হিজবুল্লাহ—লেবাননের সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী। ইরানপন্থী হিসেবে পরিচিত। একসময় হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এ গোষ্ঠী আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু সেসব দিন পেছনে ফেলে নিজেদের নতুন করে সংগঠিত করেছে হিজবুল্লাহ।
সময়টা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিক। হিজবুল্লাহ তখন চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি পার করছে। হিজবুল্লাহ সদর দপ্তরে বোমা ফেলে ইসরায়েল। একটি, দুটি, তিনটি নয়; পরপর ৮০টি। ধ্বংস হয়ে যায় কার্যালয়। হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের অনেকে নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সংগঠনের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ ছিলেন।
ধারণা করা হয়, ইসরায়েলিরা হাসান নাসরুল্লাহর অবস্থান শনাক্ত করে ফেলেছিল। মাটির ৬০ ফুট নিচেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না। হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের সন্দেহ ছিল, ইসরায়েল তাঁদের মুঠোফোনে আড়ি পাতছে। তাঁরা কী বলছেন এবং কী করছেন—সবই জেনে যাচ্ছে। এমনকি হাজারো পেজার ও ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরক বসানো হয়েছিল। এতে হিজবুল্লাহর মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহর বেঁচে থাকা কমান্ডারেরা মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধ করে দেন। তাঁরা মোটরসাইকেল ও স্কুটারে চলাচল শুরু করেন। তাঁরা লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের হারেত হরেইক ও শিয়াহসহ বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হন। সম্মিলিতভাবে এই এলাকা ‘দাহিয়েহ’ নামে পরিচিত।
হিজবুল্লাহর কমান্ডারেরা মনে করছিলেন, সবকিছুই ফাঁস হয়ে গেছে। হাসান নাসরুল্লাহর মতো সর্বোচ্চ নেতা যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে তাঁদের আর কেউ নিরাপদ নন।
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ তাদের সর্বশেষ বিকল্প পরিকল্পনাটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি এমন একটি পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়ন করতে হবে—এমনটা হিজবুল্লাহ কমান্ডারেরা ভাবেননি। দাহিয়েহ এলাকায় কমান্ডারেরা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা শুরু করেন। বেকারি, ব্যাংকের কোনো শাখা, এমনকি মুঠোফোনের দোকান—কোথায় দেখা করেননি তাঁরা।
ওই সময় হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল এভাবে সামনাসামনি দেখা করা। কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়নি। সম্ভবও ছিল না। তাঁদের এভাবে দেখা করার মূল্য উদ্দেশ্য দুটি। এক, সংকটময় সময় কাটিয়ে হিজবুল্লাহকে আবারও সক্রিয় করার পরিকল্পনা করা। দুই, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করা।
লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতাকে অনেকে আত্মসমর্পণের শামিল মনে করছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটি নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করেছেন। তবু এই সমঝোতা হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে আরও কিছুটা সময়-সুযোগ করে দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।আর এভাবেই শুরু হয় হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ধ্বংসের মুখ থেকে উঠে আসে হিজবুল্লাহ। সংগঠনের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়।
হিজবুল্লাহর এই ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন এমন সাতজনের সঙ্গে কথা বলেছে মিডল ইস্ট আই। সংবাদমাধ্যমটি কথা বলেছে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্র, লেবাননের রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন আরব কূটনীতিকের সঙ্গেও। তাঁদের প্রায় সবাই নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
তাঁদের ভাষ্য, শুরুর দিকে বড় ধরনের সংশয় থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে হিজবুল্লাহ। সামরিকভাবে বড় ধাক্কা খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে হিজবুল্লাহ কীভাবে নিজেদের বাহিনীকে পুনর্গঠন করেছে, সেই বিষয়ে তাঁরা বিস্তারিত জানিয়েছেন। এমনকি হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়েও তাঁরা কথা বলেছেন।
২০২৩ সালের পর থেকে লেবাননে ইসরায়েলিদের দুটি যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা, হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সংকট, শিয়াদের একটি অংশের অসন্তোষসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে এসব ব্যক্তির কথায়, মতামতে।
ইসরায়েলে হামলা ‘ভুল’ ছিল
পর্দার অন্তরালে থাকা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের অনেকেই মনে করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালানোটা বড় আর ঐতিহাসিক ভুল ছিল। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানায়, হামলার সিদ্ধান্ত সরাসরি হাসান নাসরুল্লাহর কাছ থেকে এসেছিল। এমনকি হিজবুল্লাহর সর্বোচ্চ নির্বাহী পরিষদ শুরা কাউন্সিলের ভেতরেও এ নিয়ে ভিন্নমত ছিল।
চলতি মাসের শুরুর দিকে এ বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের আর্মি রেডিও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর ধরে হামাস আর হিজবুল্লাহর মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উদ্ধার করা বলে দাবি করা কিছু অভ্যন্তরীণ নথির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে সমন্বিত ও আকস্মিক হামলায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, সীমান্ত ও সম্পদ বিভাগের প্রধান এবং সাবেক সংসদ সদস্য নাওয়াফ মুসাওয়ি বলেন, ‘এসবই কেবল প্রচার। বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।’
তবে নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা হিজবুল্লাহর কয়েকজন যোদ্ধার মতে, ইসরায়েলের ওই প্রতিবেদনে কিছুটা সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে।
বছরের পর বছর ধরে ইরান এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোট একটি কৌশল গড়ে তুলেছে। এ জোটে রয়েছে কয়েকটি রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই কৌশলের নাম ‘ইউনিটি অব ফ্রন্টস’। এর লক্ষ্য চারদিক থেকে হুমকি সৃষ্টির মাধ্যমে ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলা।
সোলাইমানি–নাসরুল্লাহর ভূমিকা
এই কৌশলের মূলে ছিলেন দুজন ব্যক্তি। দুজনই এখন প্রয়াত। তাঁদের একজন ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। অন্যজন হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ। নিজের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব, সামরিক সাফল্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নাসরুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। আরবিতে সাবলীল কাসেম সোলাইমানি বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞ ছিলেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অভিজাত কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন তিনি।
সোলাইমানি ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম তদারকি করতেন। প্রয়োজনে সরাসরি নির্দেশনাও দিতেন। এর মধ্যে ছিল ইরাকের শিয়া আধাসামরিক বাহিনী, ইয়েমেনের হুতিরাও। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছেও তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ছিল।
সোলাইমানি আর নাসরুল্লাহর কর্মতৎপরতার মিল বোঝাতে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ২০১২ সালের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে। সূত্রটির দাবি, ওই সময় নাসরুল্লাহকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছিলেন সোলাইমানি। উদ্দেশ্য ছিল, সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে সমর্থন দেওয়া।
সূত্রটি জানায়, সোলাইমানির এমন প্রস্তাবের জবাবে নাসরুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের সিরিয়ায় যাওয়া উচিত। তবে আমাদের আরও আগেই যাওয়া উচিত ছিল।’
বাঁকবদলের মুহূর্ত
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। এ ঘটনাকে বড় বাঁকবদলের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোট তাদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত নেতৃত্বকে হারায়। ‘ইউনিটি অব ফ্রন্টস’ কৌশলও ধীরে ধীরে গতি হারাতে শুরু করে।
হিজবুল্লাহর অন্তত তিনটি সূত্রের দাবি, মূলত এ কারণে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস এককভাবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দুটি সূত্র জানায়, ওই হামলার পর ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দোল্লাহিয়ান বৈরুতে যান। ওই সফরের সময় তিনি নাসরুল্লাহকে জানান, তেহরান যুদ্ধে (গাজা যুদ্ধ) শুধু নৈতিক সমর্থন দিতে প্রস্তুত।
আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের নেতারা সব সময় নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই প্রত্যেক দায়িত্বশীল নেতার বিকল্প হিসেবে আরেকজনকে প্রস্তুত রাখা হয়নাওয়াফ মুসাওয়ি, হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।ইরানের নেতাদের মতো নাসরুল্লাহ নিজেও আশঙ্কা করছিলেন, বড় ধরনের হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এ কারণে তিনি সীমিত পরিসরে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাই তিনি ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর ইসরায়েলের দিকে সীমিত পরিসরে রকেট হামলার নির্দেশ দেন। ওই সময়ে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চলছিল।
তবে হাসান নাসরুল্লাহর বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাদওয়ান ফোর্সের বিশেষ অভিযান ইউনিটের প্রধান ইব্রাহিম আকিল। বিরোধিতাকারীদের ভাষ্য ছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে নামলে পুরো শক্তি নিয়েই নামতে হবে। আর সেটা সম্ভব না হলে যুদ্ধে জড়ানো একেবারে উচিত হবে না।
বড় সংঘর্ষ এড়ানো
এরপর বছরখানেক ধরে লেবানন–ইসরায়েল সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল। এ সময়ে দুপক্ষের মধ্যে ৭ হাজার রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং বিমান ও কামানের গোলাবর্ষণ হয়।
এসব হামলা চলে পুরো ‘ব্লু লাইনে’। জাতিসংঘ নির্ধারিত এ সীমানা কার্যত লেবানন-ইসরায়েলের সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে প্রাণহানির দিক থেকে বড় ক্ষতি হয় লেবাননের। দেশটিতে ২ হাজার মানুষ নিহত হন। ইসরায়েলের সীমান্তের দক্ষিণে নিহত হন ৭০ জন।
যদিও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনাকে উত্তর সীমান্তে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। এতে গাজার পাশাপাশি আরেকটি ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে হয় ইসরায়েলকে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার ইসরায়েলি বাসিন্দাকে সরিয়ে নিতে হয়।
