Mon 12th Oct 2026, 4:15 am

বিতর্কের পর্যায় পেরিয়ে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার মালিকানার শিখরে র‍্যাপার কার্ডি বি

বিতর্কের পর্যায় পেরিয়ে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার মালিকানার শিখরে র‍্যাপার কার্ডি বি
নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসের বাসিন্দা এক তরুণী জীবিকার অন্বেষণে প্রথমে সুপারমার্কেটে, পরবর্তীতে স্ট্রিপ ক্লাবে কাজ করেছেন। তার অকপট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উপস্থিতি তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এই পরিচিতিকে ভিত্তি করে তিনি সংগীত জগতে প্রবেশ করেন। ‘বোদাক ইয়েলো’র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সংগীত অঙ্গনে শীর্ষস্থান অর্জন, গ্র্যামি পুরস্কার লাভ, বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং নিরন্তর বিতর্ক—এই সবকিছু মিলিয়েই তিনি অনন্য র‍্যাপার কার্ডি বি।
১১ অক্টোবর, এই মার্কিন র‍্যাপার ৩৪ বছর পূর্ণ করলেন। তার প্রকৃত নাম বেলকালিস মারলেনিস আলমানজার, যিনি ১৯৯২ সালের এই দিনে নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে জন্মগ্রহণ করেন। ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত এই শিল্পীর মা ত্রিনিদাদের এবং বাবা ডোমিনিকান বংশোদ্ভূত। শৈশব থেকেই তিনি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। তবে তিনি তার অতীতকে গোপন না করে বরং সেই অভিজ্ঞতাগুলোকেই তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই কার্ডি বির তারকাখ্যাতির সূচনা। তার স্পষ্টবাদী মনোভাব, তীক্ষ্ণ হাস্যরস, অকপট স্বীকারোক্তি এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রাখঢাক না করার প্রবণতা দ্রুত জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ‘লাভ অ্যান্ড হিপ হপ: নিউইয়র্ক’ রিয়েলিটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি আরও বিস্তৃত দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
তবে টেলিভিশনের মাধ্যমে অর্জিত পরিচিতিকে একটি সুসংহত সংগীতজীবনে রূপান্তরিত করাটাই ছিল তার জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। ২০১৭ সালে তিনি অনুষ্ঠানটি ত্যাগ করে সম্পূর্ণরূপে সংগীতে মনোনিবেশ করেন। একই বছর তার ‘বোদাক ইয়েলো’ গানটি প্রকাশিত হয়, যা দ্রুত জনপ্রিয়তার শিখরে আরোহণ করে এবং বিলবোর্ড হট ১০০ তালিকার শীর্ষস্থান দখল করে।
এই সাফল্য ছিল এক যুগান্তকারী মাইলফলক। প্রায় দুই দশক পর ‘বোদাক ইয়েলো’ প্রথম কোনো একক নারী র‍্যাপারের নিজস্ব গান হিসেবে বিলবোর্ড তালিকার শীর্ষে স্থান করে নেয়। এর পূর্বে ১৯৯৮ সালে লরিন হিলের ‘ডু ওয়াপ (দ্যাট থিং)’ একই কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। ‘বোদাক ইয়েলো’ কার্ডি বির পরিচিতিকে রাতারাতি পরিবর্তন করে দেয়, তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তারকা থেকে একজন মূলধারার সংবেদনশীল সংগীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
২০১৮ সালে প্রকাশিত কার্ডি বির প্রথম অ্যালবাম ‘ইনভেশন অব প্রাইভেসি’ বিলবোর্ড ২০০ তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। পরের বছর এই অ্যালবামের জন্য তিনি সেরা র‍্যাপ অ্যালবাম বিভাগে গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করেন। একক নারী শিল্পী হিসেবে এই বিভাগে গ্র্যামি জেতা প্রথম শিল্পী তিনিই।
কার্ডি বির জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি হলো তার স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, ছন্দের অভিনব ব্যবহার এবং আত্মবিশ্বাসী পরিবেশনা। ‘বোদাক ইয়েলো’র পর ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আই লাইক ইট’ গানটি তাকে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে আরও সুপরিচিত করে তোলে। ব্যাড বানি ও জে বালভিনের সাথে গাওয়া এই গানটি যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ড হট ১০০ তালিকার শীর্ষে স্থান করে নেয়। লাতিন সংগীতের প্রভাব এবং র‍্যাপের সংমিশ্রণ গানটিকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দেয়।
