Sat 8th Aug 2026, 12:45 pm

যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভাবন, বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল: ড. ইমরুল শাহরিয়ারের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ গবেষণা

যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভাবন, বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল: ড. ইমরুল শাহরিয়ারের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ গবেষণা
দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ উদ্ভাবন গবেষণা ক্ষেত্রে কর্মরত থাকায় অনেক বিজ্ঞ গবেষকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। ওষুধ আবিষ্কারের মতো দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। এই প্রেক্ষাপটে, ড. ইমরুল শাহরিয়ারের অসামান্য কর্মপ্রয়াস সম্পর্কে জানার পর থেকেই তাঁর গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং আমি তা অনুসরণ করে আসছি।

ড. ইমরুল শাহরিয়ারের পিএইচডি গবেষণার মূল বিষয় ছিল অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের উদ্ভাবন। যদিও ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুর চিকিৎসায় বাজারে কিছু অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বিদ্যমান, সেগুলোর কার্যকারিতা প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ এবং অসম্পূর্ণ। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ফ্লুতে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে, ইমরুলের গবেষণার লক্ষ্য ছিল প্রচলিত ওষুধগুলোর চেয়ে আরও কার্যকর একটি অ্যান্টিভাইরাল সমাধান তৈরি করা।

২০২৪ সালে তাঁদের এই যুগান্তকারী গবেষণার ফলাফল বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক সাময়িকী পিএনএএস (প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস)-এ প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশনা আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে তাৎক্ষণিক ব্যাপক সাড়া ফেলে। ফলস্বরূপ, Desi Media Point তাঁকে এবং তাঁর গবেষক দলকে একটি সাক্ষাৎকারের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। Desi Media Point রেডিওতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ড. ইমরুল শাহরিয়ার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন যে কেন তাঁদের উদ্ভাবিত ওষুধটি প্রচলিত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধগুলোর তুলনায় অধিক কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, যদিও সে সময়ে পরীক্ষাগুলি কেবল প্রাণীদেহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

বিশ্বের অধিকাংশ একাডেমিক গবেষণা নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও, তার বাস্তব প্রয়োগ পর্যন্ত পৌঁছানো সীমিত থাকে। তবে ড. ইমরুল ও তাঁর দলের গবেষণা এই প্রচলিত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছে। প্রাক্-ক্লিনিক্যাল গবেষণার সমস্ত পর্যায় সফলভাবে সম্পন্ন করার পর, তাঁদের উদ্ভাবিত ওষুধটি বর্তমানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মানবদেহে ওষুধের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা মূল্যায়নের এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে ট্রান্সলেশনাল রিসার্চ বা গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে মানব চিকিৎসায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া বলা হয়।

ড. ইমরুল শাহরিয়ার উল্লেখ করেন, ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মধ্যে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন, এর মাধ্যমে মানুষকে “গিনিপিগ” হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে, অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষকদের কঠোর তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাসেবী ও রোগীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। এর একমাত্র লক্ষ্য হলো নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি নিশ্চিত করা। যদি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল না থাকত, তাহলে আজ আমরা যে অগণিত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ব্যবহার করছি, তার কোনোটিই মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হতো না।’

ড. ইমরুল শাহরিয়ার ও তাঁর দলের গবেষণা থেকে উদ্ভাবিত ওষুধটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বর্তমানে চলমান। যেকোনো ওষুধ আবিষ্কারকের জন্য এটি এক বিশাল সাফল্য। তাঁর আনন্দের আরও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, এই উদ্ভাবিত ওষুধটির দ্বিতীয় ধাপের (ফেজ–২) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বর্তমানে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এই গবেষণার নিবিড় তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

তবে এই আনন্দের পাশাপাশি উদ্বেগও বিদ্যমান। কারণ, এখন ফেজ–২ ট্রায়ালের সাফল্যের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। গবেষণা জগতে এই ধরনের অপেক্ষা অবশ্যম্ভাবী।

ড. ইমরুলের মা-বাবা তাঁর জন্য কখনোই কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপথ বা লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেননি। সম্ভবত এই স্বাধীনতাই তাঁকে স্বকীয়ভাবে চিন্তা করতে ও কর্মপরিচালনা করতে উৎসাহিত করেছে।

