মন্ত্রিসভা বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন-ভাতা ও পেনশনের হার বৃদ্ধি করে নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর অনুমোদন দিয়েছে। একই সাথে, সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলিও অনুমোদিত হয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক বেতনকাঠামো পরবর্তীতে ঘোষণা করা হবে। এই সকল নির্দেশনা গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে বিবেচিত হবে।
গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করে। এই নতুন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে, যা আগামী দুই বছরের মধ্যে তিনটি ধাপে কার্যকর করা হবে। বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য জানায় এবং পরবর্তীতে তথ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অনুমোদনের পটভূমি ব্যাখ্যা করে জানানো হয় যে, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর সরকার সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একটি সচিব কমিটি গঠন করে। উক্ত সচিব কমিটির পেশ করা প্রতিবেদন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জানানো হয়েছে যে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা, মূল্যস্ফীতির প্রবণতা, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতনকাঠামোর অপরিহার্যতা বিবেচনা করে মন্ত্রিসভা এই নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে।
উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় বেতনকাঠামোটির সুষ্ঠু ও কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এখন প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এসব প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধা সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সরকারের বিশ্বাস, পুরো বেতনকাঠামো একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ হ্রাস পাবে।
নতুন কাঠামোতেও পূর্বের ন্যায় ২০টি গ্রেড বিদ্যমান থাকবে। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকার পরিবর্তে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকার স্থলে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে।
তবে সমগ্র বেতনকাঠামোটি একবারে কার্যকর হবে না। ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ এই দুই অর্থবছরে বেতন-ভাতা ধাপে ধাপে প্রদান করা হবে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতে সমতা আনা হয়েছে; যা বর্তমানে ১: ১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১: ১.৭৮ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে কার্যকর হবে। এর অর্থ হলো, চলমান ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতনকাঠামোটি বাস্তবায়িত হবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, আগামী বছরের জানুয়ারিতে ৩০ শতাংশ এবং পরবর্তী জুলাইয়ে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ প্রদান করা হবে। বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। অবসরভোগীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
বিচার বিভাগের জন্য একটি স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো তৈরি করা হবে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতনকাঠামো অনুমোদিত হবে, যা একইভাবে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে।
কম পেনশনভোগীদের জন্য বিশেষ সুবিধা
নতুন বেতনকাঠামোতে পেনশনভোগীদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সামরিক ও অসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, এই ব্যবস্থা সামরিক ও অসামরিক উভয় খাতেই একই সময়ে বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। তবে, বর্তমানে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ প্রবর্তন করলে সরকারের ওপর ব্যাপক আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে। উপরন্তু, ২০১৯ সালের পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত অনেক অসামরিক কর্মচারীর তথ্য সরকারের কাছে নেই। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করবে। বর্তমান পদক্ষেপটি একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশন গ্রহণকারী ব্যক্তিরা ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন গ্রহণকারীরা ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন গ্রহণকারীরা ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন গ্রহণকারীরা ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন গ্রহণকারী ব্যক্তিরা ৫৫ শতাংশ পেনশন বৃদ্ধি পাবেন।
সার্বজনীন মোবাইল ও প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা
সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা প্রবর্তন করা হবে। প্রতিটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করা হবে।
এছাড়াও, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল যোগাযোগের ক্রমবর্ধমান ব্যয় বিবেচনা করে সকল গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পূর্বে, কেবল পঞ্চম গ্রেড ও তার উপরের স্তরের কর্মচারীরা এই ভাতা পেতেন।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী উপকৃত হবেন। এছাড়া, সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীরাও এর আওতাভুক্ত হবেন, যার ফলে মোট ৩৩ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন।
জানানো হয়েছে যে, নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বছরে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। মধ্যমেয়াদি বাজেট–কাঠামোতে এই অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এই নতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি অপরিহার্য
বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন যে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে হলে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা আবশ্যক। তবে, বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব সংগ্রহ ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি ছিল ৮৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে, অর্থাৎ ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। বিগত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে, যা ছিল মাত্র ১২.৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসের রাজস্ব আয়ের হিসাব এখনও এনবিআর চূড়ান্ত করেনি।
সরকারের আয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে এনবিআরে দীর্ঘকাল ধরে বড় ধরনের সংস্কারের অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থের সংস্থানে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তবে, সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে।
অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরের সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা ছিল। এ বিষয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি হলেও বিএনপি সরকার তা পাস করেনি। গত ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠিত হয় পর্যালোচনা করার জন্য, কিন্তু সেই কমিটি এখনও তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
এদিকে, গত ২৩ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এনবিআরের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সংক্রান্ত একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত করজাল বিস্তৃত করা হবে এবং কর ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণরূপে স্বয়ংক্রিয় করা হবে। ভ্যাটের হার একক হবে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যা বর্তমানে ৭ শতাংশের সামান্য বেশি।
ব্যবসা-বাণিজ্যকে সচল রাখা অত্যাবশ্যক
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হবে। তবে, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতিশীলতা অনুপস্থিত। নতুন বিনিয়োগের কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ নেই এবং কর্মসংস্থানও সীমিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে ২২ শতাংশের নিচে চলে এসেছে।
চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ কতটা আকৃষ্ট হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই সংকটের ফলে ইতিমধ্যেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, এবং পণ্য উৎপাদন বিঘ্নিত হলে রাজস্ব আদায়ও হ্রাস পাবে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান Desi Media Point-কে জানান যে, ব্যবসা-বাণিজ্য মন্থর গতিতে চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি না এলে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে না। তবে, তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমানো না হয় এবং অর্থ ছাপিয়ে যেন বেতন-ভাতা প্রদান করা না হয়।
