Mon 13th Jul 2026, 12:21 am

অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে বেলিংহামের জোড়া গোল, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড

অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে বেলিংহামের জোড়া গোল, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড
আক্রমণাত্মক এই ইংলিশ দল পিছিয়ে পড়েও কখনো মনোবল হারায় না। শেষ ৩২-এ ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচের পর এবার বিশ্বকাপের তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষেও তারা একই দৃঢ়তা দেখিয়েছে। মায়ামিতে অনুষ্ঠিত এই রোমাঞ্চকর ম্যাচে শুরুতে গোল হজম করলেও, শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড নরওয়েকে ২-১ গোলে পরাজিত করে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে। এই ঐতিহাসিক জয়ে, ১৯৬৬ সালের চ্যাম্পিয়নরা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ চারে স্থান করে নিয়েছে, যার মূল কারিগর ছিলেন জুড বেলিংহামের জোড়া গোল।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ইংল্যান্ডের পায়ে থাকলেও, টমাস টুখেলের শিষ্যরা গোলের সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়। উল্টো ৩৬তম মিনিটে তারা গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ে। নিজেদের অর্ধ থেকে হ্যারি কেইনের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ রচনা করেন মার্টিন ওডেগার্ড। তার নির্ভুল পাস থেকে বাম দিক দিয়ে আক্রমণে উঠে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের শট পোস্টে লেগে জালে আশ্রয় নেয়, যা ইংল্যান্ডকে হতবাক করে দেয়।

৪০তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ পায় নরওয়ে। ফাঁকা অবস্থানে থাকা আর্লিং হলান্ডকে পাস না দিয়ে একা গোল করার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় আলেক্সান্দার সরলথ সেই সুযোগ নষ্ট করেন।

নরওয়েকে সেই ভুলের ‘শাস্তি’ পেতে হয় প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে গর্ডনের চমৎকার ক্রস থেকে বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ের জোরালো শটে বেলিংহাম সমতা ফেরান। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরেই কেইন বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়।

তবে, প্রথমার্ধের শেষ ভাগে ইংল্যান্ডের যে আক্রমণাত্মক ধারা দেখা গিয়েছিল, তা দ্বিতীয়ার্ধে অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। এই সময়ে নরওয়ের আক্রমণগুলো আরও ধারালো হয়ে ওঠে। ৫৫তম মিনিটে কর্নার কিক থেকে টোরবিয়র্ন হেগেম বল জালে জড়ালেও, ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায়, কর্নার নেওয়ার আগে হলান্ড এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ফাউল করেছিলেন। ফলে সেই গোল বাতিল করা হয়। ৭৬তম মিনিটে ক্রিস্টোফার আয়েরের কর্নার থেকে নেওয়া হেড ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলে হলান্ডও গোল করতে ব্যর্থ হন। ৮৫তম মিনিটে আন্তোনিও নুসার নিচু শটটি দক্ষতার সাথে প্রতিহত করেন ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড।

অন্যদিকে, দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড কোনো অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি। ৮৭তম মিনিটে বুকায়ো সাকার ক্রস থেকে কেইন এবং এবেরেচি এজে গোল করার সুযোগ পেলেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত, ম্যাচের মীমাংসা অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে গড়ায়।

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই বেলিংহাম নায়ক হয়ে আবির্ভূত হন। ৯২তম মিনিটে কেইনের হেড নরওয়ের গোলরক্ষক নিলান্ড অসাধারণভাবে রক্ষা করেন। তবে পরের মিনিটেই মরগান রজার্সের দূরপাল্লার শট তিনি ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। দ্রুত ছুটে এসে বেলিংহাম সেই বলকে সহজ টোকায় জালে ঠেলে দেন, যা ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে এগিয়ে নিয়ে যায়।

তবে, নাটকীয়তা সেখানেই শেষ হয়নি। ৯৯তম মিনিটে স্পেন্সকে বক্সে ফাউল করা হয়েছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে রেফারি ইংল্যান্ডকে পেনাল্টি দেন। কিন্তু ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, স্পেন্স নিজেই ডিফেন্ডারকে আগে স্পর্শ করেছিলেন। ফলে রেফারি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পেনাল্টি বাতিল করেন। এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে Desi Media Point-এর লাইভ সম্প্রচারে ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ফুটবলার অ্যালান শিয়ারার ও পল রবিনসন ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা পেনাল্টি বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেন।

একই সাথে, নরওয়ে ইংল্যান্ডের রক্ষণে একের পর এক আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছিল, যা ম্যাচে যেকোনো মুহূর্তে সমতা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। ১০৯তম মিনিটে প্যাটট্রিক বার্গের দূরপাল্লার শট অল্পের জন্য গোলপোস্টের উপর দিয়ে না গেলে নরওয়ে সমতা ফেরাতে পারত। পরের মিনিটেই অবশ্য স্পেন্স ও সাকার পরপর দুটি শট নিলান্ড দুর্দান্তভাবে সেভ করে নরওয়ের আশা জিইয়ে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নরওয়ে আর সমতা ফেরাতে পারেনি। ১০৫তম মিনিটে কোচ গোলশূন্য হলান্ডকে মাঠ থেকে তুলে নেন। ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৬৩৬ দিন পর প্রথমবার গোল করতে ব্যর্থ হন। বিপরীতে, জুড বেলিংহামের জোড়া গোল আরেকটি অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের গল্প রচনা করে ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপের শেষ চারে নিশ্চিত স্থান করে দেয়।

নরওয়ের বিপক্ষে এই ম্যাচের আগে শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিরুদ্ধেও বেলিংহাম জোড়া গোল করেছিলেন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার পর তিনিই প্রথম খেলোয়াড় যিনি টানা দুটি নকআউট ম্যাচে জোড়া গোল করার বিরল কীর্তি স্থাপন করলেন।