Mon 28th Sep 2026, 5:35 pm

জাপানের ‘মুকোয়োশি’ প্রথা: জামাই দত্তক নিয়ে পারিবারিক উত্তরাধিকার রক্ষা, বাংলাদেশিদের জন্য উন্মোচিত সুযোগ

জাপানের ‘মুকোয়োশি’ প্রথা: জামাই দত্তক নিয়ে পারিবারিক উত্তরাধিকার রক্ষা, বাংলাদেশিদের জন্য উন্মোচিত সুযোগ
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ করে একজন জামাই কেবল পারিবারিক সম্পর্কের অংশীদার নন, বরং নতুনভাবে পরিবারের সদস্য হিসেবে গৃহীত হন। এমন পরিস্থিতিতে তার নামের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির পদবি যুক্ত হয় এবং ধীরে ধীরে পরিবারের ব্যবসা, সম্পদ ও বহু প্রজন্মের উত্তরাধিকার তার হাতে ন্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

জাপানি সমাজে এই চিত্রটি মোটেও অপরিচিত নয়। বরং, এটি দেশটির একটি সুপ্রাচীন সামাজিক ও আইনি প্রথা, যেখানে কন্যাসন্তানের স্বামীকেই দত্তক পুত্র এবং পারিবারিক উত্তরাধিকারী হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই প্রথাটি 'মুকোয়োশি' নামে পরিচিত, যার সরল বাংলা প্রতিশব্দ হতে পারে 'দত্তক জামাতা'।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে দত্তক বলতে সাধারণত শিশুদের নতুন পরিবারে লালন-পালনের ধারণাই প্রচলিত। তবে জাপানের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন; এখানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের দত্তক গ্রহণের রীতি অত্যন্ত সুপ্রচলিত। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির মোট দত্তক গ্রহণের ৯০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে এর নেপথ্যে কেবল পারিবারিক আবেগই নয়, সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশও বিদ্যমান।

জাপানে বহু প্রাচীন পারিবারিক ব্যবসা এখনো বংশানুক্রমিকভাবে পরিচালিত হয়। যদি কোনো পরিবারে পুত্রসন্তান না থাকে অথবা নিজস্ব পুত্রকে ব্যবসার উপযুক্ত উত্তরাধিকারী মনে না করা হয়, সেক্ষেত্রে তারা একজন যোগ্য পুরুষকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

যদি সেই ব্যক্তি কন্যাসন্তানের স্বামী হন, তবে প্রক্রিয়াটি আরও সরল হয়ে যায়। বিয়ের পর তাকে দত্তক গ্রহণ করা হলে তিনি শ্বশুরবাড়ির পদবি গ্রহণ করেন এবং পর্যায়ক্রমে পরিবারের ব্যবসা, সম্পদ ও উত্তরাধিকার তার কাছে হস্তান্তরিত হতে পারে।

এক্ষেত্রে সম্পর্কটি কেবল 'জামাতা' পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তিনি পরিবারেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন, অনেক সময় ভবিষ্যৎ প্রধান হিসেবেও বিবেচিত হন।

'মুকোয়োশি' প্রথার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো ধারাবাহিকতা রক্ষা। পরিবারের পদবির বিলুপ্তি রোধ, ব্যবসার নেতৃত্ব পরিবারের মধ্যেই রাখা এবং শত বছরের প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী প্রজন্মেও সচল রাখা—এই তিনটি লক্ষ্য পূরণে প্রথাটি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

জাপানি সমাজে প্রথাগতভাবে বিয়ের পর স্ত্রী স্বামীর পদবি গ্রহণ করেন। ফলস্বরূপ, পুত্রসন্তানবিহীন পরিবারগুলোতে পদবি বিলুপ্তির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। কন্যাসন্তানের স্বামীকে দত্তক গ্রহণ করে তাকে পরিবারের পদবি প্রদানের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হয়।

এ প্রক্রিয়ায় একজন জামাতা একই সাথে পরিবারের পুত্র, ব্যবসার উত্তরসূরি এবং বংশের নাম ধারণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

জাপানের বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাসেও 'মুকোয়োশি' প্রথার প্রভাব লক্ষণীয়। সুজুকি মোটর কর্পোরেশনের নেতৃত্ব পদে একাধিকবার দত্তক পুত্রের আগমন ঘটেছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের প্রধান, ওসামু সুজুকি, নিজেও এই প্রথার মাধ্যমে পরিবারে আসা একজন দত্তক জামাতা ছিলেন।