একই বছর তিনি মার্কিন ব্যান্ড মারুন ৫–এর ‘গার্লস লাইক ইউ’ গানে অতিথি শিল্পী হিসেবে অংশ নেন, যা দীর্ঘ সময় ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল। পরবর্তীতে ‘আপ’, ‘মানি’ এবং মেগান দি স্ট্যালিয়নের সাথে গাওয়া ‘ডব্লিউএপি’ তার আলোচিত গানগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়। ‘ডব্লিউএপি’ প্রকাশের পর এর স্পষ্ট যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ লিরিক্স ও ভিডিও ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হলেও, এই বিতর্কই গানটিকে ঘিরে জনআলোচনার পরিধি আরও বৃদ্ধি করে।
কার্ডি বির গান নিয়ে আলোচনায় প্রায়শই তার ভাষা, আত্মপ্রকাশের ধরন এবং নারীর যৌনতা বিষয়ক প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচিত হয়। তার সমর্থকেরা তার অকপটতাকে স্বাধীনতার প্রকাশ হিসেবে মূল্যায়ন করেন, পক্ষান্তরে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন যে তার গানের ভাষা ও উপস্থাপনা অতিরিক্ত স্পষ্ট। এই পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তার তারকাখ্যাতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গঠিত হয়েছে।
সাত বছরের বিরতির পর ২০২৫ সালে তার দ্বিতীয় স্টুডিও অ্যালবাম ‘অ্যাম আই দ্য ড্রামা?’ প্রকাশিত হয়, যা বিলবোর্ড ২০০ তালিকার শীর্ষে অভিষেক করে। দীর্ঘ বিরতির পরেও শ্রোতাদের আগ্রহ ধরে রাখতে পারা তার সংগীতজীবনের একটি বিশেষ দিক।
২০২৬ সালেও কার্ডি নতুন গান প্রকাশ অব্যাহত রেখেছেন। ৮ অক্টোবর প্রকাশিত ‘ডোন্ট চার্ট’ গানটি ‘জিটিএভিআই: দ্য অ্যালবাম’–এর অংশ হিসেবে স্থান পেয়েছে।
কার্ডি বির জীবনের শুরুর পথ মসৃণ ছিল না। ব্রঙ্কসে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী কৈশোরে বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যক্তিগত সমস্যার সম্মুখীন হন। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি সুপারমার্কেটে কাজ করেছেন, এবং পরবর্তীতে স্ট্রিপার হিসেবেও কাজ শুরু করেন। তার নিজস্ব ভাষ্য অনুযায়ী, আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে সেই কাজ তাকে সহায়তা করেছিল।
কার্ডি বির জীবনের এই অধ্যায় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা হয়েছে। তবে কার্ডি তার অতীতকে আড়াল করার চেষ্টা করেননি; বরং জীবিকার প্রয়োজনে কীভাবে তাকে বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে বারবার এই বিষয়টি উঠে এসেছে যে, নিজের পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটিকে তিনি জীবনের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবেই দেখেন।
কার্ডি বি যতখানি জনপ্রিয়, তাকে ঘিরে বিতর্কও ততখানিই আলোচিত। তার গানের কথা, প্রকাশ্য মন্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাথে বাগ্‌বিতণ্ডা এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে ‘ডব্লিউএপি’ গানটির যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ লিরিক্স ও ভিডিও নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি তার সমর্থকেরা যুক্তি দেন যে, নারীর নিজের শরীর ও যৌনতা নিয়ে কথা বলার অধিকার রয়েছে।
২০১৯ সালে একটি পুরনো ঘটনা নিয়ে কার্ডি নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি স্ট্রিপার হিসেবে কাজ করার সময় পুরুষদের মাদক প্রয়োগ করে অর্থ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। এই বক্তব্যটি ঘিরে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি হয়। তবে এই বিষয়ে তার বক্তব্য, অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার আইনি অবস্থাকে এক করে দেখা উচিত নয়।
