Sun 19th Jul 2026, 4:29 am

ডেঙ্গুর প্রকোপে উদ্বেগ: শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ হার আশঙ্কাজনক, প্রতি পাঁচজন আক্রান্তের মধ্যে একজন শিশু

ডেঙ্গুর প্রকোপে উদ্বেগ: শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ হার আশঙ্কাজনক, প্রতি পাঁচজন আক্রান্তের মধ্যে একজন শিশু
চলতি বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ দেশের জনস্বাস্থ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষত শিশুদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আক্রান্তের হার বিবেচনায়। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট ডেঙ্গু রোগীদের প্রতি পাঁচজনের একজনই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু। এদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতাও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একইসাথে, এই রোগের ভৌগোলিক বিস্তার কেবল রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি দ্রুতগতিতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, বর্ষার তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্যমতে, বিগত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুজনিত কারণে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে এই সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ৯৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৩২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং সর্বমোট ৯ হাজার ৭৭০ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

**প্রতি পাঁচজনে একজন শিশু**
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, মোট আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ১ হাজার ৮১৮ জন ১৫ বছর বা তার কম বয়সী, যা মোট রোগীর প্রায় ১৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন শিশু। শিশুদের মধ্যে, পাঁচ বছরের কম বয়সী ৫৮৪ জন সংক্রমিত হয়েছেন, যা মোট রোগীর প্রায় ৬ শতাংশ। এছাড়া, ছয় থেকে দশ বছর বয়সী ৫৬৩ জন এবং এগারো থেকে পনেরো বছর বয়সী ৬৬৩ জন শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৬৪ জন। সব মিলিয়ে, ৩০ বছরের কম বয়সী রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৮০ জনে, যা মোট আক্রান্তের ৫৯ শতাংশ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, শিশু ও কর্মক্ষম তরুণদের মধ্যে সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করছে।

**ঢাকার বাইরে দ্রুত ছড়াচ্ছে সংক্রমণ**
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর ভৌগোলিক বিস্তারে ব্যাপক পরিবর্তন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট আক্রান্ত রোগীর ৭৬ শতাংশই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা। বিভাগীয় পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বরিশাল বিভাগ সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে ২ হাজার ৪৪৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যা মোট রোগীর প্রায় ২৫.১৭ শতাংশ – অর্থাৎ প্রতি চারজন ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে একজন বরিশাল বিভাগের। এরপরে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ (১ হাজার ৭২১ জন), খুলনা বিভাগ (১ হাজার ২৭৬ জন), ময়মনসিংহ বিভাগ (৩৩৯ জন), রাজশাহী বিভাগ (৩২৪ জন), সিলেট বিভাগ (৮০ জন) এবং রংপুর বিভাগ (৭৪ জন)। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৯১২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।

**রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ থেকে জাতীয় সংকট**
একসময় ডেঙ্গুকে প্রাথমিকভাবে রাজধানীকেন্দ্রিক একটি রোগ হিসেবে গণ্য করা হলেও, বিগত কয়েক বছরের তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ডেঙ্গু এখন আর কেবল ঢাকার ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ নেই। ২০২১ সালে মোট আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকার বাইরের রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ শতাংশে, ২০২৩ সালে ৬৫ শতাংশে। লক্ষণীয়ভাবে, চলতি বছর এই হার আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে বলছেন যে, এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে ডেঙ্গু এখন দেশের প্রায় সকল অঞ্চলের একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ঢাকার শ্যামলীর ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার মন্তব্য করেন, ২০১৫ সালের আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল, তবে এরপর থেকে ধীরে ধীরে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে।

**আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বাড়তে পারে প্রকোপ**
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও স্বনামধন্য কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানান যে, এডিস মশার ঘনত্ব, রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে নিয়মিতভাবে ডেঙ্গুর পূর্বাভাস প্রণয়ন করা হয়। বর্তমান বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তিনি দৃঢ়ভাবে সতর্ক করেছেন যে, যদি এখনই মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার গুরুতর আশঙ্কা বিদ্যমান।

**স্থায়ী সমাধানে ঘাটতি কাটাতে হবে**
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ মন্তব্য করেছেন যে, বিগত পঁচিশ বছরেও ঢাকার ভেতরে এডিস মশার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। তিনি এই মর্মে সতর্ক করেছেন যে, ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমিত সক্ষমতার কারণে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মশক নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, নিয়মিত ওয়ার্ডভিত্তিক জরিপ পরিচালনা, আধুনিক গবেষণাগারের অপর্যাপ্ততা এবং প্রশিক্ষিত কীটতত্ত্ববিদের অভাব সুস্পষ্ট। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর করা না গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়।