Sun 9th Aug 2026, 1:11 pm

‘কুৎসিত বোন’ আখ্যা থেকে জাতীয় পুরস্কারের উজ্জ্বল শিখরে: সিম্পল কাপাডিয়ার অদম্য পথচলা

‘কুৎসিত বোন’ আখ্যা থেকে জাতীয় পুরস্কারের উজ্জ্বল শিখরে: সিম্পল কাপাডিয়ার অদম্য পথচলা
বলিউড জগতে অনেককেই তারকা পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে দেখা যায়, তবে এই পরিচয়ই কখনও কখনও তাঁদের জন্য এক কঠিন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এমনই এক জীবনগাথা অভিনেত্রী ও কস্টিউম ডিজাইনার সিম্পল কাপাডিয়ার। তিনি ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ডিম্পল কাপাডিয়ার কনিষ্ঠ বোন এবং সুপারস্টার রাজেশ খান্নার শ্যালিকা। অভিনয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন না করলেও, পরবর্তীকালে তিনি কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে জিতে নেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তবে সাফল্যের এই পথটি ছিল তীব্র অপমান, অবিরাম তুলনা এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামের কণ্টকময়।

১৯৭৩ সালে 'ববি' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ডিম্পল কাপাডিয়ার সাড়া জাগানো অভিষেকের পর যখন গোটা দেশ তাঁর অনবদ্য সৌন্দর্য ও অভিনয় প্রতিভায় মুগ্ধ, তখন সিম্পল ছিলেন বোর্ডিং স্কুলের ছাত্রী। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে পরিচালক শক্তি সামন্তর 'অনুরোধ' ছবির মাধ্যমে তাঁরও অভিষেক ঘটে। কাকতালীয়ভাবে এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি রাজেশ খান্না।

তবে অভিষেক ছবির শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য সুখকর ছিল না। ১৯৮৬ সালে সাংবাদিক সুস্মিতা রায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিম্পল কাপাডিয়া অভিযোগ করেন যে, রাজেশ খান্না তাঁকে 'কাচরা' বা আবর্জনার মতো হেয় করতেন। একজন নতুন শিল্পী হিসেবে তিনি অত্যন্ত নার্ভাস ছিলেন, অথচ রাজেশ সংলাপের মহড়াতেও সহযোগিতা করতেন না। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেয়ে একদিন তিনি প্রায় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতি দেখে পরিচালক শক্তি সামন্ত হস্তক্ষেপ করেন। সিম্পলের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি রাজেশ খান্নাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তিনি যত বড় সুপারস্টারই হোন না কেন, নতুন শিল্পীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ অপরিহার্য। এর ফলস্বরূপ, রাজেশ তাঁর আচরণে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হন।

অন্যদিকে, ব্যক্তিগত স্তরেও তাঁদের সম্পর্ক খুব একটা উষ্ণ ছিল না। সিম্পল জানিয়েছিলেন যে, ডিম্পলের বিয়ের পর একই বাড়িতে বসবাস করা সত্ত্বেও রাজেশের সঙ্গে তাঁর কখনোই একটি গভীর বোঝাপড়া গড়ে ওঠেনি। তিনি রাজেশকে 'বোঝা কঠিন একজন মানুষ' হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।

'অনুরোধ' বক্স অফিসে ব্যর্থ হওয়ার পর সিম্পলকে আরও এক দফা মানসিক চাপের সম্মুখীন হতে হয়। ডিম্পলের সঙ্গে তাঁর সৌন্দর্যের তুলনা শুরু হয় এবং অনেকেই তাঁকে 'কুৎসিত বোন' বলে বিদ্রূপ করতেন। এই ধরনের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে সিম্পল কাপাডিয়া বলেছিলেন যে, ডিম্পল যে অসাধারণ সুন্দরী, তা তিনি জন্ম থেকেই জানেন। তবে একটি চলচ্চিত্রের ব্যর্থতার জন্য কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যকে দায়ী করা অর্থহীন।

সিম্পল আরও স্বীকার করেছিলেন যে, অভিনয় নিয়ে তাঁর কখনোই খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। মূলত অর্থনৈতিক তাগিদেই তিনি চলচ্চিত্র জগতে এসেছিলেন। প্রায় ২৫টি ছবিতে অভিনয়ের পর তিনি অভিনয় থেকে সরে এসে কস্টিউম ডিজাইনের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেন।

ডিম্পল কাপাডিয়ার চলচ্চিত্র জগতে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই সিম্পল তাঁর পোশাকের নকশা করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি শ্রীদেবী, মাধবী সহ আরও অনেক নামী অভিনেত্রীর জন্য পোশাক ডিজাইন করেন। ১৯৯৪ সালে ‘রুদালি’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পোশাক পরিকল্পনায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে তিনি নিজেকে একজন সফল কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘ডর’, ‘বরসাত’, ‘চাচি ৪২০’, ‘দ্য হিরো: লাভ স্টোরি অব আ স্পাই’ এবং ‘সোচা না থা’ সহ একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে কাজ করেন।

ডিম্পল কাপাডিয়া নিজেও বহুবার স্বীকার করেছেন যে, তাঁর চলচ্চিত্র জীবনে সিম্পলের অবদান ছিল অপরিসীম। ২০২৪ সালে ভোগ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে, তাঁর প্রায় সব ছবির পোশাকই সিম্পল ডিজাইন করতেন, যা তাঁকে ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী হতে বিশেষভাবে সাহায্য করত।

ব্যক্তিগত জীবনেও সিম্পলের কাছে তাঁর বড় বোন ছিলেন অগ্রাধিকারের শীর্ষে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি মজার ছলে বলেছিলেন যে, যদি তিনি বিয়ে করেন, তবে এমন কাউকেই করবেন যাঁর বাড়ি ডিম্পলের বাড়ির কাছাকাছি এবং যিনি ডিম্পলের সঙ্গে সময় কাটাতে আপত্তি করবেন না।

১৯৯২ সালে তিনি রাজিন্দর সিং শেঠিকে বিয়ে করেন, তবে তাঁদের সম্পর্ক পরবর্তীতে বিচ্ছেদে পর্যবসিত হয়। তাঁদের পুত্র করণ কাপাডিয়া পরবর্তীতে বলিউডে অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

দীর্ঘ তিন বছর ক্যান্সারের সঙ্গে অসম লড়াইয়ের পর ২০০৯ সালে মাত্র ৫১ বছর বয়সে সিম্পল কাপাডিয়া প্রয়াত হন। জীবনের শুরুতে ‘কুৎসিত বোন’ কিংবা ‘অযোগ্য অভিনেত্রী’র মতো তকমা পেলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর নিজস্ব মেধা ও প্রতিভায় বলিউডে এক স্থায়ী ও সম্মানজনক স্থান অর্জন করেছিলেন—একজন অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন অত্যন্ত সফল কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে।