Sat 15th Aug 2026, 2:28 pm

পরিচিত শব্দ মনে না পড়া: স্বাভাবিক বিস্মৃতি না গভীর উদ্বেগের কারণ?

পরিচিত শব্দ মনে না পড়া: স্বাভাবিক বিস্মৃতি না গভীর উদ্বেগের কারণ?
কথোপকথনের মাঝে প্রায়শই এমন ঘটে যে, অতি পরিচিত কোনো শব্দ বা নাম আকস্মিকভাবে স্মৃতি থেকে উধাও হয়ে যায়, যা মুহূর্তকাল পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফিরে আসে। এই ধরনের অভিজ্ঞতা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। সাধারণত এই পরিস্থিতিকে 'মুখে এসেও আটকে যাওয়া' বা 'টিপ-অফ-দ্য-টাং' (TOT) ফেনোমেনন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে, যদি এই প্রবণতা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পায় এবং ব্যক্তির দৈনন্দিন কার্যকলাপে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তবে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

হঠাৎ কোনো নাম বা পরিচিত শব্দ বিস্মৃত হয়ে যাওয়ার এই বিশেষ অবস্থাকে 'টিপ-অফ-দ্য-টাং' (TOT) সিন্ড্রোম নামে অভিহিত করা হয়। এটি কোনো স্বতন্ত্র রোগ নয়, বরং স্মৃতিভ্রংশের একটি সাধারণ রূপ। এর অর্থ এই নয় যে শব্দটি মস্তিষ্ক থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে, বরং স্মরণ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। মস্তিষ্কের 'হিপ্পোক্যাম্পাস' নামক অংশটি স্মৃতি গঠন ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই অংশটির সঙ্গে ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অংশের সংযোগ বিঘ্নিত হলে এই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

মূলত, শব্দটি মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে যায় না। বরং, সেই মুহূর্তে মস্তিষ্কের সংরক্ষিত তথ্য সঠিক সময়ে খুঁজে বের করে তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষেত্রে একটি সাময়িক বাধা সৃষ্টি হয়।

স্মৃতি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য মস্তিষ্কের একাধিক অংশ সমন্বিতভাবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়ায় ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশগুলিও সংগৃহীত তথ্যকে শব্দে রূপান্তর করতে সহায়তা করে। সুতরাং, কোনো শব্দ স্মরণ করার সময় এই সমন্বিত প্রক্রিয়ায় সাময়িক ব্যাঘাত ঘটলে পরিচিত নাম বা শব্দ জানা থাকা সত্ত্বেও তা উচ্চারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

যখন আমরা কোনো পূর্বে পরিচিত নাম বা শব্দ উচ্চারণ করতে চাই, তখন স্মৃতি থেকে সেই শব্দটি সংযোগ পথের মাধ্যমে মস্তিষ্কের ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অংশে পৌঁছায়। সেখানে স্মৃতির সঙ্কেত ভাষাগত রূপে রূপান্তরিত হয়ে উচ্চারিত হয়। কিন্তু যদি এই সংযোগ পথটি বিঘ্নিত হয়, তবে নামটি বা শব্দটি স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকা সত্ত্বেও তা ভাষাগত রূপে প্রকাশিত হয় না। ফলস্বরূপ, সংশ্লিষ্ট বিষয়, স্থান বা ব্যক্তির মুখ মনে এলেও সেটি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা বা মুখে আনা সম্ভব হয় না।

এই অভিজ্ঞতা কি অস্বাভাবিক? দৈনন্দিন আলাপচারিতায় সুপরিচিত শব্দ বা নাম হঠাৎ মনে না আসার ঘটনা বহু মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে এবং এটি উদ্বেগের কারণ নয়। তবে, যদি এই সমস্যা ঘন ঘন পুনরাবৃত্ত হয়, এমনকি পরিচিত নাম বা শব্দ উচ্চারণের ঠিক পূর্ব মুহূর্তেও বিস্মৃতি ঘটে, তবে তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিভ্রংশ স্বাভাবিক হলেও, যদি তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এটি কোনো স্নায়বিক রোগের প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।

