Sun 19th Jul 2026, 4:28 am

বাংলা কিউআর: সময়োপযোগী পদক্ষেপ, তবে কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণই এখন প্রধান লক্ষ্য

বাংলা কিউআর: সময়োপযোগী পদক্ষেপ, তবে কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণই এখন প্রধান লক্ষ্য
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের 'বাংলা কিউআর' একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পূর্বে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বতন্ত্র কিউআর কোড ব্যবহারের কারণে গ্রাহকদের একাধিক প্ল্যাটফর্মের জটিলতার সম্মুখীন হতে হতো। বর্তমানে একক ও সর্বজনীন 'বাংলা কিউআর' প্রবর্তনের ফলে যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএসের অ্যাপ ব্যবহার করে একই কিউআর কোড স্ক্যান করে সহজে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে। এটি দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি।

এই উদ্যোগের প্রাথমিক ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। 'বাংলা কিউআর' বাধ্যতামূলক হওয়ার পর দৈনিক ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য ১১ থেকে ১২ কোটি টাকা। তবে, একই সময়ে ব্যাংক ও এমএফএস-এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩৪০ কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন হচ্ছে। এর অর্থ হলো, মোট ডিজিটাল লেনদেনের তুলনায় 'বাংলা কিউআর'-এর ব্যবহার এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। ফলস্বরূপ, এটিকে কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা না করে, এর ব্যাপক সম্প্রসারণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

এই চ্যালেঞ্জের মূলে বেশ কিছু বাস্তবিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। এর মধ্যে প্রধানতম হলো খুচরা বিক্রেতাদের সীমিত অংশগ্রহণ। 'বাংলা কিউআর' ব্যবহারের জন্য বিক্রেতাদের ব্যাংক বা এমএফএস-এ রিটেইল হিসাব খোলা অপরিহার্য। তবে, এই হিসাব খোলার প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল করা সম্ভব হয়নি। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের জটিলতা এবং আনুষ্ঠানিকতার কারণে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই সেবার পরিধির বাইরে থেকে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাই লেনদেনের একটি বৃহৎ অংশীদার। তাঁদের বাদ দিয়ে কোনো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সার্বজনীন জনপ্রিয়তা অর্জন করা কঠিন।

আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো লেনদেন মাশুল। বর্তমানে সকল আকারের বিক্রেতাদের 'বাংলা কিউআর'-এর মাধ্যমে অর্থ গ্রহণে ১ শতাংশ পর্যন্ত ফি প্রদান করতে হচ্ছে। পূর্বে বহু ছোট দোকান, পরিবেশক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই ধরনের লেনদেনে কোনো মাশুল প্রদান করত না। ফলস্বরূপ, নতুন এই ব্যবস্থায় তাদের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অনেক ব্যবসায়ীর আগ্রহ হ্রাসের কারণ। ডিজিটাল লেনদেনের প্রাথমিক পর্যায়ে এই ধরনের মাশুল আরোপের পরিবর্তে খাতভিত্তিক ফি নির্ধারণ অথবা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত মাশুল মওকুফের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। বিশ্বের বহু দেশে ডিজিটাল পেমেন্টকে জনপ্রিয় করার জন্য সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি প্রাথমিকভাবে অনুরূপ প্রণোদনা প্রদান করেছে।

কেবল বিক্রেতা নন, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও উৎসাহে ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একজন বিক্রেতাকে 'বাংলা কিউআর'-এর আওতায় আনতে তাদের প্রায় ৫০০ টাকা ব্যয় করতে হয়। কিন্তু এই ব্যয়ের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রণোদনা বা ব্যবসায়িক সুবিধা না থাকায় ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সম্প্রসারণে তেমন আগ্রহী হচ্ছে না। এর ফলস্বরূপ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত গতি অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

উপরন্তু, কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যাও বিদ্যমান। অনেক গ্রাহক এখনো তাঁদের মোবাইল অ্যাপ হালনাগাদ করেননি। বিভিন্ন স্থানে নেটওয়ার্ক সমস্যা, অ্যাকাউন্ট বা কিউআর কোডের ত্রুটি ইত্যাদি কারণে লেনদেন ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদিও এসব সমস্যাকে সাময়িক এবং ধীরে ধীরে সমাধানযোগ্য বলে অভিহিত করছে, তবে ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রথম অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রারম্ভিক পর্যায়ে যদি ব্যবহারকারীরা বারবার সমস্যার সম্মুখীন হন, তাহলে তাঁদের আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ডিজিটাল অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপনে 'বাংলা কিউআর' নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল উদ্যোগ। এখন প্রয়োজন এর ব্যাপক বিস্তৃতি এবং কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য দৃঢ় সদিচ্ছা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যাংক, এমএফএস প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে নিবিড় সমন্বয় সাধন করে একটি বাস্তবসম্মত ও সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।