বার্সেলোনার উত্তরে ছোট্ট এক শহর। নাম মোলেত দেল ভালেস।
সেখানকার রাস্তায় ফুটবল খেলত এক ছোট্ট মেয়ে। বাড়িতে টেলিভিশনে ফুটবল চলত প্রায় সারাক্ষণ।
মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে দেখত আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পায়ের জাদু। রিভালদো আর রোনালদিনহোর ফুটবলও তাকে টানত চুম্বকের মতো।
সুযোগ পেলেই ছুটে যেত ক্যাম্প ন্যুতে। বার্সেলোনার খেলা দেখতে।
সেই মেয়েটি একদিন বার্সেলোনারই রানি হয়ে গেল। আলেক্সিয়া পুতেয়াস।
ফুটবল বিশ্ব তাঁকে ডাকে ‘লা রেইনা’ নামে। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘রানি’।
কিন্তু রানির জীবনেও তো দুঃসময় আসে। মুকুট হারানোর ভয় থাকে।
কখনো কখনো সিংহাসনটাই নড়ে যায়। পুতেয়াসের জীবনেও এসেছিল তেমন এক সময়।
২০২২ সালে হাঁটুর ভয়ংকর চোট তাঁর ক্যারিয়ারটাই প্রায় শেষ করে দিয়েছিল। অথচ চার বছর পর সেই পুতেয়াস আবার বিশ্বসেরা।
তৃতীয়বারের মতো জিতলেন মেয়েদের ব্যালন ডি’অর। ৩২ বছর বয়সী স্প্যানিশ মিডফিল্ডার এ নিয়ে ছুঁয়ে ফেললেন স্বদেশি আইতানা বোনমাতির রেকর্ড।
২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুবার পুরস্কারটি জিতেছিলেন পুতেয়াস। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশ্বসেরার মুকুট ওঠে বোনমাতির মাথায়।
এবার আবার পুতেয়াস। মেয়েদের ফুটবলে ব্যালন ডি’অর যেন স্পেনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে গেছে!
টানা ছয় বছর পুরস্কারটি গেল স্প্যানিশ ফুটবলারের হাতে। ২০১৮ সালে নরওয়ের আডা হেগেরবার্গ এবং ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেগান র্যাপিনো ছাড়া আর কোনো দেশের ফুটবলার এই পুরস্কার জেতেননি।
তবে পুতেয়াসের এবারের জয় শুধু আরেকটি ট্রফি জেতার গল্প নয়। এ যেন হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পীর আবার নিজের রংতুলি ফিরে পাওয়ার কাহিনি।
২০২২ সালের ইউরোর ঠিক আগে হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে (এসিএল) চোট পান পুতেয়াস। ইউরোতে খেলা হলো না।
সে বছর দ্বিতীয় ব্যালন ডি’অর জিতলেও মাঠে আগের সেই পুতেয়াসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ২০২৩ সালে স্পেন বিশ্বকাপ জিতল।
কিন্তু সেই ঐতিহাসিক সাফল্যে পুতেয়াসের ভূমিকা ছিল সীমিত। যে ফুটবলার একসময় ছিলেন দলের প্রাণ, তাঁকেই কি না বিশ্বজয়ের উৎসবে থাকতে হলো অনেকটা পার্শ্বচরিত্র হয়ে!