সব বিস্মৃতিই ডিমেনশিয়া নয়: মাঝেমধ্যে নাম বা শব্দ মনে না আসাকে অবিলম্বে ডিমেনশিয়ার লক্ষণ বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। অপর্যাপ্ত ঘুম, অত্যধিক মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ক্লান্তি অথবা একই সময়ে একাধিক বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার প্রচেষ্টাও এই ধরনের বিস্মৃতির কারণ হতে পারে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা কিছুটা বাড়তে পারে, যা সাধারণত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ।

তবে, বিস্মৃতির ঘটনা যদি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে সতর্ক হওয়া অত্যাবশ্যক। বিশেষত, যদি পরিচিত ব্যক্তি, স্থান, ঠিকানা বা দৈনন্দিন রুটিন বারবার ভুলে যাওয়া শুরু হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

কারণ অনুসন্ধান: 'টিপ-অফ-দ্য-টাং' একটি সাধারণ সমস্যা হলেও, যদি এই বিস্মৃতি ধারাবাহিকভাবে ঘটতে থাকে, তবে তা স্মৃতিভ্রংশের একটি সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, অত্যাধিক মানসিক চাপ, মানসিক বিভ্রান্তি এবং অপর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলির সংকেত আদান-প্রদানের ক্ষমতা হ্রাস করে, যা বিস্মৃতির প্রবণতা বাড়ায়। এছাড়া, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত বা দীর্ঘমেয়াদী মদ্যপানের ফলেও সাময়িক স্মৃতিভ্রংশ ঘটতে পারে।

কখন উদ্বেগ প্রয়োজন: শব্দ স্মরণ করার সমস্যা যদি ক্রমবর্ধমান হয়, দৈনন্দিন যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করে, অথবা স্মৃতি ও চিন্তাভাবনার অন্যান্য গুরুতর পরিবর্তনের সঙ্গে এটি প্রকাশ পায়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অপরিহার্য। এই ধরনের লক্ষণ ভিটামিন বি-১২ এর অভাব, থাইরয়েডের সমস্যা, অবসাদ, উদ্বেগ, শ্রবণশক্তির দুর্বলতা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

চিকিৎসকের পরামর্শ কখন জরুরি: কথা বলার সময় শুধু একটি শব্দ মনে না পড়া নয়, যদি এর পাশাপাশি পরিচিত মানুষকে চিনতে অসুবিধা হয়, একই কথা বারবার বলার প্রবণতা দেখা যায়, সাম্প্রতিক ঘটনা মনে রাখতে সমস্যা হয়, পরিচিত স্থানে পথ ভুলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, অথবা দৈনন্দিন কার্য সম্পাদনেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, তবে এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। এই লক্ষণগুলি অনেক সময় ডিমেনশিয়া বা অন্যান্য গুরুতর স্নায়বিক রোগের প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।

এছাড়াও, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত, দীর্ঘমেয়াদী মদ্যপানের অভ্যাস, নির্দিষ্ট কিছু ঔষধের অনিয়ন্ত্রিত সেবন, থাইরয়েডের কার্যকারিতা বিঘ্নিত হওয়া বা নির্দিষ্ট ভিটামিনের ঘাটতিও স্মৃতিশক্তির সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অতএব, বারবার বিস্মৃতির কারণ স্ব-নির্ধারণ না করে পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ।

উপসংহার: মাঝে মাঝে কোনো পরিচিত নাম বা শব্দ মনে না আসার ঘটনা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে, যদি এই সমস্যা ঘন ঘন পুনরাবৃত্ত হয়, ক্রমশ বৃদ্ধি পায় অথবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে, তবে এটিকে বয়সজনিত সাধারণ বিস্মৃতি বলে উপেক্ষা না করে অবিলম্বে উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

স্মৃতিশক্তি উন্নত রাখতে করণীয়: পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ স্মৃতিশক্তি ও সামগ্রিক মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, অতিরিক্ত কাজের চাপ কমিয়ে একই সময়ে একাধিক বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে একটি কাজ সম্পন্ন করে পরবর্তী কাজে মনোনিবেশ করা অধিক কার্যকরী হতে পারে।