Sat 29th Aug 2026, 10:15 am

সুগন্ধি চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি: কৃষকের গোলায় ধান নেই, অথচ বাজারে দাম দ্বিগুণ

সুগন্ধি চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি: কৃষকের গোলায় ধান নেই, অথচ বাজারে দাম দ্বিগুণ
গত ছয় মাসের ব্যবধানে রাজশাহীর বাজারে সুগন্ধি পোলাওয়ের চালের মূল্য নজিরবিহীনভাবে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়া চালের দাম বর্তমানে অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা ব্যবসায়ীদের মতে তাঁদের কর্মজীবনে অভূতপূর্ব। বিস্ময়করভাবে, কৃষকেরা জানাচ্ছেন যে উৎপাদন মৌসুমে তাঁরা যে মূল্যে ধান বিক্রি করেছিলেন, বর্তমান বাজারমূল্য তার প্রায় দ্বিগুণ। তবে, কৃষকের গোলা যখন ধানশূন্য, তখনই এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, যার সুফল তাঁরা ভোগ করতে পারেননি।

কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই বাজারে চালের এই অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির জন্য বিদেশে রপ্তানিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি করেছে। প্রধানত ব্রি-৩৪ (চিনিগুঁড়া) জাতের ধান থেকেই এই সুগন্ধি পোলাওয়ের চাল উৎপাদিত হয়। বর্তমানে বাজারে গত আমন মৌসুমে উৎপাদিত ধানের চালের সরবরাহ রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সিংহভাগ ব্রি-৩৪ (চিনিগুঁড়া) ধান দিনাজপুর জেলায় উৎপাদিত হয়। এছাড়াও ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় সীমিত পরিসরে এর আবাদ হয়ে থাকে। চলতি বছর দিনাজপুরে ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের ৯৪ হাজার হেক্টরের তুলনায় সামান্য বেশি।

দিনাজপুর জেলা ডিএইর উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন Desi Media Pointকে জানিয়েছেন যে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ইস্পাহানি অ্যাগ্রো এবং প্রাণ অ্যাগ্রোর মতো শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান চিনিগুঁড়া ধান থেকে উৎপাদিত সুগন্ধি চাল মোড়কজাত করে বাজারজাত করে। এছাড়াও, দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার জহুরা অটো রাইস মিল স্থানীয়ভাবে এই চাল প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন করে থাকে। এই বিশেষায়িত ধানকে কেন্দ্র করে জেলায় ছোট-বড় প্রায় ২০০টি অটো রাইস মিল গড়ে উঠেছে। তবে, বর্তমানে বাজারে ধানের যে উচ্চমূল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে, কৃষকেরা তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

রাজশাহীর সাহেববাজার এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত জাহাঙ্গীর আলম খানের অভিজ্ঞতা এই মূল্যস্ফীতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। পাঁচ মাস পর পোলাওয়ের চাল কিনতে গিয়ে তিনি রীতিমতো হতভম্ব। পূর্বে প্রতি কেজি ১৪০ টাকায় কেনা চালের জন্য এবার তাঁকে ২৩০ টাকা গুণতে হয়েছে। বিক্রেতার সোজাসাপ্টা উত্তর ছিল, "সেই দিন আর নাই", যা বাজারের বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। রপ্তানি প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম প্রশ্ন তোলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের সুপারমার্কেটগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য পাওয়া যায়, রপ্তানি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে রাতারাতি এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেন হবে?"