কেমন লেগেছিল তাঁর? হয়তো ভেতরে ভেতরে পুড়েছেন।
হয়তো নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন, আগের সেই ফুটবল কি আর কখনো খেলতে পারবেন? উত্তরটা ধীরে ধীরে দিয়েছেন মাঠে।
২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে গোল করলেন। পরের মৌসুমে আরও ভালো খেললেন।
আর ২০২৫-২৬ মৌসুমে তো পুরোনো পুতেয়াসকে পুরোপুরি ফিরে পেল ফুটবল বিশ্ব। বার্সেলোনার হয়ে চারটি ট্রফি জিতলেন।
অধিনায়ক হিসেবে দলকে এনে দিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। বোনমাতি চোটের কারণে পাঁচ মাস মাঠের বাইরে থাকায় দলের আক্রমণ গড়ে তোলার বড় দায়িত্বও নিতে হলো তাঁকে।
রানির মতোই পালন করেছেন সেই দায়িত্ব। পুতেয়াসের ফুটবলকে শুধু গোল দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে।
তিনি গোল করেন, গোল করান। কখনো মাঝমাঠ থেকে এমন পাস দেন, যাতে প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণই এলোমেলো হয়ে যায়।
গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২১ গোল করেছেন। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১৩টি।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ফুটবলারদের মধ্যে গোলসংখ্যায় তৃতীয়, অ্যাসিস্টে দ্বিতীয়। চ্যাম্পিয়নস লিগেই করেছেন ৭ গোল।
বার্সেলোনা জিতেছে ছয় মৌসুমে চতুর্থ ইউরোপিয়ান শিরোপা। এই প্রতিযোগিতায় তাঁর চেয়ে বেশি গোল করেছেন শুধু এভা পায়োর (১১), আলেসিয়া রুসো (৯) ও পারনিলে হার্ডার (৮)।
তিনজনই মূলত স্ট্রাইকার। পুতেয়াস কিন্তু মিডফিল্ডার!
আরও পড়ুনকেইন ও পুতেয়াসের মুখে ব্যালন ডি’অর জয়ের হাসি ৯ ঘণ্টা আগেটানা সপ্তমবার স্প্যানিশ লিগ জেতা বার্সেলোনার হয়ে লিগে ৭টি অ্যাসিস্ট করেছেন। এই হিসাবে যৌথভাবে ষষ্ঠ।
ওপেন প্লে থেকে গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৪০টি, যা লিগে চতুর্থ সর্বোচ্চ। আরেকটি পরিসংখ্যান দেখুন।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ওপেন প্লে থেকে শটে শেষ হওয়া আক্রমণের ধারায় পুতেয়াসের অংশগ্রহণ ছিল ১৫১ বার। তাঁর ওপরে শুধু ক্লদিয়া পিনা (১৯৯), ভিকি লোপেজ (১৮৩) ও জর্জিয়া স্ট্যানওয়ে (১৬৮)।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পুতেয়াস গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৮৯টি। এর মধ্যে বড় সুযোগ ১৯টি।
আক্রমণভাগের শেষ এক-তৃতীয়াংশে সফল পাস দিয়েছেন ৯৬৫টি। স্প্যানিশ লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা দে লা রেইনা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ মিলিয়ে এই দুই হিসাবে তাঁর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন না কেউ।
চ্যাম্পিয়নস লিগে একাই ৩৬টি সুযোগ তৈরি করেছেন। বায়ার্ন মিউনিখের ক্লারা বুল ছাড়া আর কেউ এত সুযোগ তৈরি করতে পারেননি।
২০২১-২২ মৌসুমে ক্যারোলিন গ্রাহাম হ্যানসেনের ৩৮টির পর এক আসরে এটাই সর্বোচ্চ। সংখ্যাগুলো কী বলছে?