দুপক্ষ শুরুর দিকে বেশকিছু অলিখিত সীমার মধ্যে থেকে হামলা চালায়। উভয় পক্ষের মধ্যে এমন এক ধরনের বোঝাপড়া ছিল, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জবাব একই ধরনের হামলায় দেওয়া হবে। হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ সতর্ক করে বলেছিলেন, বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে তেল আবিবে হামলা চালিয়ে।
ধীরে ধীরে সেই সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে ইসরায়েল। সেই সঙ্গে হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, সেটিও পরীক্ষা করতে থাকে ইসরায়েলি বাহিনী। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দাহিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সালেহ আল-আরুরি নিহত হন।
এর প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের মাউন্ট মেরনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক রকেট হামলা চালায়। হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র বলেছে, তেল আবিবের বদলে ওই ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার কারণ, আরুরি ছিলেন ফিলিস্তিনি, লেবাননের নাগরিক নন। কাজেই এর জবাবও সীমিত রাখা হয়েছিল।
ছয় মাস পর হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ফুয়াদ শুকুর ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন। এর জবাবে ইসরায়েলের দিকে এক হাজার রকেট ছোড়ার পরিকল্পনা করেছিল হিজবুল্লাহ। কিন্তু ইসরায়েল আগে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর বেশির ভাগ রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র ধ্বংস করে দেয়।
পেজার–ওয়াকিটকি বিস্ফোরণ
হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের দাবি, পাল্টা জবাবের পরিকল্পনার পুরোটা সময় আড়ি পেতে শুনেছিল ইসরায়েল। তাই আগেই হামলা চালাতে পেরেছিল দেশটি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা আর গোয়েন্দা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল হাজারো পেজার ও শত শত ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরণ ঘটায়।
ইসরায়েলের সমর্থকেরা এ অভিযানকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দেন। অনেকেই একে জেমস বন্ড চলচ্চিত্রের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন। হিজবুল্লাহর সরবরাহ ব্যবস্থায় ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ করে যোগাযোগযন্ত্রে বিস্ফোরক বসিয়েছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।
এসব বিস্ফোরণে প্রায় ৪০ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েক হাজার মানুষ। মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এই অভিযানকে ‘আমাদের মিশন বাস্তবায়নের একটি স্পষ্ট উদাহরণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। হামলার স্মরণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সোনার তৈরি একটি পেজার উপহার দেন।
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো স্বীকার করে নিয়েছে, এটি ছিল তাদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। তবে তাদের দাবি, শেষ পর্যন্ত এই অভিযান সফল হয়নি।
১৭ সেপ্টেম্বর বিস্ফোরিত পেজারগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর মতে, প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ওয়াকিটকি। এগুলো আকারে বড় ছিল। বেশি বিস্ফোরক রাখা হয়েছিল। মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা এগুলো ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে পেজার মূলত বার্তা পাঠানো বা সদস্যদের ডেকে পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। এগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অযোদ্ধা কর্মকর্তাদের কাছে ছিল।
হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের ভাষ্য, তাদের সামরিক কাঠামো ইরানের আইআরজিসির আদলে গড়ে তোলা। এ কাঠামোয় হিজবুল্লাহর একেকজন কমান্ডারের বিপরীতে একজন করে সমকক্ষের ইরানি কর্মকর্তা থাকেন। হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাঁদের উপপ্রধানেরা নিহত হওয়ার পর সেসব ইরানি কর্মকর্তা শূন্যতা পূরণে লেবাননে আসেন।সূত্রগুলোর দাবি, ২০২২ সাল থেকে হিজবুল্লাহর কাছে ত্রুটিযুক্ত পেজার সরবরাহ করতে শুরু করে ইসরায়েল–সমর্থিত কোম্পানি। হামলার সময় এমন প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পেজার ছিল। ওয়াকিটকি নিয়ে অভিযানটি এক দশক ধরে অত্যন্ত গোপনে চলছিল। দুটি সূত্রের দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বরের অভিযানের সময় ১৫ হাজার ওয়াকিটকি গুদামে সংরক্ষিত ছিল। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেগুলো তখন বন্ধ অবস্থায় ছিল।
এ সংখ্যাগুলো মোসাদের একজন এজেন্টের আগে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলের একটি গোপন ছদ্মবেশী কোম্পানি হিজবুল্লাহকে প্রায় ১৬ হাজার ওয়াকিটকি সরবরাহ করেছে। ওই সময় হামলায় হাজারো পেজার ধ্বংসের পরদিন চালানো অভিযানে মাত্র কয়েক শ ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়েছিল। যদিও ওয়াকিটকির বিস্ফোরণের ক্ষতি ছিল বেশি।
দ্বিতীয় দিনের হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হন। আর প্রথম দিনের হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১২ জন।
হিজবুল্লাহর দুটি সূত্রের দাবি, তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল। কারণ, মোসাদ হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ আলোচনা আড়ি পেতে শুনছিল। তাদের ধারণা ছিল, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই হিজবুল্লাহ ও ইরান বুঝতে পারে, যুদ্ধ আর সীমিত রাখা সম্ভব হবে না। এরপর বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেই বৈঠকে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে স্থল অভিযানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এর আগে হিজবুল্লাহর একটি পরিদর্শন দল তাদের পেজারগুলো নিয়ে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করছিল। এগুলো নিরাপত্তাসংক্রান্ত অন্তত দুটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তারপরও সন্দেহ কাটেনি। তাই আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য কয়েকটি নমুনা ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
হিজবুল্লাহ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এ সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। আর দেশটি আগেই হিজবুল্লাহর ওপর আক্রমণ করে বসে।
হিজবুল্লাহর বিপর্যয়ের শুরু
টানা ৬৬ দিন ধরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে জোরালো বিমান ও স্থল অভিযান চালায় ইসরায়েল। একের পর এক আঘাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে হিজবুল্লাহ। এ অভিযানে শুধু হাসান নাসরুল্লাহ নন, তাঁর চাচাতো ভাই ও উত্তরসূরি হাশেম সাফিউদ্দিন নিহত হন। ইব্রাহিম আকিল ও তাঁর নেতৃত্বাধীন রাদওয়ান ফোর্সের কয়েকজন কমান্ডারসহ হিজবুল্লাহর সামরিক নেতৃত্বের অনেকে নিহত হন।
ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর প্রায় পুরো ইউনিট ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংস করা হয় গোলাবারুদের গুদামও। হামলায় হিজবুল্লাহর যেসব কমান্ডার বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই মুঠোফোন ব্যবহার করেননি। এ কারণে তাঁরা ইসরায়েলের নজরদারি এড়াতে সক্ষম হন।
এ পরিস্থিতিতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ইউনিটে লড়াই চালিয়ে যান হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। তাঁরা ইসরায়েলিদের অগ্রযাত্রা ধীর করে দেন। উত্তরাঞ্চলে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর কতটা ভয়াবহ আঘাত নেমে এসেছে, সে সম্পর্কে তাঁদের অনেকেরই ধারণা ছিল না।
দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা যখন ইসরায়েলি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখছিলেন, তখন ঘনিষ্ঠ এই মিত্রকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে তেহরান।
হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের ভাষ্য, তাদের সামরিক কাঠামো ইরানের আইআরজিসির আদলে গড়ে তোলা। এ কাঠামোয় হিজবুল্লাহর একেকজন কমান্ডারের বিপরীতে একজন করে সমকক্ষের ইরানি কর্মকর্তা থাকেন। হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাঁদের উপপ্রধানেরা নিহত হওয়ার পর সেসব ইরানি কর্মকর্তারা শূন্যতা পূরণে লেবাননে আসেন।
একটি সূত্র জানায়, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানির উত্তরসূরি ইসমাইল কানি। কুদস ফোর্সের লেবানন শাখার প্রধান আব্বাস নিলফোরুশান হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে হামলার সময় হাসান নাসরুল্লাহর সঙ্গে নিহত হন।
হিজবুল্লাহর বিশ্বাস, তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা ইসরায়েলকে বিস্মিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত এ কারণে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় বলে সংগঠনের সূত্রগুলোর দাবি। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ভাষ্য, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে এবার রাজনৈতিকভাবে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা যাবে। এর ফলে সেনাদের জীবন আর ঝুঁকিতে ফেলতে হবে না।
লেবানন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ধারণা জোরালো হতে থাকে। সেটি হলো, হিজবুল্লাহ কার্যত ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে। অনেকে মনে করেন, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে, কার্যত তারও কম রয়েছে। একই সঙ্গে এই মতও জোরালো হয়, লেবাননকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে হিজবুল্লাহর অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে হবে।
আরব এক কূটনীতিকের ভাষ্য, হিজবুল্লাহর এমন দুর্বল অবস্থানে সৌদি আরব খুশি ছিল। ওই কূটনীতিকের দাবি, মিসর ও ফ্রান্স হিজবুল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করে, সবচেয়ে শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। এই দুই দেশ মনে করত, হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের উচিত সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ নেওয়া।
টিকে থাকার লড়াই
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ভাষ্য, ওই সময় তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল টিকে থাকা। এ কারণে তাঁরা বড় ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। এর মধ্যে সিরিয়ায় বাশার আল–আসাদের সরকারের পতন হিজবুল্লাহকে আরও দুর্বল করে দেয়। আল–আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এক দশক ধরে লড়েছে হিজবুল্লাহ। এতে হিজবুল্লাহ জনবল, অর্থ ও আরব বিশ্বের মানুষের সমর্থনের অনেকটা হারিয়েছে।
যাই হোক, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দিনই সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়। তখন আসাদকে আবারও রক্ষা করার মতো অবস্থায় ছিল না হিজবুল্লাহ। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বলা হয়েছিল, লিতানি নদীর দক্ষিণ থেকে হিজবুল্লাহর বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে। পরে বিভিন্ন দেশ ও লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলো দাবি তোলে, হিজবুল্লাহকে আরও উত্তরে সরে যেতে হবে।
