Tue 28th Jul 2026, 1:42 am

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নবম পে স্কেল দুই বছর স্থগিতের সুপারিশ আইএমএফের

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নবম পে স্কেল দুই বছর স্থগিতের সুপারিশ আইএমএফের
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব পরিস্থিতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ সৃষ্টির উদ্বেগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন পে স্কেল অন্তত দুই বছর স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে সরকার আইএমএফের এই সুপারিশ পুরোপুরি গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের কার্যকর কৌশল নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন।

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে আইএমএফ প্রতিনিধি দল অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে নবম পে স্কেলের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের বিশ্লেষণে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা বাজেট ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলস্বরূপ, সংস্থাটি পে স্কেলটি অন্তত দুই বছর স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে।

সূত্রসমূহ ইঙ্গিত দেয় যে, আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে আয়োজিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় এই বিষয়টি আরও আলোচনার সুযোগ পেতে পারে। পরবর্তীকালে নভেম্বরে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি নবম পে স্কেল বিষয়েও বিস্তারিত পর্যালোচনায় আগ্রহী। তবে সরকার চায়, সম্ভাব্য এই বৈঠকের পূর্বেই পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে, যেন বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত না হয়।

গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সচিব কমিটির সুপারিশমালা, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো, এর সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব এবং বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, পে স্কেল সংক্রান্ত ফোকাল কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অর্থমন্ত্রী নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে আরও বিশদভাবে পর্যালোচনা করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।

এই মুহূর্তে অর্থ বিভাগ নতুন পে স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত করেছে। চলতি সপ্তাহের শেষ ভাগে অথবা আগামী সপ্তাহের যেকোনো মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য পেশ করা হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন যে, সরকার নীতিগতভাবে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্যুত হতে চায় না। তবে, এটি একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। একইসাথে, দেশের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাস্তবায়নের বিকল্প পন্থাও অন্বেষণ করা হচ্ছে।

বর্তমান অষ্টম জাতীয় পে স্কেল ২০১৫ সালে কার্যকর হয়েছিল। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের মূল বেতন কাঠামোতে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলস্বরূপ, সরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, আনুমানিক ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী নবম পে স্কেলের আওতাভুক্ত হবেন। প্রস্তাবিত কাঠামোতে মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা এবং অন্যান্য ভাতার বৃদ্ধি প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির অধীনস্থ। পাশাপাশি প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে, আইএমএফ প্রত্যাশা করে যে, সরকার বড় আকারের পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যয় বৃদ্ধির পূর্বে রাজস্ব সক্ষমতা, বাজেট ঘাটতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকে সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করবে।