পুতেয়াস শুধু ফিরে আসেননি। নিজের পুরোনো শ্রেষ্ঠত্বকেও যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিকদের ভোটে তাই তিনিই সেরা। দ্বিতীয় বার্সেলোনার স্ট্রাইকার এভা পায়োর।
তৃতীয় ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড খাদিজা শ। আরও পড়ুনব্যালন ডি’অর জয়ের পর কি তাহলে ‘স্যার’ হ্যারি কেইন ৩ ঘণ্টা আগেপুতেয়াসের জন্ম বার্সেলোনা থেকে প্রায় ১২ মাইল উত্তর-পূর্বে মোলেত দেল ভালেসে।
রাস্তায় ফুটবল খেলতে খেলতেই বড় হয়েছেন। একসময় জাভির পরিচালিত গ্রীষ্মকালীন ফুটবল ক্যাম্পে অংশ নেন।
খেলেন স্থানীয় ক্লাব সিই সাবাদেলে। এরপর বার্সেলোনার বিখ্যাত ফুটবল একাডেমি লা মাসিয়ায় এক বছর কাটান।
কিন্তু মেয়েদের দলটি ভেঙে যাওয়ায় ছাড়তে হয় বার্সেলোনা। খেলেছেন এসপানিওল ও লেভান্তেতে।
শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে ফিরে আসেন শৈশবের ভালোবাসার ক্লাবে। তারপর কেটে গেছে ১৪ বছর।
এই দীর্ঘ সময়ে বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন ৩৮টি ট্রফি। এর মধ্যে ১০টি লিগ শিরোপা, চারটি ইউরোপিয়ান কাপ।
একসময় যে মেয়েটি গ্যালারিতে বসে ইনিয়েস্তাদের খেলা দেখতেন, সেই মেয়েই হয়ে উঠলেন বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার। কিন্তু সব প্রেমের গল্পের শেষটা এক রকম হয় না।
২০২৫-২৬ মৌসুমের শেষে বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায় পুতেয়াসের। চাইলে হয়তো থেকে যেতে পারতেন।
কিন্তু নতুন চ্যালেঞ্জের ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি। জুনে ইংল্যান্ডকে ৪-০ গোলে হারানোর ম্যাচে জোড়া গোল করে স্পেনকে ২০২৭ বিশ্বকাপে তুলে দিয়েছিলেন।
ইংল্যান্ডের লায়নেসদের বিশ্বকাপে ওঠার আশা শেষ করে দেওয়ার পরের মাসেই কি না নিজে পাড়ি জমালেন ইংল্যান্ডে! ইংল্যান্ড, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে একাধিক প্রস্তাব পেয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন মার্কিন ধনকুবের মিশেল কাংয়ের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প লন্ডন সিটি লায়নেসেসকে। জুলাইয়ে বার্সেলোনা ছেড়ে ইংলিশ উইমেনস সুপার লিগের ক্লাবটিতে যোগ দেন।
বিদায়ের সময় পুতেয়াস কেঁদেছেন। কেঁদেছেন তাঁর ভক্তরাও।
১৪ বছরের সম্পর্ক কি আর এত সহজে ছিন্ন করা যায়! তবু জীবন তো থেমে থাকে না।
আরও পড়ুনমেসি এবার ব্যালন ডি’অরে পঞ্চম, অন্যরা কে কত নম্বরে ৩৪ মিনিট আগেআগস্টে বিবিসির ‘উইমেনস ফুটবল উইকলি’ পডকাস্টে পুতেয়াস বলেছিলেন, ‘আমি সব সময় আরও ভালো কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকি। সে কারণেই এখানে এসেছি।
মানুষ ও খেলোয়াড় হিসেবে আমাকে সব সময় এগিয়ে যেতে হয়।’ নতুন ক্লাবে প্রথম সাত লিগ ম্যাচে করেছেন ৩ গোল, অ্যাসিস্ট ১টি। ৩২ বছর বয়সেও তাঁর পায়ে ফুটবলের জাদু যে ফুরিয়ে যায়নি, সেটি বোঝানোর জন্য এই সংখ্যাই যথেষ্ট।
তবে এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের পর পুতেয়াস যা বলেছেন, তা হয়তো তাঁর গোল কিংবা ট্রফির চেয়েও বড়, ‘পৃথিবীর সব ছেলে ও মেয়েকে বলছি, তোমরা যদি ফুটবল ভালোবাসো, যদি ফুটবল খেলতে চাও, তাহলে খেলো। তুমি ছেলে না মেয়ে, তাতে কিছু যায় আসে না।
কোথা থেকে এসেছ, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেউ যদি বলে তুমি পারবে না, তার কথা শুনবে না।
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখবে।’ কথাগুলো শুনে মোলেত দেল ভালেসের সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে পড়ে যায়। যে রাস্তায় ফুটবল খেলত।
ন্যু ক্যাম্পে বসে স্বপ্ন দেখত। তারপর একদিন নিজেই হয়ে উঠেছিল অন্যদের স্বপ্ন দেখার প্রেরণা।
মাঝখানে এসেছিল ভয়ংকর চোট। হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
প্রিয় ক্লাব ছেড়ে চলে যাওয়ার বেদনা। কিন্তু রানি কি আর এত সহজে হারিয়ে যান!
