Thu 17th Sep 2026, 11:51 am

নভেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনিশ্চিত, মে মাস পর্যন্ত বিলম্বের সম্ভাবনা ও তার কারণ

নভেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনিশ্চিত, মে মাস পর্যন্ত বিলম্বের সম্ভাবনা ও তার কারণ
নির্বাচন কমিশন (ইসি) যদিও আগামী ১২ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) ভোটের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু চলতি বছর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা, এরপর রমজান এবং এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি বিবেচনায় নিয়ে আগামী মের আগে নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গতকাল বুধবার দেশি মিডিয়া পয়েন্টকে জানান যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করেছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা তাঁদের মতামত এবং প্রস্তুতির অবস্থা তুলে ধরবেন। সবার মতামত পাওয়ার পর কখন নির্বাচন করা সম্ভব, সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। এসব বিবেচনার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তিনি আরও বলেন, সভার আলোচনার আগে নির্দিষ্ট কোনো সময়ের কথা বলা ঠিক হবে না।

এদিকে ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার একটি প্রস্তুতিমূলক সভা ডাকা হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এই সভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, নৌপরিবহন, পররাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য ও সম্প্রচার, স্থানীয় সরকার, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সংস্থার কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, বার্ষিক পরীক্ষা নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে শেষ হওয়ার কথা। সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভোটের সময় নির্ধারণে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও প্রস্তুতির বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার চায় না নির্বাচন আয়োজনের কারণে এতে কোনো ব্যাঘাত ঘটুক। চলতি বছরের শেষ ভাগ এবং আগামী বছরের প্রথম কয়েক মাসের পরীক্ষা, রমজান ও ঈদের সময় মিলিয়ে ভোটের উপযুক্ত সময় বিবেচনা করার জন্য আন্তমন্ত্রণালয় সভায় প্রস্তাব আসতে পারে।

ইসি এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সাতটি ধাপের সম্ভাব্য তারিখ জানিয়েছিল। তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, ওই সময়সূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। পরে ইসি সচিবালয়ও ব্যাখ্যা দিয়েছে যে, তারিখগুলো একেবারেই প্রাথমিক; সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত নিয়ে তা চূড়ান্ত করা হবে।

ঈদের পরপরই রয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী বছরের ১৪ মার্চ পরীক্ষা শুরু হয়ে ১৫ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। এর আগে জানুয়ারিতে পরীক্ষা শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা পরিবর্তন করা হয়। পরীক্ষার এই সময়েও ভোট আয়োজনের পক্ষে নয় সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, শুধু ভোটের দিন পরীক্ষার বাইরে রাখলেই হবে না, নির্বাচনের প্রস্তুতি ও আয়োজনের সময়ও বিবেচনায় নিতে হবে। পরীক্ষার্থীদের ক্ষতি এড়াতে এই সময়ে ভোট আয়োজনের পক্ষে নন সরকার-সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা।

এরপর আগামী বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু এবং ১০ মার্চ ঈদুল ফিতরের সম্ভাবনা ধরে সময় বিবেচনা করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। রমজান ও ঈদের সময়েও নির্বাচন করতে চায় না সরকার।

এসব বিবেচনায় আগামী মে মাসের আগে নির্বাচন শুরুর সম্ভাবনা কম বলে মনে করছে সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে মে মাসেই ভোট হবে—এমন কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। আজকের সভায় মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত পাওয়ার পর সম্ভাব্য সময় নিয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

গত সোমবার নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ জানান। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ১২ নভেম্বর ভোট করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনায় দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর ও তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর ভোটের কথা বলা হয়। পরবর্তী চার ধাপের সম্ভাব্য তারিখ রাখা হয় আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে।

এই সময়সূচি সামনে আসার পর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সরকারের সঙ্গে আলোচনা না হওয়ার বিষয়টি তোলেন। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ঘোষিত তারিখগুলোর বিষয়ে সরকার কিংবা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অবহিত নয়। সময়সূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে চিঠি আদান-প্রদান বা অন্যভাবেও কোনো আলোচনা হয়নি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়। প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা ও বাজেটের বিষয়গুলো বিবেচনা করে তারিখ ঘোষণা করা হয়।

এরপর ওই দিনই ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ ব্যাখ্যা দেন, আলোচিত তারিখগুলো একেবারেই প্রাথমিক। প্রস্তুতিমূলক আলোচনার ভিত্তিতে পাঁচটি মূল ধাপের পাশাপাশি দুটি অতিরিক্ত ধাপ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত নিয়ে কমিশন সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। ভোটের তারিখও ঠিক করে কমিশন। আর নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়। সেই আলোচনার জন্যই আজকের আন্তমন্ত্রণালয় সভা।

এদিকে নানা প্রশাসনিক ও অন্যান্য অজুহাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করার পরিকল্পিত প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অনির্বাচিত প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মেয়াদ দীর্ঘায়িত হলে জনগণের ভোটাধিকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব আরও পিছিয়ে যাবে। তিনি দ্রুত সুস্পষ্ট ও সময়বদ্ধ নির্বাচনী রূপরেখা ঘোষণা এবং ইসির সিদ্ধান্তে সরকারি হস্তক্ষেপ না করার দাবি জানান।

দেশে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮০। এসব ইউনিয়নে সর্বশেষ বড় পরিসরে কয়েক ধাপে নির্বাচন হয় ২০২১-২২ সালে। প্রথম ধাপে ২০২১ সালের ২১ জুন ২০৪টি ইউনিয়নে ভোট হয়। এর বড় অংশ ছিল বরিশাল বিভাগে। শুধু বরিশাল জেলার ৯ উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নে সেদিন ভোট হয়েছিল। ওই ভোটের পাঁচ বছর পেরিয়েছে গত জুনে।

তবে স্থানীয় সরকারের সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের আগের নির্বাচন একই সময়ে হয়নি। উপজেলা পরিষদের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন হয় ২০২৪ সালে; জেলা পরিষদের হয় ২০২২ সালের অক্টোবরে। আবার ২০২৪ সালের আগস্টে ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে আগে ভোট হবে, সেটিও আলাদাভাবে ঠিক করতে হবে।

এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না। ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত আইনও সংশোধন হয়েছে।

নির্বাচনের সময় নির্ধারণের আলোচনার মধ্যে মেয়াদ শেষ হওয়া ইউনিয়নগুলোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। বরিশালের ১৯টি ইউনিয়নে নিয়মিত কাজ চালাতে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানও চলছে প্রশাসক দিয়ে। নির্বাচন আগামী মে মাস পর্যন্ত পিছিয়ে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পেতে মানুষের অপেক্ষা আরও বাড়বে।