Tue 8th Sep 2026, 4:51 pm

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানত ফেরতের শুভ সূচনা: প্রথম দিনে ৬ হাজার গ্রাহককে ২৫০ কোটি টাকা প্রদান

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানত ফেরতের শুভ সূচনা: প্রথম দিনে ৬ হাজার গ্রাহককে ২৫০ কোটি টাকা প্রদান
পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রত্যাবর্তন করছে। গতকাল, সোমবার, ব্যাংকটি তাদের আমানতকারীদের আমানতকৃত অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করেছে। প্রাথমিক দিনে যারা অর্থ ফেরতের জন্য আবেদন জমা দিয়েছিলেন, গতকাল তাদের অনুকূলে তহবিল ছাড় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রথম দিনেই ৬ হাজার গ্রাহককে মোট ২৫০ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে ব্যাংকটি।

অর্থ ফেরতের পাশাপাশি, ব্যাংকটি গতকাল অনলাইন অর্থ স্থানান্তর পরিষেবাও চালু করেছে। এর ফলস্বরূপ, দীর্ঘ বিরতির পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়েছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূতকরণের মাধ্যমে। এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি গ্রহণ করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হলেও, এর অন্তর্গত পাঁচটি ব্যাংকের মোট ৭৬১টি শাখা এখনো দেশজুড়ে পৃথকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। গতকাল, আমানত ফেরতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রথম দিনে, গ্রাহকরা তাদের নিজ নিজ শাখা থেকে অর্থ উত্তোলন করেছেন। একটি সরকারি নির্দেশনার ভিত্তিতে গতকাল সকল প্রকার আমানতকারীর অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়াটি চালু করা হয়। এর পূর্বে, গত ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, অর্থ ফেরত পেতে আগ্রহী গ্রাহকদের কাছ থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল।

এদিকে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের সুবিধার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। যদিও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ৭৪ হাজার আমানতকারী ব্যাংকটির কাছে ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরতের জন্য আবেদন জমা দিয়েছিলেন, তবুও বাংলাদেশ ব্যাংক এই অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ করেছে যাতে কোনো গ্রাহক যেন খালি হাতে ফিরে না যান। উল্লেখ্য, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের সকল শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করে সরকার ব্যাংকটির সম্পূর্ণ মালিকানা গ্রহণ করেছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান সিকদার দেসি মিডিয়া পয়েন্টকে জানান যে, যেসব গ্রাহক অর্থ ফেরতের জন্য আবেদন করেছিলেন, তাদের সবার জন্য তহবিল বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রথম দিনে যারা অর্থ ফেরতের আবেদন করেছিলেন, তাদের সবাই টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যাংকে উপস্থিত হননি। ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনেক গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা তহবিল জমা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আবার কিছু গ্রাহক টাকা উত্তোলন করে তাৎক্ষণিকভাবেই পুনরায় ব্যাংকে জমা দিয়েছেন।

গতকাল রাজধানীর গুলশান, মহাখালী, বনানী ও মতিঝিল অঞ্চলের ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও স্ব-ব্যবস্থাপনায় সকল শাখায় পর্যাপ্ত তারল্যের সংস্থান করা হয়েছিল। সকাল থেকেই অসংখ্য গ্রাহক অর্থ উত্তোলনের জন্য এই শাখাগুলিতে ভিড় করেন। শাখা কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে তাদের স্বাগত জানান এবং যারা যথাযথভাবে আবেদন করেছিলেন, তাদের সবাইকে সফলভাবে অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে।

একীভূত ইউনিয়ন ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক এ বি এম মোকাররম মাহমুদ দেসি মিডিয়া পয়েন্টকে অবহিত করেন যে, প্রথম দিনে আটজন গ্রাহক অর্থ উত্তোলনের আবেদন করেছিলেন, যার মধ্যে চারজন সফলভাবে তাদের তহবিল তুলে নিয়েছেন। অবশিষ্ট গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও, যাদের অ্যাকাউন্টে মুনাফা জমা ছিল, তারাও সেই অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উল্লিখিত পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে। এই পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম (এস আলম) এর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এক্সিম ব্যাংক নিয়ন্ত্রিত ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের মাধ্যমে। এই দুই ব্যবসায়ীই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এস আলম এবং নজরুল ইসলাম মজুমদারের অধীনে থাকাকালীন ব্যাংকগুলিতে ব্যাপক ঋণ কেলেঙ্কারি ও অনিয়মের ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিচালিত দেশি ও বিদেশি আর্থিক নিরীক্ষায় এই সকল গুরুতর অনিয়ম প্রকাশিত হয়। নিরীক্ষার তথ্য অনুসারে, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই লুটপাট করা হয়েছিল, যার ফলস্বরূপ ব্যাংকগুলি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে এবং গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে অক্ষম হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতেই সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকগুলিকে একীভূত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পূর্ববর্তী মালিকদের মালিকানা বাতিল করে সরকারের কাছে সম্পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তর করা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর, বর্তমান বিএনপি সরকারও এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।