Sat 8th Aug 2026, 12:45 pm

ডায়াবেটিসের নতুন দিগন্ত: অপুষ্টি-সংশ্লিষ্ট টাইপ-৫ ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিসের নতুন দিগন্ত: অপুষ্টি-সংশ্লিষ্ট টাইপ-৫ ডায়াবেটিস
সাধারণত ডায়াবেটিস বলতে টাইপ-১ ও টাইপ-২ ধরনকেই প্রধানত চিহ্নিত করা হয়। এছাড়াও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং নির্দিষ্ট কিছু জিনগত কারণের ডায়াবেটিস এই রোগের বিভিন্ন পরিচিত প্রকারভেদ। তবে সাম্প্রতিক চিকিৎসা গবেষণায় একটি নতুন এবং স্বতন্ত্র ধরন, টাইপ-৫ ডায়াবেটিস, আলোচনায় উঠে এসেছে। এই ধরনটি মূলত দীর্ঘমেয়াদী অপুষ্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি এই বিশেষ ধরনটিকে নতুনভাবে চিহ্নিত করে এর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। লক্ষণীয় যে, এটি বহু বছর পূর্বে ‘অপুষ্টি-সংশ্লিষ্ট ডায়াবেটিস মেলাইটাস’ নামে পরিচিত ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে এর প্রতি তেমন মনোযোগ দেওয়া হয়নি। আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, অপুষ্টিজনিত এই ডায়াবেটিসের বৈশিষ্ট্য টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। ফলস্বরূপ, চিকিৎসার সঠিক পরিকল্পনার জন্য এটিকে একটি স্বতন্ত্র শ্রেণী হিসেবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি।

কেন হয় টাইপ-৫ ডায়াবেটিস
টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের মূল কারণ নিহিত রয়েছে শৈশব বা কৈশোরে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে, বিশেষত প্রোটিন ও ক্যালরির অপর্যাপ্ততায়। এই অপুষ্টি অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কার্যকারিতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যার ফলস্বরূপ ইনসুলিন উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পায়। এই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা সাধারণত কৃশ হন এবং তাদের শরীরে চর্বির পরিমাণও কম থাকে। উল্লেখ্য, এটি টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মতো কোনো অটোইমিউন রোগ নয়, এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ যেমন স্থূলতা বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, তাও এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে
টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির মুখে থাকা জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করে, যেখানে শৈশবের অপুষ্টি এখনো একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এই ধরনের রোগী শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দুঃখজনকভাবে, আমাদের দেশে অনেক কৃশ ও তরুণ ডায়াবেটিস রোগীকে প্রায়শই টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস হিসেবে ভুলভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যার ফলে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাগত ফল অর্জন করা সম্ভব হয় না।

লক্ষণ কী
এই রোগের লক্ষণ অন্যান্য ডায়াবেটিসের মতোই প্রকাশ পায়—যেমন অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অনাকাঙ্ক্ষিত ওজন হ্রাস, শারীরিক দুর্বলতা এবং দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা। তবে, রোগীর শারীরিক গঠন, তার অপুষ্টির অতীত ইতিহাস এবং নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসক টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের উপস্থিতি সম্পর্কে অনুমান করতে পারেন।

চিকিৎসার বিশেষত্ব
টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কেবল রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়। পুষ্টির অভাব পূরণ করা এবং রোগীর জন্য একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করা চিকিৎসার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিছু ক্ষেত্রে মুখে সেবনের ওষুধ কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে, আবার অনেক রোগীর জন্য ইনসুলিন থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং, প্রতিটি রোগীর সুনির্দিষ্ট অবস্থা বিবেচনা করে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
ডা. শাহজাদা সেলিম, সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়