Tue 11th Aug 2026, 5:05 pm

সালমান শাহ ও শাবনূরের সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন: তিন দশক পর মুখ খুললেন নীলা চৌধুরী

সালমান শাহ ও শাবনূরের সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন: তিন দশক পর মুখ খুললেন নীলা চৌধুরী
ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম কিংবদন্তি নায়ক সালমান শাহ এবং খ্যাতিমান চিত্রনায়িকা শাবনূরের জুটি আজও দর্শকদের মাঝে দারুণ জনপ্রিয়। পর্দায় তাদের অনবদ্য রসায়ন যেমন প্রশংসিত, তেমনই সালমান শাহের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও কম জল্পনা-কল্পনা হয়নি। একসময় সালমান-শাবনূরের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে শাবনূর শুরু থেকেই এটিকে ভাই-বোনের সম্পর্ক হিসেবে দাবি করে আসছেন। সম্প্রতি এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীও, যিনি নিশ্চিত করেছেন যে তার ছেলের সঙ্গে শাবনূরের কখনোই কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না।

সালমান শাহের অকাল প্রয়াণের পর থেকেই তার এবং শাবনূরের সম্পর্ক নিয়ে নানা বিতর্ক ও আলোচনা চলে আসছে। শাবনূর বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, সালমান তাকে ছোট বোনের মতো দেখতেন এবং নিজের কোনো বোন না থাকায় স্নেহের বশে 'পিচ্চি' নামে ডাকতেন। অভিনেত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, সালমানের বাবা-মায়ের সঙ্গেও তার পারিবারিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।

সম্প্রতি সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল অভিনেতা ডনকে গ্রেপ্তারের পর নীলা চৌধুরী বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সুযোগে ছেলে সালমান শাহের সঙ্গে শাবনূরের সম্পর্ক প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, শাবনূরের সঙ্গে সালমানের প্রেমের সম্পর্ক ছিল না; বরং সালমান শাবনূরকে আপন বোনের মতোই মনে করতেন।

নীলা চৌধুরী উল্লেখ করেন, ‘সালমানের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে শাবনূর সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিল। তবে শাবনূরের সঙ্গে আমার ছেলের কোনো রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল না। শাবনূর আমার ছেলের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল এবং সালমান তাকে সবরকম সাহায্য করতে চেষ্টা করত। সালমানের যেহেতু কোনো বোন ছিল না, সে শাবনূরকে বোনের চোখেই দেখত এবং গভীরভাবে স্নেহ করত।’

একইসাথে নীলা চৌধুরী শাবনূরের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তার অভিযোগ, শাবনূর ইচ্ছাকৃতভাবে বোঝাতে চাইতেন যে তার সঙ্গে সালমানের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে এবং পরবর্তীতে এই সম্পর্ক নিয়ে নানা রং চড়ানো হয়েছে। নীলা চৌধুরীর ব্যাখ্যায়, ‘শাবনূরের সঙ্গে সালমানের সম্পর্ক ছিল একজন প্রিয়জনের মতো, প্রেমিকার মতো প্রেম নয়। যে ধরনের আন্তরিক সম্পর্ক প্রিয়জনদের মধ্যে থাকে, তাদের সম্পর্কটা ছিল ঠিক তেমন।’

সালমান-শাবনূরের সম্পর্ক প্রসঙ্গে শাবনূরের বক্তব্য অবশ্য সবসময়ই স্বতন্ত্র ছিল। তিনি বারবার জানিয়েছেন যে, সালমানকে তিনি কখনোই প্রেমিক হিসেবে বিবেচনা করেননি, বরং তাকে ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন। প্রথম আলোকে শাবনূর বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ সত্যি যে, সালমানকে আমি ভাই ছাড়া অন্য কোনো দৃষ্টিতে দেখিনি। সালমানের মৃত্যুর পর কিছু অসাধু লোক আমাকে জড়িয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে। কিছু সাংবাদিকও আমাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের মুখরোচক ও ভিত্তিহীন গল্প পরিবেশন করেছেন। এতে কী লাভ হয়েছে, আমার জানা নেই। আমি আমার ক্যারিয়ার অত্যন্ত পরিশ্রম করে, তিল তিল করে গড়ে তুলেছি। কিছু লোক কেবল গুজব ছড়িয়ে আনন্দ লাভের চেষ্টা করেছে।’

১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সালমান শাহের অভিষেক হয়, যেখানে তার বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী। এরপর ‘তুমি আমার’ সিনেমায় তিনি শাবনূরের সঙ্গে জুটি বাঁধেন। এই ছবি মুক্তির পর বাংলা চলচ্চিত্রে সালমান-শাবনূর জুটি অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মাত্র চার বছরের সংক্ষিপ্ত অভিনয় জীবনে সালমান মোট ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেন, যার মধ্যে ১৪টিতেই তার নায়িকা ছিলেন শাবনূর।

‘তুমি আমার’ সিনেমার মাধ্যমে সালমান-শাবনূর জুটির যাত্রা শুরু হয়। এরপর তারা ‘সুজন সখী’, ‘বিচার হবে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’ সহ মোট ১৪টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এই জুটির বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করে।

এই সফল জুটির সম্পর্ক নিয়ে শাবনূর মন্তব্য করেন যে, কাজ করার সুবাদেই তাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।

তার মতে, ‘সালমান ছিলেন অত্যন্ত উদার মনের একজন মানুষ। তিনি বয়সে বড় সবাইকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। তিনি ভীষণ ভালো মানুষ ছিলেন। সহশিল্পীদের প্রতি তার আন্তরিকতা ছিল অপরিসীম এবং কাজপাগল একজন ছেলে ছিলেন। আমাদের দুজনের মধ্যে বোঝাপড়াটা ছিল অসাধারণ। বলা যায়, আমরা একে অন্যের চোখের ইশারা বুঝতে পারতাম।’

এই চিত্রনায়িকা আরও জানান যে, শুধু সালমানের সঙ্গেই নয়, তার স্ত্রী সামিরার সঙ্গেও শাবনূরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তার ভাষ্যমতে, শুটিংয়ের সময় সামিরা প্রায়শই তাদের সঙ্গে থাকতেন। একসাথে ঘোরাঘুরি, খাওয়া-দাওয়া এবং আড্ডার মাধ্যমে দুই পরিবারের মধ্যেও একটি চমৎকার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

সালমানের সঙ্গে কাজের স্মৃতি রোমন্থন করে শাবনূর আরও উল্লেখ করেন যে, শুটিংয়ের বিরতিতে তারা আনন্দ-আড্ডায় মেতে উঠতেন। কক্সবাজারে শুটিং চলাকালীন রাতে সাগরপাড়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারেরও আয়োজন করা হতো। সেখানে দুই পরিবারের সদস্য ছাড়াও সহশিল্পী ও পরিচালকরা উপস্থিত থাকতেন।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় সালমান শাহের আকস্মিক মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরেও তাকে ঘিরে আলোচনা-পর্যালোচনা থামেনি। সালমানের মৃত্যু, তার ব্যক্তিগত জীবন এবং সহশিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা বক্তব্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে সালমান-শাবনূরের কথিত প্রেমের সম্পর্কটিও বারবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। শাবনূর যেখানে বরাবরই তাদের সম্পর্ককে ভাই-বোনের সম্পর্ক হিসেবে দাবি করে আসছেন, সেখানে এবার সালমানের মা নীলা চৌধুরীও স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে, তার ছেলের সঙ্গে শাবনূরের কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না।