সেখানকার রাস্তায় ফুটবল খেলত এক ছোট্ট মেয়ে। বাড়িতে টেলিভিশনে ফুটবল চলত প্রায় সারাক্ষণ।
মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে দেখত আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পায়ের জাদু। রিভালদো আর রোনালদিনহোর ফুটবলও তাকে টানত চুম্বকের মতো।
সুযোগ পেলেই ছুটে যেত ক্যাম্প ন্যুতে। বার্সেলোনার খেলা দেখতে।
সেই মেয়েটি একদিন বার্সেলোনারই রানি হয়ে গেল। আলেক্সিয়া পুতেয়াস।
ফুটবল বিশ্ব তাঁকে ডাকে ‘লা রেইনা’ নামে। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘রানি’।
কিন্তু রানির জীবনেও তো দুঃসময় আসে। মুকুট হারানোর ভয় থাকে।
কখনো কখনো সিংহাসনটাই নড়ে যায়। পুতেয়াসের জীবনেও এসেছিল তেমন এক সময়।
২০২২ সালে হাঁটুর ভয়ংকর চোট তাঁর ক্যারিয়ারটাই প্রায় শেষ করে দিয়েছিল। অথচ চার বছর পর সেই পুতেয়াস আবার বিশ্বসেরা।
তৃতীয়বারের মতো জিতলেন মেয়েদের ব্যালন ডি’অর। ৩২ বছর বয়সী স্প্যানিশ মিডফিল্ডার এ নিয়ে ছুঁয়ে ফেললেন স্বদেশি আইতানা বোনমাতির রেকর্ড।
২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুবার পুরস্কারটি জিতেছিলেন পুতেয়াস। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশ্বসেরার মুকুট ওঠে বোনমাতির মাথায়।
এবার আবার পুতেয়াস। মেয়েদের ফুটবলে ব্যালন ডি’অর যেন স্পেনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে গেছে!
টানা ছয় বছর পুরস্কারটি গেল স্প্যানিশ ফুটবলারের হাতে। ২০১৮ সালে নরওয়ের আডা হেগেরবার্গ এবং ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেগান র্যাপিনো ছাড়া আর কোনো দেশের ফুটবলার এই পুরস্কার জেতেননি।
তবে পুতেয়াসের এবারের জয় শুধু আরেকটি ট্রফি জেতার গল্প নয়। এ যেন হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পীর আবার নিজের রংতুলি ফিরে পাওয়ার কাহিনি।
২০২২ সালের ইউরোর ঠিক আগে হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে (এসিএল) চোট পান পুতেয়াস। ইউরোতে খেলা হলো না।
সে বছর দ্বিতীয় ব্যালন ডি’অর জিতলেও মাঠে আগের সেই পুতেয়াসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ২০২৩ সালে স্পেন বিশ্বকাপ জিতল।
কিন্তু সেই ঐতিহাসিক সাফল্যে পুতেয়াসের ভূমিকা ছিল সীমিত। যে ফুটবলার একসময় ছিলেন দলের প্রাণ, তাঁকেই কি না বিশ্বজয়ের উৎসবে থাকতে হলো অনেকটা পার্শ্বচরিত্র হয়ে!