একজন আরব কূটনীতিক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আসাদের পতনের পর অবস্থান বদলে যায়। দাবি ওঠে, শুধু লিতানির দক্ষিণ নয়, উত্তর দিক থেকেও হিজবুল্লাহকে সরে যেতে হবে। অথচ আমরা সবাই জানতাম, এটি মূল চুক্তির অংশ ছিল না।’ এই কঠোর অবস্থান হিজবুল্লাহকে আরও অনড় করে তোলে।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের ভাষ্য, ‘২০২৪ সালের নভেম্বরের পর হিজবুল্লাহ সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছিল। এমনকি জুনে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধেও তারা অংশ নেয়নি। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং লেবাননের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য কোনো রাজনৈতিক পথ না দেওয়ায় হিজবুল্লাহ আর নমনীয় অবস্থানে থাকতে পারেনি।
আত্মরক্ষা থেকে আক্রমণ
খোলা চোখে দেখে মনে হতে পারে, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতির সময় হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, পড়ছে। যদিও ইসরায়েল একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। এ সময়ে প্রায় ৩ হাজার বিমান ও ড্রোন হামলা এবং গোলাবর্ষণ করা হয়। হিজবুল্লাহর বেশির ভাগ কমান্ডার এবং তাঁদের উত্তরসূরিদের হত্যার পর ইসরায়েল পরবর্তী স্তরের নেতৃত্বকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
এদিকে ইসরায়েলি সেনা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সীমান্তে পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করে এবং সেগুলোর পরিসর বাড়ায়। সীমান্তঘেঁষা শিয়া-অধ্যুষিত শহর ও গ্রামগুলো প্রায় পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হিজবুল্লাহর একটি সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকা এখন ফুটবল মাঠের মতো সমতল। সেখানে একটি ভবনও দাঁড়িয়ে নেই। নেই কোনো বাড়ি কিংবা মসজিদ।
এত কিছুর পরও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পাল্টা জবাব দেখা যায়নি। এতে অনেকের ধারণা হয়, দলটি হয় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে, নয়তো প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস নেই। তবে বাস্তবে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক কাঠামোয় বড় ধরনের পুনর্গঠন চালাচ্ছিল। লক্ষ্য ছিল, আবারও ইসরায়েলকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করা।
হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে বলে, তাদের সামরিক শাখা আগের তুলনায় অতিরিক্ত বড় ও জটিল হয়ে পড়েছিল। এটি ছিল ধীরগতির। কার্যকরভাবে পরিচালনা করাটাও কঠিন ছিল। যুদ্ধ সেই দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তোলে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধাপে ধাপে পুরো সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় হিজবুল্লাহ।
যুদ্ধে গেরিলা কৌশল
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো জানিয়েছে, পুনর্গঠনের সময় প্রতিটি ইউনিট ও বিভাগকে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়াত হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়াহর গেরিলা যুদ্ধকৌশল অনুসরণ করা হয়। প্রতিটি ইউনিটকেই আগেভাগে নির্ধারিত বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
যুদ্ধের সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়াই যাতে এসব ইউনিট কার্যকরভাবে অভিযান চালাতে পারে, সে লক্ষ্যে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ছিল—গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। প্রয়োজন হলে যোদ্ধারা নিজেদের অবস্থান ছেড়ে পিছু হটতে পারবেন।
এ বছরের মার্চে এই নতুন কৌশলের প্রথম বড় পরীক্ষা হয়। সবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করেছে। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো বলে, যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়। খামেনি হিজবুল্লাহর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা ছিলেন। লেবাননের অনেক শিয়া মুসলিম তাঁকে অনুসরণ করতেন। খামেনি নিহত হওয়ার জবাবে সীমান্ত পেরিয়ে ছয়টি রকেট ছোড়া হয়।
হিজবুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের আড়ালে লেবাননে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালাতে যাচ্ছে ইসরায়েল—তাঁদের ধারণা ছিল এটা। তাই আগাম পদক্ষেপ হিসেবে ওই রকেট হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একটি সূত্রের ভাষ্য, মার্চে রকেট ছোড়ার সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেমের ছিল।
এ সিদ্ধান্তে ইরানের সমর্থন ছিল বলেও সূত্রটি দাবি করেছে। আরেকটি সূত্রের দাবি, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার জবাব হিজবুল্লাহর আরও আগেই দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছিল ইরান। তবে হিজবুল্লাহ সে সময় ভিন্ন হিসাব কষেছিল বলে সূত্রটি জানায়।
ভিডিও গেম ও ড্রোন
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন ‘গেমিং ক্যাফের’ ছড়াছড়ি। জেরুজালেম, তেহরান কিংবা কায়রো—সবখানেই দেখা যায় এমন দৃশ্য। অন্ধকার ঘরে তামাকের ধোঁয়ার মধ্যে বসে তরুণেরা ফিফা বা ফার্স্ট-পারসন ভিউ (এফপিভি) শুটিং গেমের প্রতিযোগিতায় মত্ত।
বৈরুতের দাহিয়ায় হিজবুল্লাহর অভিজ্ঞ সদস্যরা এসব দেখে হতাশ হতেন। তাঁদের ধারণা ছিল, মার্কিন প্রোগ্রামারদের বানানো কাল্পনিক যুদ্ধের খেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছে নতুন প্রজন্ম। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করা প্রবীণ যোদ্ধাদের কাছে মনে হতো, তরুণেরা আগের মতো কঠোর নেই।
তবে তাঁরা হয়তো তখনো জানতেন না, এ তরুণেরাই পরের যুদ্ধে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবেন।
২০২৬ সালের মার্চে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং এর বাইরের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। তাঁরা প্রায় ৩০০টি অবস্থান গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত বাড়ি, পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটি, এমনকি ক্রুসেডের আমলের একটি দুর্গও।
আগের যুদ্ধগুলোয় তীব্র লড়াইয়ের কেন্দ্র ছিল বিনতে জুবাইলের মতো শহর। কিন্তু নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ সেসব এলাকা ছেড়ে দেয়। তবু নিরাপদ ছিল না ইসরায়েলি বাহিনী। ২ মার্চের পর থেকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে। লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণে প্রায় ২০ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।
হিজবুল্লাহর লক্ষ্য ছিল, ইসরায়েল যেন কোনো অবস্থান স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত করতে না পারে। ২০২৪ সালে সীমান্তের পাঁচটি ঘাঁটির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল। এ কৌশল বাস্তবায়নে হিজবুল্লাহ এখন ড্রোনের ওপর বেশি নির্ভর করছে। ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিটি বড় বড় সংঘাতে নতুন কোনো অস্ত্র সামনে আনার প্রবণতা রয়েছে হিজবুল্লাহর। এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের কৌশলগত উদ্ভাবনী সক্ষমতার বার্তা দিতে চায়।
২০০৬ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ব্যবহার করেছিল করনেট অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ইসরায়েলের সাঁজোয়া যান ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের কৌশলগত চমক তৈরি হয়। এবার তারা ব্যবহার করছে এফপিভি (ফার্স্ট পারসন ভিউ) ড্রোন। এই ড্রোন ফাইবার-অপটিক কেব্লের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা সংকেত ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বল্পমূল্যের কিন্তু প্রাণঘাতী এই ড্রোনকে ‘বড় হুমকি’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ড্রোন লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলা চালায়। একই সঙ্গে পুরো হামলার ভিডিও ধারণ করে।
ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের মতো লেবাননেও ভিডিও গেম সংস্কৃতি থেকে দক্ষ ড্রোনচালক তৈরি হয়েছে। অন্তত দুটি সূত্র জানিয়েছে, এখন হিজবুল্লাহর ড্রোনচালকদের বড় অংশই লেবাননের গেমাররা।
আরও পড়ুনইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর ভেতরের গল্প
০৯ জুন ২০২৬অস্ত্রের আধুনিকায়ন
প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ এ ধরনের ড্রোন ব্যবহার করেছিল। তবে এরপর এর উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ড্রোনগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন এগুলো আরও বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে। ফলে ইসরায়েলের মারকাভা ট্যাংকের জন্য এগুলো আরও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
হিজবুল্লাহর সুবিধা হলো, ড্রোন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ তাদের কাছে আগে থেকেই ছিল। ২০২৪ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ প্রথমবারের মতো আলমাস-১ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। এটি ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র। এতে টেলিভিশন ও তাপচিত্রনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থা রয়েছে।
হিজবুল্লাহর দাবি, এটি ইসরায়েলের একটি স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি আগেই তাদের হাতে এসেছিল। তবে একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। এতে ব্যবহৃত ফাইবার-অপটিক কেব্লের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার। কাজেই আন্তসীমান্ত সংঘর্ষে ক্ষেপণাস্ত্রটির কার্যকারিতা কিছুটা সীমিত ছিল।
চলতি বছরের যুদ্ধের বেশির ভাগই লেবাননের সীমান্তের ভেতরে হয়েছে। তাই আলমাস ক্ষেপণাস্ত্রের স্বল্পপাল্লা নিয়ে বড় কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। আলমাসের জন্য মজুত রাখা বিপুল পরিমাণ ফাইবার-অপটিক কেব্ল পরে এফপিভি ড্রোন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুণগত সামরিক সুবিধা পেতে নিজেদের সশস্ত্র শাখাকে শক্তিশালী করেছিল হিজবুল্লাহ। এখন কৌশল বদলেছে। প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভর করা হচ্ছে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ ড্রোন।
বর্তমানে কাগজে-কলমে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে। ১৬ এপ্রিল থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। যদিও দুপক্ষের মধ্যে হামলা, পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাত থেকে লেবাননকে আলাদা রাখা।
যদিও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাভাবিক জীবন দ্রুত ফিরবে, এমন কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হিজবুল্লাহর সূত্র ও লেবাননের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি যুদ্ধের শেষ নয়, সাময়িক বিরতি মাত্র।
আরও পড়ুনইরান যুদ্ধে হিজবুল্লাহ যেভাবে ‘ফিনিক্স পাখি’র মতো জেগে উঠল
২১ মার্চ ২০২৬আগের সেই হিজবুল্লাহ নেই
২০২৬ সালের আগস্টে এসে হিজবুল্লাহর অবস্থান কী?