রাজশাহীর কুমারপাড়ার 'গোলাপ মামার হোটেল'-এর স্বত্বাধিকারী মো. গোলাপ সরদার জানান, ছয় মাস আগে তিনি প্রতি কেজি পোলাওয়ের চাল ১৩০ টাকায় কিনলেও বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকায়। এই মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও তিনি পোলাওয়ের বিক্রয়মূল্য আনুপাতিক হারে বাড়াতে পারেননি, যা তাঁর ব্যবসাকে প্রভাবিত করছে। রাজশাহীর পাইকারি চাল ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে তাঁরা প্রতি কেজি পোলাওয়ের চাল ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন, যা খুচরা বাজারে আরও বেশি মূল্যে পৌঁছাচ্ছে।

সাহেববাজারের এপি চাউল ভান্ডার-১–এর স্বত্বাধিকারী অশোক প্রসাদ উল্লেখ করেন যে কোরবানির ঈদের পর থেকে এই চালের দাম বাড়তে শুরু করে এবং প্রতি কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর মতে, এই মূল্যবৃদ্ধি অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে চাল বিদেশে রপ্তানি হওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং রপ্তানি বন্ধ হলে দাম স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কাদিরগঞ্জ এলাকার পাইকারি চাল ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিনও একই সুর তুলেছেন। তাঁর মতে, ছয় মাস আগে প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই চালের দাম এখন ২০০ টাকায় পৌঁছেছে, যার পেছনে সরকারের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়াকে দায়ী করেন তিনি।

জসীম উদ্দিন বর্তমানে পোলাওয়ের চাল মজুত করা থেকে বিরত রয়েছেন। তিনি জানান, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তাঁর দোকানে অভিযান চালিয়েছিলেন। দাম নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা তর্কের পর, ২০০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির অভিযোগে তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কর্মকর্তাদের প্রশ্ন ছিল, "১৫ দিন আগেও চালের দাম এত ছিল না, এত অল্প সময়ে কীভাবে তা বাড়ল?" জসীম উদ্দিন কর্মকর্তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তাঁরা কোম্পানির গুদাম থেকেই ২০০ টাকা কেজি দরে চাল কিনছেন, যার সাথে পরিবহন ব্যয় যুক্ত হয়েছে। তিনি দাবি করেন যে ক্রয়মূল্যের ওপর ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন পান, ফলে ২০০ টাকার কমে বিক্রি করা অসম্ভব। তিনি কোম্পানির বস্তার গায়ে দেওয়া ফোন নম্বর উল্লেখ করে দাম যাচাই করার প্রস্তাব দিলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। তাঁর ভাষায়, "রপ্তানি আজ বন্ধ হলেই কাল কেজিপ্রতি ৫০ টাকা কমে যাবে।"

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার চকযামিনী কাজীপাড়া গ্রামের কৃষক খালেদুল ইসলাম Desi Media Pointকে জানিয়েছেন, গত মৌসুমে ৭৫ কেজির এক বস্তা চিনিগুঁড়া ধান ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে এই ধানের চাষ করেছিলেন। তবে, যখন ধানের দাম ৫ হাজার ২০০ টাকায় পৌঁছায়, ততদিনে কৃষকের ঘরের ধান শেষ হয়ে গিয়েছিল, ফলে তাঁরা এই বাড়তি মূল্যের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আমবাড়ি গ্রামের বড় কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, গত বছর তিনি ৩৬ বিঘা জমিতে চিনিগুঁড়া ধানের চাষ করেছিলেন। এই বছর দামের ঊর্ধ্বগতি দেখে তিনি ৩৮ বিঘা জমিতে এই ধানের আবাদ করেছেন। তিনিও মনে করেন, রপ্তানির কারণেই এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।

দিনাজপুরের চালের আড়তদার আতিয়ার রহমান উল্লেখ করেন যে ধান ওঠার মৌসুমে ৭৫ কেজির এক বস্তা চার হাজার টাকা দরে বেচাকেনা হলেও, পরবর্তীতে তা ছয় হাজার টাকায় উন্নীত হয় এবং বর্তমানে সেই ধানের দাম সাড়ে আট হাজার টাকা। মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে তিনি এলাকার ধানের ঘাটতিকে দায়ী করেন। তবে, বিদেশে রপ্তানির বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকে বলেন, "সেটা বলার ক্ষমতা নেই ভাই। হতেও পারে।"