সেলিম রায়হানের মতে, বেসরকারি খাত বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। নতুন বিনিয়োগের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্য যদি সচল না থাকে, তাহলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা তাদের কর্মীদের বেতন বাড়াতে আগ্রহী হবেন না।
গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করে। এই নতুন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে, যা আগামী দুই বছরের মধ্যে তিনটি ধাপে কার্যকর করা হবে। বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য জানায় এবং পরবর্তীতে তথ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অনুমোদনের পটভূমি ব্যাখ্যা করে জানানো হয় যে, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর সরকার সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একটি সচিব কমিটি গঠন করে। উক্ত সচিব কমিটির পেশ করা প্রতিবেদন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জানানো হয়েছে যে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা, মূল্যস্ফীতির প্রবণতা, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতনকাঠামোর অপরিহার্যতা বিবেচনা করে মন্ত্রিসভা এই নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে।
উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় বেতনকাঠামোটির সুষ্ঠু ও কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এখন প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এসব প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধা সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সরকারের বিশ্বাস, পুরো বেতনকাঠামো একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ হ্রাস পাবে।
নতুন কাঠামোতেও পূর্বের ন্যায় ২০টি গ্রেড বিদ্যমান থাকবে। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকার পরিবর্তে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকার স্থলে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে।
তবে সমগ্র বেতনকাঠামোটি একবারে কার্যকর হবে না। ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ এই দুই অর্থবছরে বেতন-ভাতা ধাপে ধাপে প্রদান করা হবে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতে সমতা আনা হয়েছে; যা বর্তমানে ১: ১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১: ১.৭৮ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে কার্যকর হবে। এর অর্থ হলো, চলমান ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতনকাঠামোটি বাস্তবায়িত হবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, আগামী বছরের জানুয়ারিতে ৩০ শতাংশ এবং পরবর্তী জুলাইয়ে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ প্রদান করা হবে। বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। অবসরভোগীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
বিচার বিভাগের জন্য একটি স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো তৈরি করা হবে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতনকাঠামো অনুমোদিত হবে, যা একইভাবে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে।
কম পেনশনভোগীদের জন্য বিশেষ সুবিধা
নতুন বেতনকাঠামোতে পেনশনভোগীদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সামরিক ও অসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, এই ব্যবস্থা সামরিক ও অসামরিক উভয় খাতেই একই সময়ে বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। তবে, বর্তমানে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ প্রবর্তন করলে সরকারের ওপর ব্যাপক আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে। উপরন্তু, ২০১৯ সালের পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত অনেক অসামরিক কর্মচারীর তথ্য সরকারের কাছে নেই। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করবে। বর্তমান পদক্ষেপটি একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশন গ্রহণকারী ব্যক্তিরা ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন গ্রহণকারীরা ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন গ্রহণকারীরা ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন গ্রহণকারীরা ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন গ্রহণকারী ব্যক্তিরা ৫৫ শতাংশ পেনশন বৃদ্ধি পাবেন।
সার্বজনীন মোবাইল ও প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা
সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা প্রবর্তন করা হবে। প্রতিটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করা হবে।
এছাড়াও, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল যোগাযোগের ক্রমবর্ধমান ব্যয় বিবেচনা করে সকল গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পূর্বে, কেবল পঞ্চম গ্রেড ও তার উপরের স্তরের কর্মচারীরা এই ভাতা পেতেন।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী উপকৃত হবেন। এছাড়া, সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীরাও এর আওতাভুক্ত হবেন, যার ফলে মোট ৩৩ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন।
জানানো হয়েছে যে, নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বছরে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। মধ্যমেয়াদি বাজেট–কাঠামোতে এই অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এই নতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি অপরিহার্য
বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন যে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে হলে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা আবশ্যক। তবে, বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব সংগ্রহ ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি ছিল ৮৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে, অর্থাৎ ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। বিগত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে, যা ছিল মাত্র ১২.৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসের রাজস্ব আয়ের হিসাব এখনও এনবিআর চূড়ান্ত করেনি।
সরকারের আয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে এনবিআরে দীর্ঘকাল ধরে বড় ধরনের সংস্কারের অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থের সংস্থানে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তবে, সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে।
অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরের সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা ছিল। এ বিষয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি হলেও বিএনপি সরকার তা পাস করেনি। গত ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠিত হয় পর্যালোচনা করার জন্য, কিন্তু সেই কমিটি এখনও তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
এদিকে, গত ২৩ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এনবিআরের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সংক্রান্ত একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত করজাল বিস্তৃত করা হবে এবং কর ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণরূপে স্বয়ংক্রিয় করা হবে। ভ্যাটের হার একক হবে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যা বর্তমানে ৭ শতাংশের সামান্য বেশি।
ব্যবসা-বাণিজ্যকে সচল রাখা অত্যাবশ্যক
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হবে। তবে, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতিশীলতা অনুপস্থিত। নতুন বিনিয়োগের কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ নেই এবং কর্মসংস্থানও সীমিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে ২২ শতাংশের নিচে চলে এসেছে।
চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ কতটা আকৃষ্ট হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই সংকটের ফলে ইতিমধ্যেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, এবং পণ্য উৎপাদন বিঘ্নিত হলে রাজস্ব আদায়ও হ্রাস পাবে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান Desi Media Point-কে জানান যে, ব্যবসা-বাণিজ্য মন্থর গতিতে চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি না এলে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে না। তবে, তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমানো না হয় এবং অর্থ ছাপিয়ে যেন বেতন-ভাতা প্রদান করা না হয়।
সেলিম রায়হানের মতে, বেসরকারি খাত বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। নতুন বিনিয়োগের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্য যদি সচল না থাকে, তাহলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা তাদের কর্মীদের বেতন বাড়াতে আগ্রহী হবেন না।