এটা নিশ্চিত, হিজবুল্লাহ সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে ছোট ইউনিটভিত্তিক গেরিলা কৌশলে ঝুঁকে যাওয়ার কারণে তারা কিছুটা কার্যকারিতা ধরে রাখতে পেরেছে।
সর্বশেষ দুটি যুদ্ধে হিজবুল্লাহর কতজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন, তার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নেই। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ধারণা, নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে হতে পারে। তাঁদের বেশির ভাগই ২০২৪ সালের যুদ্ধে নিহত হন।
হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, ২০২৩ সালে যে হিজবুল্লাহ ছিল, এখন আর সেই হিজবুল্লাহ নেই। সূত্রটি বলে, একসময় হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট ভান্ডার ছিল। সীমান্তজুড়ে শক্ত অবস্থান ছিল। তারা ইসরায়েলের জন্য বাস্তব ও বড় হুমকি ছিল। অঞ্চলজুড়ে, এমনকি আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত সরবরাহ ও সাহায্য পাওয়ার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তাদের ছিল।
একসময় গ্যালিলি অঞ্চলে ঢোকার যে পরিকল্পনা বা আকাঙ্ক্ষা হিজবুল্লাহর ছিল, এখন আর তা নেই। হিজবুল্লাহর একটি সূত্র বলছে, এখন তাদের উদ্দেশ্য জেরুজালেমকে নয়, বরং লেবাননকে রক্ষা করা।
ঘনিষ্ঠ সূত্রটি আরও বলে, নাঈম কাসেমের বিষয়ে অনেকেই বলেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু রূপান্তরের সময়টাতে তিনি ধীরে ধীরে সংগঠনকে আবার গড়ে তুলছেন।
আরও পড়ুনইসরায়েলের ‘ছায়াশত্রু’ হিজবুল্লাহপ্রধান হাসান নাসরুল্লাহ কে, কী তাঁর ভূমিকা
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪নাঈম কাসেমের অবদান
নানামুখী তীব্র চাপের মধ্যেও হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব টিকে আছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও দেখাতে পেরেছে। নাঈম কাসেমকে মহাসচিব করার সিদ্ধান্তটি শুরুতে অনেকের বিদ্রূপের মুখে পড়েছিল।
হাসান নাসরুল্লাহর মতো ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নাঈম কাসেমের নেই। আবার হাশেম সাফিউদ্দিনের মতো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বও তাঁর নেই। নাসরুল্লাহ ও সাফিউদ্দিন দুজনই ‘সাইয়্যেদ’ ছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর বংশধর বলে দাবি করতেন।
তবু নাঈম কাসেম কঠিন সময়ে হিজবুল্লাহকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিজেও ইসরায়েলের হত্যাচেষ্টার লক্ষ্যবস্তু। এ বছরের শুরুর দিকে নাঈম কাসেম সংগঠনে বড় ধরনের পুনর্গঠন করেন। নিজের নেতৃত্বের ধরন অনুযায়ী দলকে সাজান। প্রভাবশালী কয়েকজনকে পেছনের সারিতে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়া বড় কোনো সংকট ছাড়াই শেষ হয়।
হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, নাঈম কাসেম প্রমাণ করেছেন, তিনি সংগঠনকে ধরে রাখতে জানেন। পুরো দলকে পুনর্গঠন ও ঐক্যবদ্ধ করতেও সক্ষম তিনি।
হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল সামনাসামনি দেখা করা। কোনো ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়নি। সম্ভবও ছিল না। তাঁদের এভাবে দেখা করার মূল্য উদ্দেশ্য দুটি। এক, সংকটময় সময় কাটিয়ে হিজবুল্লাহকে আবারও সক্রিয় করার পরিকল্পনা করা। দুই, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করা।হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন সময় নিহত হয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন প্রজন্মের কয়েকজন নেতা এখনো দায়িত্বে আছেন। তাঁদের মধ্যে নাঈম কাসেম ও হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লকের প্রধান মোহাম্মদ রাদ আছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এখন সামনে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে হাসান ফাদলাল্লাহ অন্যতম। সময়ের সঙ্গে সংগঠনে তাঁর প্রভাব বেড়েছে।
এ বিষয়ে নাওয়াফ মুসাওয়ি বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের নেতারা সব সময় নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই প্রতিটি দায়িত্বশীল নেতার বিকল্প হিসেবে আরেকজনকে প্রস্তুত রাখা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম প্রজন্মের নেতারা নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতারাও নিহত হয়েছেন। তৃতীয় প্রজন্মের অনেক নেতা আর নেই। তবু প্রতিরোধ চলবে।’
মুসাভির ভাষ্য, ইসরায়েলের গোয়েন্দাদের কাছে হিজবুল্লাহর প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয় প্রজন্মের নেতাদের সম্পর্কে বিশদ তথ্য ছিল। কিন্তু এখন তাঁরা এমন একটি নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি, যাঁদের সম্পর্কে ইসরায়েলিদের কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই।
আরও পড়ুনলেবানন-ইসরায়েল চুক্তি যেভাবে পরের যুদ্ধের পথ তৈরি করছে
০২ জুলাই ২০২৬ইরানের ভূমিকা
এমন দুর্বল অবস্থায় অনেকের মনে হতে পারে, হাসান নাসরুল্লাহর সময়ের তুলনায় এখন হিজবুল্লাহকে পরিচালনায় ইরানের ভূমিকা বেড়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন হিজবুল্লাহর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে ইরানি উপদেষ্টার সংখ্যা কম।
হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলে, ‘আমার মনে হয়, এই সময়ে ইরানের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। এর কারণ মূলত সরবরাহ–সংক্রান্ত জটিলতা। সিরিয়া এখন আর ইরানিদের জন্য উন্মুক্ত নয়। আকাশপথেও যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।’
রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যায়ে সমন্বয় রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র আরও জানায়, এই সমন্বয় এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। সূত্রটির মতে, এ অঞ্চলের এবং হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের ওপর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের আলোচনা ও সংঘাতের গতিপ্রকৃতির ওপর।
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ তেহরান ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান এমন কোনো সমঝোতায় যেতে রাজি নয়, যেখানে লেবাননের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে না—এমনটাই মনে করছে হিজবুল্লাহ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
আরও পড়ুনইসরায়েল সেনা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর
০৪ জুন ২০২৬বদলাচ্ছে রাজনৈতিক বাস্তবতা
লেবানন রাষ্ট্রের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। গত ২ মার্চ ইসরায়েলের ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর হামলার পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। এরপর লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর সামরিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করেন। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। এতে রাষ্ট্র ও হিজবুল্লাহর দূরত্ব বেড়ে যায়।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর হিজবুল্লাহর ভেতরে ভবিষ্যৎ নিয়ে জোরালো আলোচনা হয়েছে। সশস্ত্র আন্দোলন থেকে শুধু রাজনৈতিক দলে রূপ নেওয়া যায় কি না, সেটিও আলোচনায় ছিল।
হিজবুল্লাহ এরই মধ্যে লেবাননের পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল। বহু বছর ধরে তারা দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠার সময় হিজবুল্লাহ ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধী। লেবাননের সাম্প্রদায়িক ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল।
সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা ও শক্তি ধরে রাখতে হিজবুল্লাহ সেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মতোই আচরণ করতে শুরু করেছে, যাদের একসময় তারা ঘৃণা করত। ২০১৯ সালের সরকারবিরোধী গণ–আন্দোলনের সময়ও হিজবুল্লাহ বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষ নেয়। তারা আন্দোলনকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেয়। এমনকি আন্দোলনকারীদের অবস্থানস্থল ভেঙে দিতে নিজেদের সমর্থকদেরও পাঠায়।
আরও পড়ুনট্রাম্পের চাপ উড়িয়ে ইসলামপন্থী শারার সিরিয়া কি হিজবুল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ার পথে
০৫ জুলাই ২০২৬নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে চাপ
হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, সংগঠনের ভেতরে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি কীভাবে হতে পারে বা এর ফলাফল কী—এসব নিয়েও কথা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ চলাকালে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাঈম কাসেমের জন্য কোনো বিষয়ই একেবারে নিষিদ্ধ নয়।’
যদিও হিজবুল্লাহর ভেতরে এমন একটি অংশ আছে, যারা মনে করে, নিরস্ত্রীকরণ কিংবা রাষ্ট্র বা পশ্চিমাদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত হবে না। এমনই একটি সূত্র বলে, ‘আমার মনে হয়, হিজবুল্লাহর আবার আশির দশকের মতো হয়ে ওঠা উচিত। ব্যাপক বোমা হামলা ও হত্যার পথে ফিরে যাওয়া উচিত। তবে এটা মোটেও সহজ নয়।’
ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশ লেবাননের সেনাবাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। এটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। লেবাননে অনেকের শঙ্কা, এমন হলে দেশে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে।
এমনকি দ্য ইকোনমিস্ট সাময়িকী গত মাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রতি আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত হতে পারে না। সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।’
এ বিষয়ে মুসাওয়ি বলেন, ‘আমার মনে হয় না, লেবাননে কেউ দখলদারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে থাকা শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে। কারণ, তা হলে লেবানন ধ্বংস হওয়ার আগেই তাদের নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনতে হবে।’
লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতাকে অনেকে আত্মসমর্পণের শামিল মনে করছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটি নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করেছেন। তবু এই সমঝোতা হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে আরও কিছুটা সময়–সুযোগ করে দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
** মিডল ইস্ট আইয়ে ৫ আগস্ট প্রকাশিত নিবন্ধটি লিখেছেন সংবাদমাধ্যমটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি দানিয়েল হিলটন এবং বৈরুতভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক আদম শামসেদ্দিন।
অনুবাদ করেছেন অনিন্দ্য সাইমুম।
আরও পড়ুনলেবাননকে চুক্তির ফাঁদে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র কি দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের দখলদারত্বের সুযোগ করে দিল
০১ জুলাই ২০২৬
