Fri 31st Jul 2026, 2:44 am

বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা: তীব্র গরমে বাংলাদেশে বার্ষিক ১৮০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি

বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা: তীব্র গরমে বাংলাদেশে বার্ষিক ১৮০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি
বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যার ফলে বিপুল সংখ্যক কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। ২০২৪ সালে, এই তাপপ্রবাহের প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১৩০ কোটি থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমতুল্য।

‘এ লিভেবল ফিউচার: প্রটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাজধানী ঢাকা এই ক্ষতির শিকার হওয়া শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ঢাকায় প্রতি বছর মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ অপচয় হচ্ছে, যা ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সমান।

বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে এই ক্ষতির পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে। সেই সময় ঢাকা শহরের মোট উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টার প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ চরম তাপমাত্রার কারণে হারিয়ে যাবে।

গত ২৯ জুলাই প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিনের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে উৎপাদনশীলতার ক্ষতি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।

প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের জন্য গুরুতর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের যৌথ বিশ্লেষণের তথ্য উদ্ধৃত করে বলেছে যে, তাপজনিত কারণে কর্মক্ষমতা হ্রাসের এই সংকট যদি সমাধান না করা হয়, তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাত ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে বিশ্বব্যাংকের মতে, সঠিক ও সুনির্দিষ্ট অর্থায়নের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং কারখানার পরিবেশ উন্নয়নে ২০১৬ সালে সরকার কর্তৃক গঠিত ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ প্রাথমিকভাবে অল্প কয়েকটি কারখানা থেকে শুরু হয়ে বর্তমানে পুরো শিল্পখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।

আইএফসির ‘পার্টনারশিপ ফর ক্লিনার টেক্সটাইল’ এবং টেকসই অর্থায়ন এই উদ্যোগকে আরও গতিশীল করেছে। এর ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব ‘লিড’ সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার সংখ্যা ২৭০টি অতিক্রম করেছে।

অতিরিক্ত গরমের কারণে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার ফলে পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের ওপর সহিংসতা ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানির ঝুঁকি বাড়ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় চরম তাপমাত্রার কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি কমপক্ষে ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।

উপরন্তু, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে ২৮ কোটি কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তীব্র তাপমাত্রা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কমপক্ষে ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস মারাত্মক ও বিপজ্জনক তাপমাত্রার সম্মুখীন হবেন, যা বর্তমানের তুলনায় চার গুণ বেশি।

‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ’-এর তথ্যমতে, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় এই মৃত্যুর হার প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চরম তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই শ্রম উৎপাদনশীলতা হ্রাস করছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এবং এ অঞ্চলের শহরগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। একই সাথে, এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জাতীয় অবকাঠামোর উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর সবচেয়ে মারাত্মক শিকার হচ্ছেন নিম্নআয়ের পরিবার, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, তাপসহনশীল এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম শহর গড়ে তোলা কেবল মানুষকে অতিরিক্ত গরম থেকে রক্ষা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি কর্মসংস্থান সংরক্ষণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শহরগুলোকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বজায় রাখার একটি কৌশল। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তবে দেশগুলো বাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক শহর গড়ে তুলতে পারবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।