কেমন লেগেছিল তাঁর? হয়তো ভেতরে ভেতরে পুড়েছেন।
হয়তো নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন, আগের সেই ফুটবল কি আর কখনো খেলতে পারবেন? উত্তরটা ধীরে ধীরে দিয়েছেন মাঠে।
২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে গোল করলেন। পরের মৌসুমে আরও ভালো খেললেন।
আর ২০২৫-২৬ মৌসুমে তো পুরোনো পুতেয়াসকে পুরোপুরি ফিরে পেল ফুটবল বিশ্ব। বার্সেলোনার হয়ে চারটি ট্রফি জিতলেন।
অধিনায়ক হিসেবে দলকে এনে দিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। বোনমাতি চোটের কারণে পাঁচ মাস মাঠের বাইরে থাকায় দলের আক্রমণ গড়ে তোলার বড় দায়িত্বও নিতে হলো তাঁকে।
রানির মতোই পালন করেছেন সেই দায়িত্ব। পুতেয়াসের ফুটবলকে শুধু গোল দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে।
তিনি গোল করেন, গোল করান। কখনো মাঝমাঠ থেকে এমন পাস দেন, যাতে প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণই এলোমেলো হয়ে যায়।
গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২১ গোল করেছেন। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১৩টি।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ফুটবলারদের মধ্যে গোলসংখ্যায় তৃতীয়, অ্যাসিস্টে দ্বিতীয়। চ্যাম্পিয়নস লিগেই করেছেন ৭ গোল।
বার্সেলোনা জিতেছে ছয় মৌসুমে চতুর্থ ইউরোপিয়ান শিরোপা। এই প্রতিযোগিতায় তাঁর চেয়ে বেশি গোল করেছেন শুধু এভা পায়োর (১১), আলেসিয়া রুসো (৯) ও পারনিলে হার্ডার (৮)।
তিনজনই মূলত স্ট্রাইকার। পুতেয়াস কিন্তু মিডফিল্ডার!
আরও পড়ুনকেইন ও পুতেয়াসের মুখে ব্যালন ডি’অর জয়ের হাসি ৯ ঘণ্টা আগেটানা সপ্তমবার স্প্যানিশ লিগ জেতা বার্সেলোনার হয়ে লিগে ৭টি অ্যাসিস্ট করেছেন। এই হিসাবে যৌথভাবে ষষ্ঠ।
ওপেন প্লে থেকে গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৪০টি, যা লিগে চতুর্থ সর্বোচ্চ। আরেকটি পরিসংখ্যান দেখুন।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ওপেন প্লে থেকে শটে শেষ হওয়া আক্রমণের ধারায় পুতেয়াসের অংশগ্রহণ ছিল ১৫১ বার। তাঁর ওপরে শুধু ক্লদিয়া পিনা (১৯৯), ভিকি লোপেজ (১৮৩) ও জর্জিয়া স্ট্যানওয়ে (১৬৮)।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পুতেয়াস গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৮৯টি। এর মধ্যে বড় সুযোগ ১৯টি।
আক্রমণভাগের শেষ এক-তৃতীয়াংশে সফল পাস দিয়েছেন ৯৬৫টি। স্প্যানিশ লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা দে লা রেইনা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ মিলিয়ে এই দুই হিসাবে তাঁর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন না কেউ।
চ্যাম্পিয়নস লিগে একাই ৩৬টি সুযোগ তৈরি করেছেন। বায়ার্ন মিউনিখের ক্লারা বুল ছাড়া আর কেউ এত সুযোগ তৈরি করতে পারেননি।
২০২১-২২ মৌসুমে ক্যারোলিন গ্রাহাম হ্যানসেনের ৩৮টির পর এক আসরে এটাই সর্বোচ্চ। সংখ্যাগুলো কী বলছে?