সময়টা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিক। হিজবুল্লাহ তখন চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি পার করছে। হিজবুল্লাহ সদর দপ্তরে বোমা ফেলে ইসরায়েল। একটি, দুটি, তিনটি নয়; পরপর ৮০টি। ধ্বংস হয়ে যায় কার্যালয়। হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের অনেকে নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সংগঠনের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ ছিলেন।
ধারণা করা হয়, ইসরায়েলিরা হাসান নাসরুল্লাহর অবস্থান শনাক্ত করে ফেলেছিল। মাটির ৬০ ফুট নিচেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না। হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের সন্দেহ ছিল, ইসরায়েল তাঁদের মুঠোফোনে আড়ি পাতছে। তাঁরা কী বলছেন এবং কী করছেন—সবই জেনে যাচ্ছে। এমনকি হাজারো পেজার ও ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরক বসানো হয়েছিল। এতে হিজবুল্লাহর মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহর বেঁচে থাকা কমান্ডারেরা মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধ করে দেন। তাঁরা মোটরসাইকেল ও স্কুটারে চলাচল শুরু করেন। তাঁরা লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের হারেত হরেইক ও শিয়াহসহ বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হন। সম্মিলিতভাবে এই এলাকা ‘দাহিয়েহ’ নামে পরিচিত।
হিজবুল্লাহর কমান্ডারেরা মনে করছিলেন, সবকিছুই ফাঁস হয়ে গেছে। হাসান নাসরুল্লাহর মতো সর্বোচ্চ নেতা যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে তাঁদের আর কেউ নিরাপদ নন।
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ তাদের সর্বশেষ বিকল্প পরিকল্পনাটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি এমন একটি পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়ন করতে হবে—এমনটা হিজবুল্লাহ কমান্ডারেরা ভাবেননি। দাহিয়েহ এলাকায় কমান্ডারেরা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা শুরু করেন। বেকারি, ব্যাংকের কোনো শাখা, এমনকি মুঠোফোনের দোকান—কোথায় দেখা করেননি তাঁরা।
ওই সময় হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল এভাবে সামনাসামনি দেখা করা। কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়নি। সম্ভবও ছিল না। তাঁদের এভাবে দেখা করার মূল্য উদ্দেশ্য দুটি। এক, সংকটময় সময় কাটিয়ে হিজবুল্লাহকে আবারও সক্রিয় করার পরিকল্পনা করা। দুই, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করা।
লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতাকে অনেকে আত্মসমর্পণের শামিল মনে করছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটি নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করেছেন। তবু এই সমঝোতা হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে আরও কিছুটা সময়-সুযোগ করে দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।আর এভাবেই শুরু হয় হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ধ্বংসের মুখ থেকে উঠে আসে হিজবুল্লাহ। সংগঠনের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়।
হিজবুল্লাহর এই ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন এমন সাতজনের সঙ্গে কথা বলেছে মিডল ইস্ট আই। সংবাদমাধ্যমটি কথা বলেছে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্র, লেবাননের রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন আরব কূটনীতিকের সঙ্গেও। তাঁদের প্রায় সবাই নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
তাঁদের ভাষ্য, শুরুর দিকে বড় ধরনের সংশয় থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে হিজবুল্লাহ। সামরিকভাবে বড় ধাক্কা খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে হিজবুল্লাহ কীভাবে নিজেদের বাহিনীকে পুনর্গঠন করেছে, সেই বিষয়ে তাঁরা বিস্তারিত জানিয়েছেন। এমনকি হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়েও তাঁরা কথা বলেছেন।
২০২৩ সালের পর থেকে লেবাননে ইসরায়েলিদের দুটি যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা, হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সংকট, শিয়াদের একটি অংশের অসন্তোষসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে এসব ব্যক্তির কথায়, মতামতে।
ইসরায়েলে হামলা ‘ভুল’ ছিল
পর্দার অন্তরালে থাকা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের অনেকেই মনে করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালানোটা বড় আর ঐতিহাসিক ভুল ছিল। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানায়, হামলার সিদ্ধান্ত সরাসরি হাসান নাসরুল্লাহর কাছ থেকে এসেছিল। এমনকি হিজবুল্লাহর সর্বোচ্চ নির্বাহী পরিষদ শুরা কাউন্সিলের ভেতরেও এ নিয়ে ভিন্নমত ছিল।
চলতি মাসের শুরুর দিকে এ বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের আর্মি রেডিও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর ধরে হামাস আর হিজবুল্লাহর মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উদ্ধার করা বলে দাবি করা কিছু অভ্যন্তরীণ নথির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে সমন্বিত ও আকস্মিক হামলায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, সীমান্ত ও সম্পদ বিভাগের প্রধান এবং সাবেক সংসদ সদস্য নাওয়াফ মুসাওয়ি বলেন, ‘এসবই কেবল প্রচার। বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।’
তবে নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা হিজবুল্লাহর কয়েকজন যোদ্ধার মতে, ইসরায়েলের ওই প্রতিবেদনে কিছুটা সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে।
বছরের পর বছর ধরে ইরান এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোট একটি কৌশল গড়ে তুলেছে। এ জোটে রয়েছে কয়েকটি রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই কৌশলের নাম ‘ইউনিটি অব ফ্রন্টস’। এর লক্ষ্য চারদিক থেকে হুমকি সৃষ্টির মাধ্যমে ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলা।
সোলাইমানি–নাসরুল্লাহর ভূমিকা
এই কৌশলের মূলে ছিলেন দুজন ব্যক্তি। দুজনই এখন প্রয়াত। তাঁদের একজন ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। অন্যজন হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ। নিজের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব, সামরিক সাফল্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নাসরুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। আরবিতে সাবলীল কাসেম সোলাইমানি বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞ ছিলেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অভিজাত কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন তিনি।
সোলাইমানি ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম তদারকি করতেন। প্রয়োজনে সরাসরি নির্দেশনাও দিতেন। এর মধ্যে ছিল ইরাকের শিয়া আধাসামরিক বাহিনী, ইয়েমেনের হুতিরাও। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছেও তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ছিল।
সোলাইমানি আর নাসরুল্লাহর কর্মতৎপরতার মিল বোঝাতে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ২০১২ সালের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে। সূত্রটির দাবি, ওই সময় নাসরুল্লাহকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছিলেন সোলাইমানি। উদ্দেশ্য ছিল, সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে সমর্থন দেওয়া।
সূত্রটি জানায়, সোলাইমানির এমন প্রস্তাবের জবাবে নাসরুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের সিরিয়ায় যাওয়া উচিত। তবে আমাদের আরও আগেই যাওয়া উচিত ছিল।’
বাঁকবদলের মুহূর্ত
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। এ ঘটনাকে বড় বাঁকবদলের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোট তাদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত নেতৃত্বকে হারায়। ‘ইউনিটি অব ফ্রন্টস’ কৌশলও ধীরে ধীরে গতি হারাতে শুরু করে।
হিজবুল্লাহর অন্তত তিনটি সূত্রের দাবি, মূলত এ কারণে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস এককভাবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দুটি সূত্র জানায়, ওই হামলার পর ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দোল্লাহিয়ান বৈরুতে যান। ওই সফরের সময় তিনি নাসরুল্লাহকে জানান, তেহরান যুদ্ধে (গাজা যুদ্ধ) শুধু নৈতিক সমর্থন দিতে প্রস্তুত।
আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের নেতারা সব সময় নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই প্রত্যেক দায়িত্বশীল নেতার বিকল্প হিসেবে আরেকজনকে প্রস্তুত রাখা হয়নাওয়াফ মুসাওয়ি, হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।ইরানের নেতাদের মতো নাসরুল্লাহ নিজেও আশঙ্কা করছিলেন, বড় ধরনের হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এ কারণে তিনি সীমিত পরিসরে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাই তিনি ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর ইসরায়েলের দিকে সীমিত পরিসরে রকেট হামলার নির্দেশ দেন। ওই সময়ে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চলছিল।
তবে হাসান নাসরুল্লাহর বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাদওয়ান ফোর্সের বিশেষ অভিযান ইউনিটের প্রধান ইব্রাহিম আকিল। বিরোধিতাকারীদের ভাষ্য ছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে নামলে পুরো শক্তি নিয়েই নামতে হবে। আর সেটা সম্ভব না হলে যুদ্ধে জড়ানো একেবারে উচিত হবে না।
বড় সংঘর্ষ এড়ানো
এরপর বছরখানেক ধরে লেবানন–ইসরায়েল সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল। এ সময়ে দুপক্ষের মধ্যে ৭ হাজার রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং বিমান ও কামানের গোলাবর্ষণ হয়।
এসব হামলা চলে পুরো ‘ব্লু লাইনে’। জাতিসংঘ নির্ধারিত এ সীমানা কার্যত লেবানন-ইসরায়েলের সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে প্রাণহানির দিক থেকে বড় ক্ষতি হয় লেবাননের। দেশটিতে ২ হাজার মানুষ নিহত হন। ইসরায়েলের সীমান্তের দক্ষিণে নিহত হন ৭০ জন।
যদিও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনাকে উত্তর সীমান্তে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। এতে গাজার পাশাপাশি আরেকটি ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে হয় ইসরায়েলকে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার ইসরায়েলি বাসিন্দাকে সরিয়ে নিতে হয়।
দুপক্ষ শুরুর দিকে বেশকিছু অলিখিত সীমার মধ্যে থেকে হামলা চালায়। উভয় পক্ষের মধ্যে এমন এক ধরনের বোঝাপড়া ছিল, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জবাব একই ধরনের হামলায় দেওয়া হবে। হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ সতর্ক করে বলেছিলেন, বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে তেল আবিবে হামলা চালিয়ে।
