Wed 30th Sep 2026, 2:03 pm

হজরত আয়েশা (রা.) ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ নামে কেন পরিচিতি লাভ করেন?

হজরত আয়েশা (রা.) ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ নামে কেন পরিচিতি লাভ করেন?
হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.), যাকে 'সিদ্দিকা' এবং 'উম্মুল মুমিনিন' সহ বহু মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে, তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে 'উম্মে আবদুল্লাহ' বা 'আবদুল্লাহর মা' উপাধিটিও বিশেষভাবে জড়িত। অবাক করার মতো বিষয় হলো, আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর কোনো সন্তান ছিল না। তাহলে কেন তাকে 'উম্মে আবদুল্লাহ' নামে সম্বোধন করা হতো? এর উত্তর স্বয়ং আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়।

একদিন তিনি নবীজি (সা.)-এর দরবারে আরজ করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, (আমি ব্যতীত) আমার সব সখীদেরই পারিবারিক নাম (কুনিয়ত) রয়েছে।' তখন নবীজি (সা.) উত্তরে বললেন, 'তুমি তোমার (বোনের) ছেলে আবদুল্লাহর নামে কুনিয়ত গ্রহণ করো।' (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৭০)।

বর্ণনাকারী মুসাদ্দাদ (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, এখানে আবদুল্লাহ বলতে বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরকে বোঝানো হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকেই আয়েশা (রা.)-এর কুনিয়ত 'উম্মে আবদুল্লাহ' হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

এই ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ছিল। আয়েশা (রা.) যখন দেখলেন যে তাঁর অন্যান্য সপত্নী ও সখীদের প্রত্যেকেরই একটি করে কুনিয়ত রয়েছে, তখন তাঁরও নিজের একটি সুন্দর পরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা জাগে। তিনি বিনয়ের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর কাছে এই বিষয়টি পেশ করেন। এটি প্রমাণ করে যে, আরব সমাজে কুনিয়ত শুধু নামের বিকল্প কোনো সম্বোধন ছিল না, বরং এটি ছিল পরিচয় ও সম্মানের একটি প্রতিষ্ঠিত রীতি। নবীজি (সা.) তাঁর এই ন্যায্য ইচ্ছাকে উপেক্ষা করেননি, বরং এমন একজনের সঙ্গে তাঁর কুনিয়ত যুক্ত করলেন যার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।

সাধারণত 'উম্ম' অর্থ 'মা' এবং কোনো ব্যক্তির কুনিয়ত 'উম্মে অমুক' হলে মনে করা হয়, 'অমুক' তার সন্তান। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের জন্মদাত্রী মাতা ছিলেন না, বরং ছিলেন তাঁর খালা।

আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাহাবি এবং ইসলামের ইতিহাসে এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর পিতা ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি জুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.) এবং মাতা ছিলেন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর বড় বোন আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)।

খালা এবং ভাগনের সম্পর্ক আরব সমাজে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হতো। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক আরও অধিক মর্যাদাপূর্ণ ছিল, কারণ তিনি ছিলেন নবীজি (সা.)-এর স্ত্রী এবং তাঁর ভাগনে ছিলেন সাহাবায়ে কেরামের এক সম্মানিত পরিবারের সন্তান। অর্থাৎ, এখানে মাতৃত্বের সম্পর্কটি জন্মসূত্রের নয়, বরং গভীর আত্মীয়তা, স্নেহ এবং ভালোবাসার পরিচায়ক।

এই ঘটনাটি কুনিয়ত সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে। তা হলো, কুনিয়ত গ্রহণের জন্য নিজের সন্তান থাকা আবশ্যক নয়। উপযুক্ত সম্পর্ক, গভীর ভালোবাসা অথবা সম্মান প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও কুনিয়ত ব্যবহৃত হতে পারে। 'উম্মে আবদুল্লাহ' নামটি হজরত আয়েশা (রা.)-এর জীবনের আরেকটি কোমল অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে সন্তান জন্মদানের দাবি অনুপস্থিত, বরং একজন প্রিয় ভাগনের প্রতি অতুলনীয় স্নেহ এবং নবীজি (সা.) কর্তৃক প্রদত্ত একটি বিশেষ পরিচয়ের স্মৃতি বিদ্যমান। সন্তান না থাকলেও একজন নারী 'উম্ম' নামে পরিচিতি লাভ করতে পারেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগের এই ঘটনাই তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।