Tue 1st Sep 2026, 11:13 am

নভেম্বরেই বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

নভেম্বরেই বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও বেশ কিছু বিলম্বের পর অবশেষে দেশের বহু-প্রত্যাশিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আগামী নভেম্বর মাসে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসছে। বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে এটি জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগান দেওয়ার মাধ্যমে জাতিকে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের এক নতুন যুগে প্রবেশ করাবে।

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক জ্বালানি ক্লাবের সদস্যপদ লাভ করবে।

বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পূর্বে প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলেটেড ভালভ (পিওআরভি)-এর কারিগরি ত্রুটি মেরামতের কাজ চলছে। এই মেরামত সম্পন্ন হওয়ার পর বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটিয়ে পাওয়ার স্টার্টআপ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পূর্বে (বি-টু-ধাপে) দুই থেকে তিন সপ্তাহ এবং টারবাইন ব্যবহার করে ৩০% স্ট্রিম উৎপাদনে ছয় সপ্তাহ সহ মোট প্রায় নয় সপ্তাহ বা দুই মাস সময় লাগতে পারে।

এই সময়সীমা বিবেচনা করলে, যদি আদর্শ কর্মসূচি অনুসরণ করা হয়, তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী নভেম্বর মাসেই উৎপাদনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট পারমাণবিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ সহ মূল্য ১০ টাকার নিচে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহৃত জ্বালানি বা 'স্পেন্ট ফুয়েল' এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাশিয়া সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের এখনও কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। এছাড়াও, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন অন্যান্য তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ না থাকায় বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ বিরাজ করছে।

যেভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে: রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, বি-ওয়ান ধাপ থেকে জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া শুরু হয়। এটি সম্পন্ন হলে ফিউশন রিয়্যাকশন শুরু করা হয়। বি-টু ধাপকে অনেক সময় 'ফিজিক্যাল স্টার্টআপ' হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, বি-টু ধাপের অর্থ হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোড করা হয়েছে, ফিজিক্যাল স্টার্টআপ সমাপ্ত হয়েছে, এবং এখন ফিউশন রিয়্যাকশন শুরু করা হবে। এই ফিউশন রিয়্যাকশনের মাধ্যমে শক্তি বা তাপশক্তি উৎপন্ন হবে।

উৎপন্ন এই তাপশক্তিকে পরবর্তীতে বাষ্পে (স্ট্রিম) রূপান্তরিত করা হবে, যা দিয়ে টারবাইন ঘোরানো হবে। এই টারবাইন ঘূর্ণনের মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।

যে ধাপে কাজ আটকে আছে: সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্প নির্মাণে সংশ্লিষ্টরা এখনও ফিউশন রিয়্যাকশন ধাপে পৌঁছাতে পারেননি। ফিউশন রিয়্যাকশন শুরুর পূর্বে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়, যা 'প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলেটেড ভালভ (পিওআরভি)' নামে পরিচিত। গত দেড় মাস ধরে এই পরীক্ষায় সাফল্য আসেনি। যদি দেড় মাস আগেই এই পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হতো, তাহলে এতক্ষণে ফিউশন রিয়্যাকশন শুরু করে পাওয়ার স্টার্টআপ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করা যেত। এছাড়াও, পিওআরভি পরীক্ষা শেষে যখন ফিউশন রিয়্যাকশন শুরু হবে, তখন সেই পরীক্ষাতেও নতুন করে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করলে, রূপপুর প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী শেষ হওয়া নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে যায়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন গত ২৬ আগস্ট জানান, 'যদি আদর্শ কর্মসূচি অনুসরণ করা হয়, তবে আগামী নভেম্বরের মধ্যেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারবে বলে আমরা আশা করছি। তবে, শেষ মুহূর্তে কোনো পরীক্ষায় অপ্রত্যাশিত সমস্যা দেখা দিলে সময়সীমা আরও পিছিয়ে যেতে পারে।'

দুই অঙ্কের নিচে থাকবে বিদ্যুতের দাম: ২০১৬ সালে রূপপুর প্রকল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ প্রাথমিকভাবে ৪ টাকা ৬৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পিডিবি এই বিষয়ে রূপপুর কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু অতিরিক্ত তথ্য চেয়েছে। এই তথ্যগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর পিডিবির সাথে রূপপুরের বিদ্যুতের মূল্য চূড়ান্ত করা হবে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচের সাথে অপারেশনাল খরচ এবং বীমা খরচও যুক্ত হবে। তবে, সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে, এই মূল্য দুই অঙ্কের হবে না। রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকার নিচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে চূড়ান্ত হয়নি সিদ্ধান্ত: 'স্পেন্ট ফুয়েল' বলতে সেই জ্বালানিকে বোঝানো হয় যা রাশিয়া থেকে রূপপুর প্রকল্পের জন্য আনা হয়েছে। এই জ্বালানি ব্যবহারের পর এটি ১০ বছর পর্যন্ত রিয়্যাক্টরের ভেতরেই সংরক্ষণ করা সম্ভব, ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বাইরে আনার প্রয়োজন হয় না। রাশিয়া এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি 'সরকার-টু-সরকার' চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবহৃত রূপপুরের এই জ্বালানি রাশিয়া তাদের নিজ দেশে ব্যবস্থাপনার জন্য ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তবে, এই ব্যবস্থাপনার জন্য রাশিয়াকে কত টাকা দিতে হবে সেই বাণিজ্যিক চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। যেহেতু এই জ্বালানি দশ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়, তাই এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম গতকাল মন্তব্য করেছেন যে, 'স্পেন্ট ফুয়েলের চেয়েও বর্তমানে যে বিষয়টি অধিক উদ্বেগের, তা হলো এই বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসার পর প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন হবে। এই বর্জ্যগুলো সংরক্ষণের জন্য এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট সংরক্ষণাগার প্রস্তুত করা হয়নি। কর্তৃপক্ষকে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।'

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন