Thu 13th Aug 2026, 12:03 am

অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহ গলে উন্মুক্ত হচ্ছে সুপ্ত পারদ, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে বাড়ছে দূষণের ঝুঁকি

অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহ গলে উন্মুক্ত হচ্ছে সুপ্ত পারদ, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে বাড়ছে দূষণের ঝুঁকি
বরফাবৃত ও রহস্যময় অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের গভীর অভ্যন্তরে, মানুষের দৃষ্টির অগোচরে প্রাচীনকাল থেকেই জমা হয়েছে প্রচুর বিষাক্ত পারদ। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বর্তমানে এই মহাদেশের সুবিশাল বরফের আস্তরণ গলে যাওয়ায়, সেই প্রাচীন পারদ মিশে যাচ্ছে সমুদ্রের পানিতে, যা এক নতুন পরিবেশগত উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।

মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী 'প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস (পিএনএএস)'-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, অ্যান্টার্কটিকার মহীসোপান অঞ্চল দ্রুতগতিতে গলছে। চীনের পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী চেংঝেন ঝোয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত একদল বিজ্ঞানী ওই অঞ্চলের পলির নমুনা সংগ্রহ করে উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্প নির্গমনের উৎস থেকে বহু দূরে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও অ্যান্টার্কটিকায় পারদ জমার হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শিল্পায়নের সূত্রপাত ঘটেছিল, যার পর থেকে অ্যান্টার্কটিকায় পারদ জমার হার প্রায় ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত, পারদ দূরবর্তী উৎস থেকে বায়ুমণ্ডলের মাধ্যমে অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছায়, অতঃপর সাগরের পানিতে শোষিত হয় এবং সেখান থেকে পুনরায় বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে – যা বিজ্ঞানীরা 'বায়ুমণ্ডল-সমুদ্রচক্র' নামে অভিহিত করেন। তবে, সাম্প্রতিককালে বরফ গলা এবং ভূমি ক্ষয়ের ফলে এই প্রক্রিয়ায় একটি নতুন সংযোগ তৈরি হয়েছে, যার নামকরণ করা হয়েছে 'বায়ুমণ্ডল-হিমবাহ-স্থলভাগ-সমুদ্রচক্র'। এই নতুন চক্রের প্রভাবে গত ২০০ বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ নিরবচ্ছিন্নভাবে পারদদূষণের শিকার হচ্ছে, এবং এই প্রক্রিয়াটিই মূলত বরফে জমে থাকা বহু পুরোনো পারদকে সমুদ্রে ছড়িয়ে দেওয়ার মূল কারণ।

অ্যান্টার্কটিকা দীর্ঘকাল ধরে পারদের একটি বিশাল ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে আসছে। প্রাচীনকালে গঠিত এর সুবিশাল বরফের স্তরে বিপুল পরিমাণ পারদ সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে পরিবেশ দূষণের প্রভাবে অ্যান্টার্কটিকার বরফ দ্রুত গলে যাওয়ায়, এই জমা হওয়া পুরোনো পারদ সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, অ্যান্টার্কটিক টুথফিশ, মার্লিন এবং হাঙরের মতো সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে পারদের মাত্রা পূর্বের সব রেকর্ড এবং খাদ্য সুরক্ষার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অ্যান্টার্কটিকায় ছড়িয়ে পড়া এই পারদ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পারদ স্বল্প মাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলেও তা বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম। এই কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ১০টি প্রধান রাসায়নিকের তালিকায় পারদকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। অ্যান্টার্কটিকা থেকে সামুদ্রিক স্রোতের মাধ্যমে উন্মুক্ত সাগরে পারদ ছড়িয়ে পড়ার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে পারদদূষণের ব্যাপক বিস্তারের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।