউন্ড চেকের প্রধান লক্ষ্য সাধারণত ব্যক্তির নিজস্ব অপরাধের ইতিহাস, পেশাগত ঝুঁকি ও আইনি যোগ্যতা যাচাই করা; পারিবারিক বা রাজনৈতিক পরিচয় সাধারণ অপরাধ রেকর্ড যাচাইয়ের অংশ নয়।

**বিতর্কের মাঝেও অপরিহার্যতা ও প্রশ্নমালা**

পুলিশ ভেরিফিকেশন পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রশ্নে নিরাপত্তার যুক্তিও রয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা গুরুতর অপরাধে জড়িত কি না, জাল পরিচয়ে চাকরি নিচ্ছেন কি না, বা তার দেওয়া তথ্য সত্য কি না – এসব যাচাই রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যার মূল জায়গাটি ভেরিফিকেশন থাকবে কি না তা নয়, বরং ‘কী যাচাই হবে’, ‘কে যাচাই করবে’, ‘কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে’ এবং ‘ভুল হলে প্রার্থী কীভাবে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন’ – এই চারটি প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

এসব বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে জানান, পুলিশ ভেরিফিকেশন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং অতীতেও এটি ছিল। এবারের ব্যতিক্রম হলো অনেক শিক্ষকের নিয়োগপত্র না পাওয়া, তবে তিনি বিশ্বাস করেন যে এই বিষয়টি সমাধান হয়েছে এবং শিক্ষকরা পর্যায়ক্রমে তাদের নিয়োগপত্র পাচ্ছেন। তবে, এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।