ধীরে ধীরে সেই সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে ইসরায়েল। সেই সঙ্গে হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, সেটিও পরীক্ষা করতে থাকে ইসরায়েলি বাহিনী। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দাহিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সালেহ আল-আরুরি নিহত হন।
এর প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের মাউন্ট মেরনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক রকেট হামলা চালায়। হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র বলেছে, তেল আবিবের বদলে ওই ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার কারণ, আরুরি ছিলেন ফিলিস্তিনি, লেবাননের নাগরিক নন। কাজেই এর জবাবও সীমিত রাখা হয়েছিল।
ছয় মাস পর হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ফুয়াদ শুকুর ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন। এর জবাবে ইসরায়েলের দিকে এক হাজার রকেট ছোড়ার পরিকল্পনা করেছিল হিজবুল্লাহ। কিন্তু ইসরায়েল আগে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর বেশির ভাগ রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র ধ্বংস করে দেয়।
পেজার–ওয়াকিটকি বিস্ফোরণ
হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের দাবি, পাল্টা জবাবের পরিকল্পনার পুরোটা সময় আড়ি পেতে শুনেছিল ইসরায়েল। তাই আগেই হামলা চালাতে পেরেছিল দেশটি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা আর গোয়েন্দা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল হাজারো পেজার ও শত শত ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরণ ঘটায়।
ইসরায়েলের সমর্থকেরা এ অভিযানকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দেন। অনেকেই একে জেমস বন্ড চলচ্চিত্রের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন। হিজবুল্লাহর সরবরাহ ব্যবস্থায় ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ করে যোগাযোগযন্ত্রে বিস্ফোরক বসিয়েছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।
এসব বিস্ফোরণে প্রায় ৪০ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েক হাজার মানুষ। মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এই অভিযানকে ‘আমাদের মিশন বাস্তবায়নের একটি স্পষ্ট উদাহরণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। হামলার স্মরণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সোনার তৈরি একটি পেজার উপহার দেন।
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো স্বীকার করে নিয়েছে, এটি ছিল তাদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। তবে তাদের দাবি, শেষ পর্যন্ত এই অভিযান সফল হয়নি।
১৭ সেপ্টেম্বর বিস্ফোরিত পেজারগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর মতে, প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ওয়াকিটকি। এগুলো আকারে বড় ছিল। বেশি বিস্ফোরক রাখা হয়েছিল। মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা এগুলো ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে পেজার মূলত বার্তা পাঠানো বা সদস্যদের ডেকে পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। এগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অযোদ্ধা কর্মকর্তাদের কাছে ছিল।
হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের ভাষ্য, তাদের সামরিক কাঠামো ইরানের আইআরজিসির আদলে গড়ে তোলা। এ কাঠামোয় হিজবুল্লাহর একেকজন কমান্ডারের বিপরীতে একজন করে সমকক্ষের ইরানি কর্মকর্তা থাকেন। হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাঁদের উপপ্রধানেরা নিহত হওয়ার পর সেসব ইরানি কর্মকর্তা শূন্যতা পূরণে লেবাননে আসেন।সূত্রগুলোর দাবি, ২০২২ সাল থেকে হিজবুল্লাহর কাছে ত্রুটিযুক্ত পেজার সরবরাহ করতে শুরু করে ইসরায়েল–সমর্থিত কোম্পানি। হামলার সময় এমন প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পেজার ছিল। ওয়াকিটকি নিয়ে অভিযানটি এক দশক ধরে অত্যন্ত গোপনে চলছিল। দুটি সূত্রের দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বরের অভিযানের সময় ১৫ হাজার ওয়াকিটকি গুদামে সংরক্ষিত ছিল। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেগুলো তখন বন্ধ অবস্থায় ছিল।
এ সংখ্যাগুলো মোসাদের একজন এজেন্টের আগে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলের একটি গোপন ছদ্মবেশী কোম্পানি হিজবুল্লাহকে প্রায় ১৬ হাজার ওয়াকিটকি সরবরাহ করেছে। ওই সময় হামলায় হাজারো পেজার ধ্বংসের পরদিন চালানো অভিযানে মাত্র কয়েক শ ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়েছিল। যদিও ওয়াকিটকির বিস্ফোরণের ক্ষতি ছিল বেশি।
দ্বিতীয় দিনের হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হন। আর প্রথম দিনের হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১২ জন।
হিজবুল্লাহর দুটি সূত্রের দাবি, তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল। কারণ, মোসাদ হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ আলোচনা আড়ি পেতে শুনছিল। তাদের ধারণা ছিল, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই হিজবুল্লাহ ও ইরান বুঝতে পারে, যুদ্ধ আর সীমিত রাখা সম্ভব হবে না। এরপর বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেই বৈঠকে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে স্থল অভিযানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এর আগে হিজবুল্লাহর একটি পরিদর্শন দল তাদের পেজারগুলো নিয়ে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করছিল। এগুলো নিরাপত্তাসংক্রান্ত অন্তত দুটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তারপরও সন্দেহ কাটেনি। তাই আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য কয়েকটি নমুনা ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
হিজবুল্লাহ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এ সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। আর দেশটি আগেই হিজবুল্লাহর ওপর আক্রমণ করে বসে।
হিজবুল্লাহর বিপর্যয়ের শুরু
টানা ৬৬ দিন ধরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে জোরালো বিমান ও স্থল অভিযান চালায় ইসরায়েল। একের পর এক আঘাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে হিজবুল্লাহ। এ অভিযানে শুধু হাসান নাসরুল্লাহ নন, তাঁর চাচাতো ভাই ও উত্তরসূরি হাশেম সাফিউদ্দিন নিহত হন। ইব্রাহিম আকিল ও তাঁর নেতৃত্বাধীন রাদওয়ান ফোর্সের কয়েকজন কমান্ডারসহ হিজবুল্লাহর সামরিক নেতৃত্বের অনেকে নিহত হন।
ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর প্রায় পুরো ইউনিট ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংস করা হয় গোলাবারুদের গুদামও। হামলায় হিজবুল্লাহর যেসব কমান্ডার বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই মুঠোফোন ব্যবহার করেননি। এ কারণে তাঁরা ইসরায়েলের নজরদারি এড়াতে সক্ষম হন।
এ পরিস্থিতিতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ইউনিটে লড়াই চালিয়ে যান হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। তাঁরা ইসরায়েলিদের অগ্রযাত্রা ধীর করে দেন। উত্তরাঞ্চলে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর কতটা ভয়াবহ আঘাত নেমে এসেছে, সে সম্পর্কে তাঁদের অনেকেরই ধারণা ছিল না।
দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা যখন ইসরায়েলি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখছিলেন, তখন ঘনিষ্ঠ এই মিত্রকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে তেহরান।
হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের ভাষ্য, তাদের সামরিক কাঠামো ইরানের আইআরজিসির আদলে গড়ে তোলা। এ কাঠামোয় হিজবুল্লাহর একেকজন কমান্ডারের বিপরীতে একজন করে সমকক্ষের ইরানি কর্মকর্তা থাকেন। হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাঁদের উপপ্রধানেরা নিহত হওয়ার পর সেসব ইরানি কর্মকর্তারা শূন্যতা পূরণে লেবাননে আসেন।
একটি সূত্র জানায়, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানির উত্তরসূরি ইসমাইল কানি। কুদস ফোর্সের লেবানন শাখার প্রধান আব্বাস নিলফোরুশান হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে হামলার সময় হাসান নাসরুল্লাহর সঙ্গে নিহত হন।
হিজবুল্লাহর বিশ্বাস, তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা ইসরায়েলকে বিস্মিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত এ কারণে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় বলে সংগঠনের সূত্রগুলোর দাবি। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ভাষ্য, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে এবার রাজনৈতিকভাবে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা যাবে। এর ফলে সেনাদের জীবন আর ঝুঁকিতে ফেলতে হবে না।
লেবানন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ধারণা জোরালো হতে থাকে। সেটি হলো, হিজবুল্লাহ কার্যত ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে। অনেকে মনে করেন, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে, কার্যত তারও কম রয়েছে। একই সঙ্গে এই মতও জোরালো হয়, লেবাননকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে হিজবুল্লাহর অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে হবে।
আরব এক কূটনীতিকের ভাষ্য, হিজবুল্লাহর এমন দুর্বল অবস্থানে সৌদি আরব খুশি ছিল। ওই কূটনীতিকের দাবি, মিসর ও ফ্রান্স হিজবুল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করে, সবচেয়ে শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। এই দুই দেশ মনে করত, হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের উচিত সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ নেওয়া।
টিকে থাকার লড়াই
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ভাষ্য, ওই সময় তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল টিকে থাকা। এ কারণে তাঁরা বড় ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। এর মধ্যে সিরিয়ায় বাশার আল–আসাদের সরকারের পতন হিজবুল্লাহকে আরও দুর্বল করে দেয়। আল–আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এক দশক ধরে লড়েছে হিজবুল্লাহ। এতে হিজবুল্লাহ জনবল, অর্থ ও আরব বিশ্বের মানুষের সমর্থনের অনেকটা হারিয়েছে।
যাই হোক, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দিনই সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়। তখন আসাদকে আবারও রক্ষা করার মতো অবস্থায় ছিল না হিজবুল্লাহ। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বলা হয়েছিল, লিতানি নদীর দক্ষিণ থেকে হিজবুল্লাহর বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে। পরে বিভিন্ন দেশ ও লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলো দাবি তোলে, হিজবুল্লাহকে আরও উত্তরে সরে যেতে হবে।
একজন আরব কূটনীতিক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আসাদের পতনের পর অবস্থান বদলে যায়। দাবি ওঠে, শুধু লিতানির দক্ষিণ নয়, উত্তর দিক থেকেও হিজবুল্লাহকে সরে যেতে হবে। অথচ আমরা সবাই জানতাম, এটি মূল চুক্তির অংশ ছিল না।’ এই কঠোর অবস্থান হিজবুল্লাহকে আরও অনড় করে তোলে।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের ভাষ্য, ‘২০২৪ সালের নভেম্বরের পর হিজবুল্লাহ সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছিল। এমনকি জুনে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধেও তারা অংশ নেয়নি। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং লেবাননের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য কোনো রাজনৈতিক পথ না দেওয়ায় হিজবুল্লাহ আর নমনীয় অবস্থানে থাকতে পারেনি।
আত্মরক্ষা থেকে আক্রমণ
খোলা চোখে দেখে মনে হতে পারে, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতির সময় হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, পড়ছে। যদিও ইসরায়েল একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। এ সময়ে প্রায় ৩ হাজার বিমান ও ড্রোন হামলা এবং গোলাবর্ষণ করা হয়। হিজবুল্লাহর বেশির ভাগ কমান্ডার এবং তাঁদের উত্তরসূরিদের হত্যার পর ইসরায়েল পরবর্তী স্তরের নেতৃত্বকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
এদিকে ইসরায়েলি সেনা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সীমান্তে পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করে এবং সেগুলোর পরিসর বাড়ায়। সীমান্তঘেঁষা শিয়া-অধ্যুষিত শহর ও গ্রামগুলো প্রায় পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হিজবুল্লাহর একটি সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকা এখন ফুটবল মাঠের মতো সমতল। সেখানে একটি ভবনও দাঁড়িয়ে নেই। নেই কোনো বাড়ি কিংবা মসজিদ।
এত কিছুর পরও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পাল্টা জবাব দেখা যায়নি। এতে অনেকের ধারণা হয়, দলটি হয় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে, নয়তো প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস নেই। তবে বাস্তবে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক কাঠামোয় বড় ধরনের পুনর্গঠন চালাচ্ছিল। লক্ষ্য ছিল, আবারও ইসরায়েলকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করা।
হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে বলে, তাদের সামরিক শাখা আগের তুলনায় অতিরিক্ত বড় ও জটিল হয়ে পড়েছিল। এটি ছিল ধীরগতির। কার্যকরভাবে পরিচালনা করাটাও কঠিন ছিল। যুদ্ধ সেই দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তোলে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধাপে ধাপে পুরো সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় হিজবুল্লাহ।
যুদ্ধে গেরিলা কৌশল
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো জানিয়েছে, পুনর্গঠনের সময় প্রতিটি ইউনিট ও বিভাগকে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়াত হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়াহর গেরিলা যুদ্ধকৌশল অনুসরণ করা হয়। প্রতিটি ইউনিটকেই আগেভাগে নির্ধারিত বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
যুদ্ধের সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়াই যাতে এসব ইউনিট কার্যকরভাবে অভিযান চালাতে পারে, সে লক্ষ্যে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ছিল—গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। প্রয়োজন হলে যোদ্ধারা নিজেদের অবস্থান ছেড়ে পিছু হটতে পারবেন।
এ বছরের মার্চে এই নতুন কৌশলের প্রথম বড় পরীক্ষা হয়। সবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করেছে। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো বলে, যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়। খামেনি হিজবুল্লাহর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা ছিলেন। লেবাননের অনেক শিয়া মুসলিম তাঁকে অনুসরণ করতেন। খামেনি নিহত হওয়ার জবাবে সীমান্ত পেরিয়ে ছয়টি রকেট ছোড়া হয়।
হিজবুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের আড়ালে লেবাননে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালাতে যাচ্ছে ইসরায়েল—তাঁদের ধারণা ছিল এটা। তাই আগাম পদক্ষেপ হিসেবে ওই রকেট হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একটি সূত্রের ভাষ্য, মার্চে রকেট ছোড়ার সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেমের ছিল।
এ সিদ্ধান্তে ইরানের সমর্থন ছিল বলেও সূত্রটি দাবি করেছে। আরেকটি সূত্রের দাবি, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার জবাব হিজবুল্লাহর আরও আগেই দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছিল ইরান। তবে হিজবুল্লাহ সে সময় ভিন্ন হিসাব কষেছিল বলে সূত্রটি জানায়।
ভিডিও গেম ও ড্রোন
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন ‘গেমিং ক্যাফের’ ছড়াছড়ি। জেরুজালেম, তেহরান কিংবা কায়রো—সবখানেই দেখা যায় এমন দৃশ্য। অন্ধকার ঘরে তামাকের ধোঁয়ার মধ্যে বসে তরুণেরা ফিফা বা ফার্স্ট-পারসন ভিউ (এফপিভি) শুটিং গেমের প্রতিযোগিতায় মত্ত।
বৈরুতের দাহিয়ায় হিজবুল্লাহর অভিজ্ঞ সদস্যরা এসব দেখে হতাশ হতেন। তাঁদের ধারণা ছিল, মার্কিন প্রোগ্রামারদের বানানো কাল্পনিক যুদ্ধের খেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছে নতুন প্রজন্ম। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করা প্রবীণ যোদ্ধাদের কাছে মনে হতো, তরুণেরা আগের মতো কঠোর নেই।
তবে তাঁরা হয়তো তখনো জানতেন না, এ তরুণেরাই পরের যুদ্ধে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবেন।
২০২৬ সালের মার্চে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং এর বাইরের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। তাঁরা প্রায় ৩০০টি অবস্থান গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত বাড়ি, পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটি, এমনকি ক্রুসেডের আমলের একটি দুর্গও।
আগের যুদ্ধগুলোয় তীব্র লড়াইয়ের কেন্দ্র ছিল বিনতে জুবাইলের মতো শহর। কিন্তু নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ সেসব এলাকা ছেড়ে দেয়। তবু নিরাপদ ছিল না ইসরায়েলি বাহিনী। ২ মার্চের পর থেকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে। লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণে প্রায় ২০ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।
হিজবুল্লাহর লক্ষ্য ছিল, ইসরায়েল যেন কোনো অবস্থান স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত করতে না পারে। ২০২৪ সালে সীমান্তের পাঁচটি ঘাঁটির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল। এ কৌশল বাস্তবায়নে হিজবুল্লাহ এখন ড্রোনের ওপর বেশি নির্ভর করছে। ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিটি বড় বড় সংঘাতে নতুন কোনো অস্ত্র সামনে আনার প্রবণতা রয়েছে হিজবুল্লাহর। এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের কৌশলগত উদ্ভাবনী সক্ষমতার বার্তা দিতে চায়।
২০০৬ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ব্যবহার করেছিল করনেট অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ইসরায়েলের সাঁজোয়া যান ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের কৌশলগত চমক তৈরি হয়। এবার তারা ব্যবহার করছে এফপিভি (ফার্স্ট পারসন ভিউ) ড্রোন। এই ড্রোন ফাইবার-অপটিক কেব্লের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা সংকেত ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বল্পমূল্যের কিন্তু প্রাণঘাতী এই ড্রোনকে ‘বড় হুমকি’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ড্রোন লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলা চালায়। একই সঙ্গে পুরো হামলার ভিডিও ধারণ করে।
ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের মতো লেবাননেও ভিডিও গেম সংস্কৃতি থেকে দক্ষ ড্রোনচালক তৈরি হয়েছে। অন্তত দুটি সূত্র জানিয়েছে, এখন হিজবুল্লাহর ড্রোনচালকদের বড় অংশই লেবাননের গেমাররা।
আরও পড়ুনইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর ভেতরের গল্প
০৯ জুন ২০২৬অস্ত্রের আধুনিকায়ন
প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ এ ধরনের ড্রোন ব্যবহার করেছিল। তবে এরপর এর উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ড্রোনগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন এগুলো আরও বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে। ফলে ইসরায়েলের মারকাভা ট্যাংকের জন্য এগুলো আরও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
হিজবুল্লাহর সুবিধা হলো, ড্রোন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ তাদের কাছে আগে থেকেই ছিল। ২০২৪ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ প্রথমবারের মতো আলমাস-১ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। এটি ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র। এতে টেলিভিশন ও তাপচিত্রনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থা রয়েছে।
হিজবুল্লাহর দাবি, এটি ইসরায়েলের একটি স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি আগেই তাদের হাতে এসেছিল। তবে একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। এতে ব্যবহৃত ফাইবার-অপটিক কেব্লের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার। কাজেই আন্তসীমান্ত সংঘর্ষে ক্ষেপণাস্ত্রটির কার্যকারিতা কিছুটা সীমিত ছিল।
চলতি বছরের যুদ্ধের বেশির ভাগই লেবাননের সীমান্তের ভেতরে হয়েছে। তাই আলমাস ক্ষেপণাস্ত্রের স্বল্পপাল্লা নিয়ে বড় কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। আলমাসের জন্য মজুত রাখা বিপুল পরিমাণ ফাইবার-অপটিক কেব্ল পরে এফপিভি ড্রোন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুণগত সামরিক সুবিধা পেতে নিজেদের সশস্ত্র শাখাকে শক্তিশালী করেছিল হিজবুল্লাহ। এখন কৌশল বদলেছে। প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভর করা হচ্ছে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ ড্রোন।
বর্তমানে কাগজে-কলমে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে। ১৬ এপ্রিল থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। যদিও দুপক্ষের মধ্যে হামলা, পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাত থেকে লেবাননকে আলাদা রাখা।
যদিও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাভাবিক জীবন দ্রুত ফিরবে, এমন কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হিজবুল্লাহর সূত্র ও লেবাননের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি যুদ্ধের শেষ নয়, সাময়িক বিরতি মাত্র।
আরও পড়ুনইরান যুদ্ধে হিজবুল্লাহ যেভাবে ‘ফিনিক্স পাখি’র মতো জেগে উঠল
২১ মার্চ ২০২৬আগের সেই হিজবুল্লাহ নেই
২০২৬ সালের আগস্টে এসে হিজবুল্লাহর অবস্থান কী?
এটা নিশ্চিত, হিজবুল্লাহ সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে ছোট ইউনিটভিত্তিক গেরিলা কৌশলে ঝুঁকে যাওয়ার কারণে তারা কিছুটা কার্যকারিতা ধরে রাখতে পেরেছে।
সর্বশেষ দুটি যুদ্ধে হিজবুল্লাহর কতজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন, তার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নেই। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ধারণা, নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে হতে পারে। তাঁদের বেশির ভাগই ২০২৪ সালের যুদ্ধে নিহত হন।
হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, ২০২৩ সালে যে হিজবুল্লাহ ছিল, এখন আর সেই হিজবুল্লাহ নেই। সূত্রটি বলে, একসময় হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট ভান্ডার ছিল। সীমান্তজুড়ে শক্ত অবস্থান ছিল। তারা ইসরায়েলের জন্য বাস্তব ও বড় হুমকি ছিল। অঞ্চলজুড়ে, এমনকি আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত সরবরাহ ও সাহায্য পাওয়ার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তাদের ছিল।
একসময় গ্যালিলি অঞ্চলে ঢোকার যে পরিকল্পনা বা আকাঙ্ক্ষা হিজবুল্লাহর ছিল, এখন আর তা নেই। হিজবুল্লাহর একটি সূত্র বলছে, এখন তাদের উদ্দেশ্য জেরুজালেমকে নয়, বরং লেবাননকে রক্ষা করা।
ঘনিষ্ঠ সূত্রটি আরও বলে, নাঈম কাসেমের বিষয়ে অনেকেই বলেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু রূপান্তরের সময়টাতে তিনি ধীরে ধীরে সংগঠনকে আবার গড়ে তুলছেন।
আরও পড়ুনইসরায়েলের ‘ছায়াশত্রু’ হিজবুল্লাহপ্রধান হাসান নাসরুল্লাহ কে, কী তাঁর ভূমিকা
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪নাঈম কাসেমের অবদান
নানামুখী তীব্র চাপের মধ্যেও হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব টিকে আছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও দেখাতে পেরেছে। নাঈম কাসেমকে মহাসচিব করার সিদ্ধান্তটি শুরুতে অনেকের বিদ্রূপের মুখে পড়েছিল।
হাসান নাসরুল্লাহর মতো ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নাঈম কাসেমের নেই। আবার হাশেম সাফিউদ্দিনের মতো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বও তাঁর নেই। নাসরুল্লাহ ও সাফিউদ্দিন দুজনই ‘সাইয়্যেদ’ ছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর বংশধর বলে দাবি করতেন।
তবু নাঈম কাসেম কঠিন সময়ে হিজবুল্লাহকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিজেও ইসরায়েলের হত্যাচেষ্টার লক্ষ্যবস্তু। এ বছরের শুরুর দিকে নাঈম কাসেম সংগঠনে বড় ধরনের পুনর্গঠন করেন। নিজের নেতৃত্বের ধরন অনুযায়ী দলকে সাজান। প্রভাবশালী কয়েকজনকে পেছনের সারিতে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়া বড় কোনো সংকট ছাড়াই শেষ হয়।
হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, নাঈম কাসেম প্রমাণ করেছেন, তিনি সংগঠনকে ধরে রাখতে জানেন। পুরো দলকে পুনর্গঠন ও ঐক্যবদ্ধ করতেও সক্ষম তিনি।
হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল সামনাসামনি দেখা করা। কোনো ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়নি। সম্ভবও ছিল না। তাঁদের এভাবে দেখা করার মূল্য উদ্দেশ্য দুটি। এক, সংকটময় সময় কাটিয়ে হিজবুল্লাহকে আবারও সক্রিয় করার পরিকল্পনা করা। দুই, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করা।হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন সময় নিহত হয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন প্রজন্মের কয়েকজন নেতা এখনো দায়িত্বে আছেন। তাঁদের মধ্যে নাঈম কাসেম ও হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লকের প্রধান মোহাম্মদ রাদ আছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এখন সামনে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে হাসান ফাদলাল্লাহ অন্যতম। সময়ের সঙ্গে সংগঠনে তাঁর প্রভাব বেড়েছে।
এ বিষয়ে নাওয়াফ মুসাওয়ি বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের নেতারা সব সময় নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই প্রতিটি দায়িত্বশীল নেতার বিকল্প হিসেবে আরেকজনকে প্রস্তুত রাখা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম প্রজন্মের নেতারা নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতারাও নিহত হয়েছেন। তৃতীয় প্রজন্মের অনেক নেতা আর নেই। তবু প্রতিরোধ চলবে।’
মুসাভির ভাষ্য, ইসরায়েলের গোয়েন্দাদের কাছে হিজবুল্লাহর প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয় প্রজন্মের নেতাদের সম্পর্কে বিশদ তথ্য ছিল। কিন্তু এখন তাঁরা এমন একটি নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি, যাঁদের সম্পর্কে ইসরায়েলিদের কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই।
আরও পড়ুনলেবানন-ইসরায়েল চুক্তি যেভাবে পরের যুদ্ধের পথ তৈরি করছে
০২ জুলাই ২০২৬ইরানের ভূমিকা
এমন দুর্বল অবস্থায় অনেকের মনে হতে পারে, হাসান নাসরুল্লাহর সময়ের তুলনায় এখন হিজবুল্লাহকে পরিচালনায় ইরানের ভূমিকা বেড়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন হিজবুল্লাহর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে ইরানি উপদেষ্টার সংখ্যা কম।
হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলে, ‘আমার মনে হয়, এই সময়ে ইরানের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। এর কারণ মূলত সরবরাহ–সংক্রান্ত জটিলতা। সিরিয়া এখন আর ইরানিদের জন্য উন্মুক্ত নয়। আকাশপথেও যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।’
রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যায়ে সমন্বয় রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র আরও জানায়, এই সমন্বয় এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। সূত্রটির মতে, এ অঞ্চলের এবং হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের ওপর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের আলোচনা ও সংঘাতের গতিপ্রকৃতির ওপর।
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ তেহরান ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান এমন কোনো সমঝোতায় যেতে রাজি নয়, যেখানে লেবাননের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে না—এমনটাই মনে করছে হিজবুল্লাহ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
আরও পড়ুনইসরায়েল সেনা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর
০৪ জুন ২০২৬বদলাচ্ছে রাজনৈতিক বাস্তবতা
লেবানন রাষ্ট্রের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। গত ২ মার্চ ইসরায়েলের ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর হামলার পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। এরপর লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর সামরিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করেন। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। এতে রাষ্ট্র ও হিজবুল্লাহর দূরত্ব বেড়ে যায়।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর হিজবুল্লাহর ভেতরে ভবিষ্যৎ নিয়ে জোরালো আলোচনা হয়েছে। সশস্ত্র আন্দোলন থেকে শুধু রাজনৈতিক দলে রূপ নেওয়া যায় কি না, সেটিও আলোচনায় ছিল।
হিজবুল্লাহ এরই মধ্যে লেবাননের পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল। বহু বছর ধরে তারা দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠার সময় হিজবুল্লাহ ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধী। লেবাননের সাম্প্রদায়িক ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল।
সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা ও শক্তি ধরে রাখতে হিজবুল্লাহ সেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মতোই আচরণ করতে শুরু করেছে, যাদের একসময় তারা ঘৃণা করত। ২০১৯ সালের সরকারবিরোধী গণ–আন্দোলনের সময়ও হিজবুল্লাহ বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষ নেয়। তারা আন্দোলনকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেয়। এমনকি আন্দোলনকারীদের অবস্থানস্থল ভেঙে দিতে নিজেদের সমর্থকদেরও পাঠায়।
আরও পড়ুনট্রাম্পের চাপ উড়িয়ে ইসলামপন্থী শারার সিরিয়া কি হিজবুল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ার পথে
০৫ জুলাই ২০২৬নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে চাপ
হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, সংগঠনের ভেতরে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি কীভাবে হতে পারে বা এর ফলাফল কী—এসব নিয়েও কথা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ চলাকালে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাঈম কাসেমের জন্য কোনো বিষয়ই একেবারে নিষিদ্ধ নয়।’
যদিও হিজবুল্লাহর ভেতরে এমন একটি অংশ আছে, যারা মনে করে, নিরস্ত্রীকরণ কিংবা রাষ্ট্র বা পশ্চিমাদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত হবে না। এমনই একটি সূত্র বলে, ‘আমার মনে হয়, হিজবুল্লাহর আবার আশির দশকের মতো হয়ে ওঠা উচিত। ব্যাপক বোমা হামলা ও হত্যার পথে ফিরে যাওয়া উচিত। তবে এটা মোটেও সহজ নয়।’
ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশ লেবাননের সেনাবাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। এটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। লেবাননে অনেকের শঙ্কা, এমন হলে দেশে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে।
এমনকি দ্য ইকোনমিস্ট সাময়িকী গত মাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রতি আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত হতে পারে না। সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।’
এ বিষয়ে মুসাওয়ি বলেন, ‘আমার মনে হয় না, লেবাননে কেউ দখলদারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে থাকা শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে। কারণ, তা হলে লেবানন ধ্বংস হওয়ার আগেই তাদের নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনতে হবে।’
লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতাকে অনেকে আত্মসমর্পণের শামিল মনে করছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটি নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করেছেন। তবু এই সমঝোতা হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে আরও কিছুটা সময়–সুযোগ করে দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
** মিডল ইস্ট আইয়ে ৫ আগস্ট প্রকাশিত নিবন্ধটি লিখেছেন সংবাদমাধ্যমটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি দানিয়েল হিলটন এবং বৈরুতভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক আদম শামসেদ্দিন।
অনুবাদ করেছেন অনিন্দ্য সাইমুম।
আরও পড়ুনলেবাননকে চুক্তির ফাঁদে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র কি দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের দখলদারত্বের সুযোগ করে দিল
০১ জুলাই ২০২৬