নিনটেনডো, কিক্কোমান এবং টয়োটার মতো জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের উত্তরাধিকার পদ্ধতির সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়েছে।

সুতরাং, জাপানের কিছু স্বনামধন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক ধারাবাহিকতার নেপথ্যে এই অনন্য অথচ কার্যকর সামাজিক প্রথাটির অবদান অনস্বীকার্য।

'মুকোয়োশি' প্রথার প্রয়োগ কেবল ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরাধিকার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও প্রাপ্তবয়স্কদের দত্তক গ্রহণের ঘটনা ঘটে। বিশেষত নিঃসন্তান দম্পতিরা তাদের সম্পত্তির ভবিষ্যৎ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন। এই দত্তক প্রক্রিয়া জাপানের সরকারি পারিবারিক নথি 'কোসেকি'-তে নিবন্ধিত হয়। দত্তক গ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর ব্যক্তি নতুন পরিবারের পদবি গ্রহণ করেন এবং জন্মগত সন্তানের মতোই উত্তরাধিকার ও পারিবারিক দায়িত্ব লাভ করেন।

তবে এই অধিকারের সঙ্গে কিছু দায়িত্বও বর্তায়। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনার ভারও অনেক সময় দত্তক নেওয়া সন্তানের ওপর ন্যস্ত হতে পারে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই ব্যবস্থায় কি বিদেশিদেরও অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে? বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, জাপানে দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত বিদেশিরাও নির্দিষ্ট শর্তাবলী পূরণের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দত্তক হতে পারেন। যদিও কিছু ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন অপরিহার্য।

অর্থাৎ, যদি কোনো বাংলাদেশি ব্যক্তি উল্লিখিত শর্তাবলী পূরণ করেন, তবে তিনি জাপানি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক দত্তক সন্তান হিসেবে গৃহীত হতে পারেন। তবে শুধুমাত্র দত্তক গ্রহণের মাধ্যমে জাপানের নাগরিকত্ব বা ভিসা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকে না; এগুলোর জন্য পৃথক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

আধুনিক জাপানে জন্মহার হ্রাসের প্রেক্ষাপটে এই প্রথার গুরুত্বে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। অনেক পারিবারিক ব্যবসার মালিকের কন্যাসন্তান থাকলেও পুত্রসন্তান নাও থাকতে পারে। উপরন্তু, নিজের সন্তান ব্যবসায়িক পরিচালনায় আগ্রহী বা উপযুক্ত না হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের সামনে শত বছরের পুরনো ব্যবসা পরিচালনার প্রশ্নটি গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কোনো কোনো পরিবার পুত্রসন্তানের জন্মের অপেক্ষায় না থেকে একজন উপযুক্ত জামাতাকেই বেছে নেয়। এমনকি যোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করার জন্য জাপানে বিশেষ পাত্র-পাত্রী সন্ধান সেবারও (matchmaking services) অস্তিত্ব রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জাপানে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে—'পুত্র নির্বাচন করা যায় না, কিন্তু জামাতা নির্বাচন করা যায়।'

তবে সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে 'মুকোয়োশি' প্রথার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আধুনিক জাপানে নারীরা ব্যবসা, রাষ্ট্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় কেবল পুরুষ উত্তরাধিকারী খোঁজার প্রাচীন ধারণাটি কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিয়ে আলোচনা বিদ্যমান। তবুও, এই প্রথাটি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

কারও কাছে এটি একজন জামাতাকে পারিবারিক সদস্য হিসেবে গ্রহণ করার এক গভীর উপাখ্যান। আবার কারও কাছে এটি শতবর্ষী ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার একটি কার্যকর কৌশল। অন্য অনেকের কাছে এটি পরিবারের পদবি, সম্পদ ও উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সুচারুভাবে হস্তান্তরের এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।

সুতরাং, জাপানের 'মুকোয়োশি' কেবল দত্তক গ্রহণের সাধারণ গল্প নয়। এর গভীরে নিহিত রয়েছে বিবাহ, পরিবার, ব্যবসা, উত্তরাধিকার এবং পরিবর্তনশীল সমাজের এক অনন্য সহাবস্থানের জটিল আখ্যান।