Thu 6th Aug 2026, 3:18 am

ব্যাংকিং খাতে নারী গ্রাহকদের আমানত ও ঋণগ্রহণে মন্দা: এই প্রবণতা কোন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত?

ব্যাংকিং খাতে নারী গ্রাহকদের আমানত ও ঋণগ্রহণে মন্দা: এই প্রবণতা কোন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত?
নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসারে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা ইতিবাচক ফলও এনেছিল। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে সেই অগ্রযাত্রায় একটি অপ্রত্যাশিত প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমানত রাখা এবং ঋণ গ্রহণ—উভয় ক্ষেত্রেই নারী গ্রাহকদের অংশগ্রহণের হার নিম্নমুখী। এটি নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

গত এক থেকে দেড় দশকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক বিভিন্ন উদ্যোগের ফলস্বরূপ দেশে ব্যাংকিং সেবায় নারী গ্রাহকদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বাড়ির সন্নিকটে এজেন্ট ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসার এবং সহজে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ এক্ষেত্রে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। একই সঙ্গে, একটি নিজস্ব ব্যাংক হিসাবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতাও এই অগ্রগতিতে সহায়ক হয়েছিল।

সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনামূলক নীতির কারণে ব্যাংক আমানতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে আমানত এবং ঋণ—উভয় ক্ষেত্রেই নারী গ্রাহকদের অংশগ্রহণের হারে হ্রাস পরিলক্ষিত হয়েছে।

রাজধানীর উত্তরা এলাকার গৃহিণী মাহফুজা আক্তার তাঁর সংসার খরচ থেকে কিছু অর্থ ব্যাংকে সঞ্চয় করতেন। সম্প্রতি, ছেলেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর প্রয়োজনে তিনি সেই সঞ্চিত অর্থ উত্তোলন করেছেন। Desi Media Point-এর সাথে আলাপকালে তিনি জানান, “জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ব্যাংকে কিছু টাকা রেখেছিলাম। এখন ছেলের ভর্তির সময় এটি কাজে লেগেছে। একদিকে স্বস্তি বোধ করছি, অন্যদিকে মনে হচ্ছে আমার আর্থিক সংস্থান শূন্য হয়ে গেছে।”

মাহফুজা আক্তারের মতো অসংখ্য নারী গ্রাহক তাঁদের পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করছেন, যা নারীদের আমানত হ্রাস পাওয়ার একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, অনেক নারী গ্রাহক ভবিষ্যতের জরুরি অবস্থার জন্য আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সঞ্চয় করে থাকেন।

দেশের ব্যাংকসমূহে জমা থাকা মোট অর্থের ৫৬ শতাংশ ব্যক্তিশ্রেণির আমানতকারীদের। অর্থাৎ, ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের সিংহভাগই ব্যক্তিগত গ্রাহকদের, যার পরিমাণ বর্তমানে ১২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা।

চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে ব্যক্তি আমানত হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১৭ কোটি ১০ লাখ ৫৯ হাজারে পৌঁছেছে, যার মধ্যে নারী হিসাবের হার ৩৮.৬ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৮ হাজার এবং নারী হিসাবধারীর হার ছিল ৩৮.৫ শতাংশ। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ব্যাংক হিসাবে নারী গ্রাহকদের অবদান হ্রাস পেয়েছে।

সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও, নারীদের অংশগ্রহণে বিপরীত চিত্র দেখা যায়। ডিসেম্বর শেষে ব্যক্তিশ্রেণির মোট আমানত ছিল ১১ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে বেড়ে ১২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে, এই মোট আমানতের মধ্যে নারীদের অংশ ডিসেম্বরে ৩৩.৯ শতাংশ থাকলেও মার্চে তা কমে ৩৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি নারীদের আমানত রাখার হার কমে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।

অপরদিকে, ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ নিম্নমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে। মার্চ মাস শেষে ব্যাংকে গ্রাহকদের মোট ঋণ হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ডিসেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩৪ লাখ ৭৫ হাজার। মোট ঋণ হিসাবের মধ্যে নারীদের হিস্যা ১৮.৬ শতাংশ থেকে কমে ১৮.৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

একইসাথে, ব্যক্তিশ্রেণির আমানতকারীদের গৃহীত মোট ঋণের পরিমাণ গত ডিসেম্বরে ছিল ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যা মার্চে ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে, এই মোট ঋণের মধ্যে নারীদের অংশ ২০.৭ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২০.৫ শতাংশ হয়েছে।

বাংলাদেশের নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ব্যাংকিং খাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আর্থিক সেবা, ঋণ সুবিধা প্রদান, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংক আমানতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি নারী গ্রাহকদের অবদান।

তবে, মার্চ মাস শেষে এই পরিস্থিতিতে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে জানা যায়, নারীদের আমানত হ্রাস পাওয়ার মূল কারণ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং চিকিৎসা, শিক্ষা সহ বিভিন্ন পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে সঞ্চিত অর্থ ভাঙতে বাধ্য হওয়া। এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তি এলেও, দীর্ঘমেয়াদে তাঁরা আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হচ্ছেন। এটি ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য তাদের অবলম্বন কমিয়ে দিচ্ছে। অপরদিকে, ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়ার অর্থ হলো, নারীরা নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী হচ্ছেন না অথবা সেই সুযোগ পাচ্ছেন না।

ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং বর্তমানে জয়তুন বিজনেস সলিউশনসের চেয়ারম্যান আরফান আলী, যার নেতৃত্বে দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল, Desi Media Point-কে জানান যে বর্তমানে সমগ্র ব্যাংক খাত একটি চাপের মধ্যে রয়েছে। এই চাপের প্রভাব সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের ওপরও পড়ছে, যা নারীদের ক্ষেত্রে আরও প্রকট। এই পরিস্থিতিই তাঁদের আমানত ও ঋণ হ্রাসের কারণ হতে পারে।

তাঁর অভিমত, নারীদের আর্থিক অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে সার্বক্ষণিক প্রচার-প্রচারণা, আর্থিক প্রণোদনা, বিশেষ তদারকি এবং বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। এর মাধ্যমে নারী গ্রাহকদের ঋণ গ্রহণে অংশগ্রহণ পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এই বিষয়ে Desi Media Point-কে জানান, অর্থনীতির বর্তমান মন্থর গতি এর একটি বড় কারণ। নারীরা ঋণ গ্রহণের জন্য ব্যাংকে কম আসছেন এবং ব্যাংকগুলোও নারীদের ঋণ প্রদানে ততটা আগ্রহী নয়। এমনকি, অনেক ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এই সম্মিলিত কারণগুলোই নারীদের ঋণ গ্রহণে অংশগ্রহণ হ্রাসের জন্য দায়ী।