Thu 16th Jul 2026, 2:29 am

বেসরকারি খাতের কর্মজীবন: স্থবির বেতন, অবিরাম কর্মভার এবং নিগৃহীত শ্রমিকের আর্তনাদ

বেসরকারি খাতের কর্মজীবন: স্থবির বেতন, অবিরাম কর্মভার এবং নিগৃহীত শ্রমিকের আর্তনাদ
রাজধানীতে টানা বর্ষণে মিরপুর, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার মতো এলাকাগুলোর সড়ক যখন কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়, তখনো বেসরকারি খাতের কর্মীদের ঘরে বসে থাকার ফুরসত মেলে না। গণপরিবহন সংকট ও তীব্র জলাবদ্ধতার প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ভিজতে ভিজতেই তাঁদের কর্মস্থলের পথে ছুটতে হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হাজিরা খাতায় 'জলাবদ্ধতা'জনিত বিলম্বের জন্য কোনো বিশেষ ছাড়ের বিধান নেই। তবে, কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের এই দৈহিক ক্লেশ অপেক্ষা অনেক বেশি প্রকট মানসিক ও কাঠামোগত শোষণ তাঁদের অফিসের চার দেয়ালের মধ্যেই নিয়মিত সহ্য করতে হয়।

এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, এ দেশের বেসরকারি খাতের বৃহৎ একটি অংশের কর্মীদের জীবন বস্তুত এক প্রচ্ছন্ন 'দিন আনি দিন খাই' চক্রে আবর্তিত হচ্ছে। বাহ্যিকভাবে কর্পোরেট পরিচ্ছদ পরিধান করে এবং পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে কর্মস্থলে প্রবেশ করলেও মাসান্তে তাঁদের পকেট প্রায়শই শূন্য থাকে। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে যাতায়াত ভাড়া ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে এই কর্মীরা তাঁদের মৌলিক ও মানবিক অধিকারের বিষয়গুলো একপ্রকার বিস্মৃত হতে বাধ্য হচ্ছেন।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রথম ও প্রধান সংকট হলো বছরের পর বছর আটকে থাকা পদোন্নতি এবং নামমাত্র বেতনবৃদ্ধি। ঢাকার একটি বেসরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ বছর ধরে কর্মরত অর্ণব রহমান তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, 'আমি পাঁচ বছর ধরে একই পদে আছি। কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়েছে, অথচ ইনক্রিমেন্ট হয়েছে নামমাত্র। ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির এই বাজারে একই বেতনে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজের কথা থাকলেও আমাদের প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। কিন্তু এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য কোনো ওভারটাইম বা যাতায়াত ভাতা প্রদান করা হয় না'।

একই ধরনের সংকটের কথা তুলে ধরেন একটি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্তরের কর্মকর্তা আহসান মিজু। তিনি উল্লেখ করেন, 'আমাদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনেও অফিসের কাজ সম্পাদন করতে হয়। অফিসের অভ্যন্তরীণ নোংরা রাজনীতি ও তোষামোদপ্রিয়তার কারণে যোগ্য কর্মীরা প্রায়শই অবমূল্যায়িত হন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল বসের সুনজরে না থাকার কারণে অনেকের পদোন্নতি আটকে থাকে। আর এই অস্বাস্থ্যকর রাজনীতির শিকার হয়ে সৎ কর্মীরা প্রতিনিয়ত মানসিক অবসাদে ভুগছেন'।

বেসরকারি খাতের এই শোষণমূলক চিত্রটি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যখন সামান্য অজুহাত অথবা ব্যক্তিগত মনোমালিন্যের জেরে ছাঁটাইয়ের খড়্গ নেমে আসে। একটি স্বনামধন্য গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে বসের ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে এক সহকর্মীকে আকস্মিকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এমনকি তাঁর ন্যায্য পাওনা অর্থও অন্যায় অজুহাতে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, 'বেসরকারি চাকরিতে কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই; যেকোনো সময় চাকরি হারানোর ঝুঁকি থাকে'।

বেসরকারি খাত বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি খাতের নতুন পে কমিশনের সুপারিশ এবং বেতন বৃদ্ধির ঘোষণার সময় এই বৈষম্য আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে স্কেল পর্যায়ক্রমে কার্যকর হতে চলেছে এবং সর্বনিম্ন মূল বেতন এক লাফে ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে বেসরকারি কর্মীদের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অনিশ্চিত। সরকারি কর্মচারীদের জন্য যেখানে শতকোটি টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ ও উৎসবের আমেজ বিদ্যমান, সেখানে বেসরকারি চাকরিজীবীরা পড়ে আছেন চরম এক তথৈবচ অবস্থায়। শ্রম বিধিমালা-২০১৫ অনুযায়ী প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি এবং গ্রুপ ইনস্যুরেন্সের মতো বাধ্যতামূলক সুবিধা প্রদানের নিয়ম থাকলেও দেশের অধিকাংশ বেসরকারি মালিকপক্ষ তা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। ফলস্বরূপ, তাঁদের চাকরির কোনো স্থায়িত্ব নেই, এবং পেনশন বা অন্য কোনো ন্যূনতম আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষাও অনুপস্থিত।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা-২০১৫ অনুযায়ী বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষার কথা উল্লেখ থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রায় অনুপস্থিত। সরকার বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি নতুন 'সার্ভিস রুলস' বা চাকরি বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, যার খসড়া পর্যালোচনা গত মে মাসেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে, জুলাই মাস অতিক্রান্ত হতে চললেও সেই বিধিমালার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।

নগর ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা ও যাতায়াত সংকটের কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি মূল্যবান কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে। এই অপচয়িত সময়ের সম্পূর্ণ আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি বেসরকারি কর্মীদের একাই বহন করতে হচ্ছে। একদিকে রাস্তায় নষ্ট হওয়া সময়ের কারণে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে কাজের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কর্মীদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।

বৃষ্টি থামলে রাস্তার জলজট হয়তো অপসারিত হয়, কিন্তু এ দেশের বেসরকারি খাতের কোটি কোটি চাকরিজীবীর জীবনের অদৃশ্য শোষণ এবং বেতন স্থবিরতার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সহজে কাটার কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়।