ইউটিউব ব্যক্তিত্ব তাশা কের সাথে তার আইনি লড়াইও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। কার্ডি অভিযোগ করেছিলেন যে তাশা কে তার সম্পর্কে মিথ্যা ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচার করেছেন। ২০২২ সালে ফেডারেল জুরি কার্ডির পক্ষে রায় দেন এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে সেই অর্থ আদায় নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
এছাড়াও, ২০১৮ সালে বেভারলি হিলসের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে সংঘটিত কথিত হামলার অভিযোগে একজন সাবেক নিরাপত্তাকর্মীর করা দেওয়ানি মামলায় ২০২৫ সালে কার্ডি বিচারের মুখোমুখি হন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়নি।
র‍্যাপার অফসেটের সাথে কার্ডি বির সম্পর্ক তার ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর অন্যতম। ২০১৭ সালে তাদের সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে আসে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তারা গোপনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে অক্টোবরে একটি অনুষ্ঠানে অফসেট তাকে প্রকাশ্যে বিয়ের প্রস্তাব দেন, যা তাদের সম্পর্ক নিয়ে ভক্তদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তোলে।
তবে তাদের সম্পর্ক ছিল উত্থান-পতনে পূর্ণ। বিচ্ছেদ, পুনর্মিলন এবং পারস্পরিক গুঞ্জনের মধ্যে ২০২০ সালে কার্ডি প্রথমবারের মতো বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে তারা আলাদা হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ২০২৪ সালের আগস্টে কার্ডি পুনরায় বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের বিচ্ছেদ আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। সন্তানদের জন্মদিনের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানে অবশ্য তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখা গেছে।
কার্ডি ও অফসেটের তিন সন্তান—কালচার, ওয়েভ এবং ব্লসম। তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিচ্ছেদের কারণ সম্পর্কে উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং প্রকাশিত তথ্যকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ; সমস্ত গুঞ্জনকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। অফসেটের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের পর কার্ডির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল তারকা স্টেফন ডিগসের সম্পর্কের খবর সামনে আসে। ২০২৫ সালে কার্ডি জানান যে তিনি ডিগসের সন্তানের মা হতে চলেছেন। একই বছরের নভেম্বরে তাদের ছেলে জন্মগ্রহণ করে।
সংগীতের সাফল্য কার্ডি বির জীবনে এনেছে অসাধারণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। গান থেকে আয়, অ্যালবাম বিক্রয়, স্ট্রিমিং, কনসার্ট, বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাথে চুক্তি, অভিনয় এবং ব্যবসায়িক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে তার আয়ের উৎস অত্যন্ত বিস্তৃত।
‘সেলিব্রিটি নেট ওর্থ’–এর ২০২৬ সালের আগস্টে হালনাগাদ করা হিসাব অনুযায়ী, কার্ডি বির আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ১২ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার সমতুল্য।
সংগীতের পাশাপাশি কার্ডি অভিনয়েও তার দক্ষতা দেখিয়েছেন। ২০১৯ সালে ‘হাসলার্স’ চলচ্চিত্রে জেনিফার লোপেজের সাথে তাকে দেখা যায় এবং পরবর্তীতে তিনি ‘এফ নাইন’–এও অভিনয় করেন। এই কাজগুলো তার পরিচিতিকে সংগীতের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রসারিত করেছে। ২০২৬ সালে কার্ডি ‘গ্রো–গুড বিউটি’ নামে একটি প্রসাধনী ব্র্যান্ডও চালু করেছেন।
তথ্যসূত্র: গ্র্যামিডটকম, পেজ সিক্স ও বিলবোর্ড।