ড. ইমরুলের জন্ম ও শৈশব চট্টগ্রামে। তাঁর বাবা চট্টগ্রাম আদালতের একজন আইনজীবী এবং মা একজন গৃহিণী। তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি এবং রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তাঁর মধ্যে গবেষণার প্রতি গভীর অনুরাগ সৃষ্টি হয়। তিনি ঢাকার রেড-গ্রিন রিসার্চ সেন্টারে গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত হন এবং বন্ধুদের সাথে বাংলাদেশের বাস্তবিক সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু করেন। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য অতিরিক্ত লবণাক্ত পানির বিকল্প অনুসন্ধান সংক্রান্ত তাঁদের একটি প্রকল্প আন্তর্জাতিক হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় স্থান করে নিয়েছিল।

গবেষণার প্রতি তাঁর এই গভীর নিবেদনই তাঁকে স্নাতক সম্পন্ন করার পরপরই বিশ্বের অন্যতম প্রখ্যাত পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি পিএইচডিতে ভর্তির সুযোগ করে দেয়। ২০১৯ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন এবং মাস্টার্স ডিগ্রি ছাড়াই মাত্র চার বছরে তাঁর পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর, যা তাঁর অসাধারণ মেধা ও নিষ্ঠার পরিচায়ক।

বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যভিত্তিক বায়োটেক প্রতিষ্ঠান ইরাডিভিরে ডিসকভারি ডিরেক্টর পদে অধিষ্ঠিত আছেন। এই প্রতিষ্ঠানটির মূল ভিত্তি পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোথিত। এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ফিলিপ লাও ড্রাগ ডিসকভারির (কোনো নতুন রোগ নিরাময়ের জন্য কার্যকর রাসায়নিক বা জৈব উপাদান আবিষ্কারের জটিল প্রক্রিয়া) ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুপরিচিত ও সফল একজন বিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণাগার থেকে এ পর্যন্ত তিনটি ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) কর্তৃক অনুমোদন লাভ করেছে। বর্তমানে প্রোস্টেট ক্যানসার চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত টার্গেটেড রেডিওথেরাপি ‘প্লুভিক্টো’-র প্রাথমিক গবেষণাও এই ল্যাবরেটরিতেই শুরু হয়েছিল।

ড. ইমরুল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন, এবং বর্তমানে সেটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাংলাদেশে চলমান। এই ট্রায়ালের ইতিবাচক ফলাফল সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। এটি দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে যে বিজ্ঞান কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়; বিজ্ঞানের সুফল সমগ্র মানবজাতির জন্য উন্মুক্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে যেমন তিনি বাংলাদেশের সমস্যা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন, আজও দেশের কল্যাণ তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে। তাঁর এই দেশপ্রেমী চিন্তা আমাকে মুগ্ধ করে। একজন ড্রাগ ডিসকভারি গবেষক হিসেবে তাঁর গভীরতা, অদম্য নিষ্ঠা এবং অসাধারণ মেধা সত্যিই অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক।

বাংলাদেশে এখনও নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের একটি সুসংহত সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। দেশের ঔষধশিল্প মূলত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ। ফলস্বরূপ, ডেঙ্গুর মতো নতুন স্বাস্থ্যসংকট দেখা দিলে আমাদের উন্নত বিশ্বের উদ্ভাবনের উপর নির্ভর করতে হয়। এই বাস্তবতাই ড. ইমরুলকে গভীরভাবে ভাবায়। তাঁর স্বপ্ন হলো, একদিন বাংলাদেশেও মৌলিক ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণা বিকশিত হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি ‘বেঙ্গল আলকেমি’ নামক একটি বায়োটেক স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সকল মহৎ কাজের সূচনা হয় একটি স্বপ্ন থেকে, এবং সেই স্বপ্নকে পাথেয় করেই তিনি এগিয়ে চলেছেন।

প্রত্যাশা করি, তাঁর গবেষণা ভবিষ্যতে আরও অনেক সাফল্য বয়ে আনবে। তাঁর এই পথচলা বাংলাদেশের নবীন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং তাদের অনুপ্রাণিত করবে।