পুতেয়াস শুধু ফিরে আসেননি। নিজের পুরোনো শ্রেষ্ঠত্বকেও যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিকদের ভোটে তাই তিনিই সেরা। দ্বিতীয় বার্সেলোনার স্ট্রাইকার এভা পায়োর।
তৃতীয় ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড খাদিজা শ। আরও পড়ুনব্যালন ডি’অর জয়ের পর কি তাহলে ‘স্যার’ হ্যারি কেইন ৩ ঘণ্টা আগেপুতেয়াসের জন্ম বার্সেলোনা থেকে প্রায় ১২ মাইল উত্তর-পূর্বে মোলেত দেল ভালেসে।
রাস্তায় ফুটবল খেলতে খেলতেই বড় হয়েছেন। একসময় জাভির পরিচালিত গ্রীষ্মকালীন ফুটবল ক্যাম্পে অংশ নেন।
খেলেন স্থানীয় ক্লাব সিই সাবাদেলে। এরপর বার্সেলোনার বিখ্যাত ফুটবল একাডেমি লা মাসিয়ায় এক বছর কাটান।
কিন্তু মেয়েদের দলটি ভেঙে যাওয়ায় ছাড়তে হয় বার্সেলোনা। খেলেছেন এসপানিওল ও লেভান্তেতে।
শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে ফিরে আসেন শৈশবের ভালোবাসার ক্লাবে। তারপর কেটে গেছে ১৪ বছর।
এই দীর্ঘ সময়ে বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন ৩৮টি ট্রফি। এর মধ্যে ১০টি লিগ শিরোপা, চারটি ইউরোপিয়ান কাপ।
একসময় যে মেয়েটি গ্যালারিতে বসে ইনিয়েস্তাদের খেলা দেখতেন, সেই মেয়েই হয়ে উঠলেন বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার। কিন্তু সব প্রেমের গল্পের শেষটা এক রকম হয় না।
২০২৫-২৬ মৌসুমের শেষে বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায় পুতেয়াসের। চাইলে হয়তো থেকে যেতে পারতেন।
কিন্তু নতুন চ্যালেঞ্জের ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি। জুনে ইংল্যান্ডকে ৪-০ গোলে হারানোর ম্যাচে জোড়া গোল করে স্পেনকে ২০২৭ বিশ্বকাপে তুলে দিয়েছিলেন।
ইংল্যান্ডের লায়নেসদের বিশ্বকাপে ওঠার আশা শেষ করে দেওয়ার পরের মাসেই কি না নিজে পাড়ি জমালেন ইংল্যান্ডে! ইংল্যান্ড, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে একাধিক প্রস্তাব পেয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন মার্কিন ধনকুবের মিশেল কাংয়ের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প লন্ডন সিটি লায়নেসেসকে। জুলাইয়ে বার্সেলোনা ছেড়ে ইংলিশ উইমেনস সুপার লিগের ক্লাবটিতে যোগ দেন।
বিদায়ের সময় পুতেয়াস কেঁদেছেন। কেঁদেছেন তাঁর ভক্তরাও।
১৪ বছরের সম্পর্ক কি আর এত সহজে ছিন্ন করা যায়! তবু জীবন তো থেমে থাকে না।
আরও পড়ুনমেসি এবার ব্যালন ডি’অরে পঞ্চম, অন্যরা কে কত নম্বরে ৩৪ মিনিট আগেআগস্টে বিবিসির ‘উইমেনস ফুটবল উইকলি’ পডকাস্টে পুতেয়াস বলেছিলেন, ‘আমি সব সময় আরও ভালো কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকি। সে কারণেই এখানে এসেছি।
মানুষ ও খেলোয়াড় হিসেবে আমাকে সব সময় এগিয়ে যেতে হয়।’ নতুন ক্লাবে প্রথম সাত লিগ ম্যাচে করেছেন ৩ গোল, অ্যাসিস্ট ১টি। ৩২ বছর বয়সেও তাঁর পায়ে ফুটবলের জাদু যে ফুরিয়ে যায়নি, সেটি বোঝানোর জন্য এই সংখ্যাই যথেষ্ট।
তবে এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের পর পুতেয়াস যা বলেছেন, তা হয়তো তাঁর গোল কিংবা ট্রফির চেয়েও বড়, ‘পৃথিবীর সব ছেলে ও মেয়েকে বলছি, তোমরা যদি ফুটবল ভালোবাসো, যদি ফুটবল খেলতে চাও, তাহলে খেলো। তুমি ছেলে না মেয়ে, তাতে কিছু যায় আসে না।
কোথা থেকে এসেছ, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেউ যদি বলে তুমি পারবে না, তার কথা শুনবে না।
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখবে।’ কথাগুলো শুনে মোলেত দেল ভালেসের সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে পড়ে যায়। যে রাস্তায় ফুটবল খেলত।
ন্যু ক্যাম্পে বসে স্বপ্ন দেখত। তারপর একদিন নিজেই হয়ে উঠেছিল অন্যদের স্বপ্ন দেখার প্রেরণা।
মাঝখানে এসেছিল ভয়ংকর চোট। হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
প্রিয় ক্লাব ছেড়ে চলে যাওয়ার বেদনা। কিন্তু রানি কি আর এত সহজে হারিয়ে যান!